ড. হারুন রশীদ
অনেক দিন আগে কবি কুসুমকুমারী দাশ লিখেছিলেন- ‘আমাদের দেশে হবে সেই ছেলে কবে/কথায় না বড় হয়ে কাজে বড় হবে।’ কবি তখন সম্ভবত কল্পনাও করেননি, একদিন এমন সময় আসবে যখন মানুষ কথায় শুধু বড় হবে না, কথার ওপর আবার ‘লাইক’, ‘শেয়ার’ ও ‘কমেন্ট’ও জমা করবে। কাজের হিসাব অবশ্য আলাদা। সেখানে অনেক সময় দেখা যায়- বক্তৃতার পাহাড়, কাজের টিলা। আমাদের দেশে কথা বলা একটি বিশেষ প্রতিভা। কেউ সুযোগ পেলেই কথা বলেন, কেউ সুযোগ না পেলেও কথা বলেন। কেউ মাইক হাতে পেলে থামতে চান না, কেউ মাইক না পেলে ফেসবুক লাইভে চলে যান। আর কেউ কেউ এমনভাবে কথা বলেন যে মনে হয়, দেশের সব সমস্যার সমাধান হয়ে গেছে- শুধু বাস্তবতা বিষয়টি এখনো বুঝে উঠতে পারেনি।
রাজনীতির মাঠে কথার জাদু বহু পুরোনো। সভা-সমাবেশে বক্তৃতা শুনলে মনে হয়, আগামীকাল সকালেই দেশ বদলে যাবে। রাস্তা হবে ঝকঝকে, নদী হবে স্বচ্ছ, যানজট ইতিহাসের পাতায় চলে যাবে, দুর্নীতি দেশত্যাগ করবে, বেকারত্ব আত্মসমর্পণ করবে। বক্তৃতা শেষ হলে হাততালি পড়ে। মানুষ বাড়ি ফেরে। তারপর সকাল হয়। বাস্তবতা জানায়- পরিবর্তনটি এখনো রওয়ানা দেয়নি। আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে কথা বলা কখনো কখনো কাজের বিকল্প হয়ে দাঁড়িয়েছে। সংসদে দীর্ঘ বক্তৃতা, সভায় জোরালো বক্তব্য, টেলিভিশন টক শোতে তর্ক, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্ট্যাটাস- সব মিলিয়ে কথা বলার অভাব নেই। অভাব শুধু মাঝে মাঝে কাজের।
কথার অবশ্য প্রয়োজন আছে। কথা মানুষকে অনুপ্রাণিত করে, নেতৃত্ব তৈরি করে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে মানুষকে দাঁড় করায়। ইতিহাসের বড় পরিবর্তনের আগে শক্তিশালী কথা উচ্চারিত হয়েছে। একটি ভালো বক্তব্য মানুষের মন বদলে দিতে পারে। কিন্তু কথা যদি কাজের সঙ্গে না মেলে, তখন তা আর প্রেরণা থাকে না; হয়ে যায় শব্দের আতশবাজি। আতশবাজি দেখতে সুন্দর। কিছুক্ষণ আকাশ আলোকিত করে। তারপর অন্ধকার ফিরে আসে। আমাদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে এই কথার আতশবাজি আরও বেড়েছে। কেউ সকালে ঘুম থেকে উঠে দেশ উদ্ধারের পোস্ট দেন, দুপুরে মানবতার জন্য উদ্বেগ প্রকাশ করেন, বিকেলে নৈতিকতার ওপর বক্তৃতা দেন এবং রাতে অন্যের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে এমন মন্তব্য করেন যে নৈতিকতা নিজেই হয়তো লজ্জায় লগআউট করে।
আমরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন এক জাতিতে পরিণত হচ্ছি, যেখানে সবাই বিশেষজ্ঞ। কেউ অর্থনীতি বোঝেন, কেউ রাজনীতি, কেউ আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, কেউ চিকিৎসা, কেউ জলবায়ু, কেউ ক্রিকেট। পাঁচ মিনিটের একটি ভিডিও দেখে কেউ বিশ্বরাজনীতির সমাধান দেন। একটি পোস্ট পড়ে কেউ অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা তৈরি করেন। আর কোনো বিষয়ে কিছুই না জানলেও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে মতামত দেওয়ার ক্ষেত্রে আমাদের জাতির অসাধারণ দক্ষতা রয়েছে। মুশকিল হলো, মতামত দেওয়ার সঙ্গে কাজ করার সম্পর্কটি অনেক সময় বিচ্ছিন্ন। আমরা চাই রাস্তায় কেউ ময়লা ফেলবে না। কিন্তু নিজের গাড়ির জানালা দিয়ে প্যাকেট ছুড়ে ফেলতে আপত্তি নেই। আমরা চাই দুর্নীতি বন্ধ হোক- কিন্তু নিজের কাজটি একটু দ্রুত করানোর জন্য ‘চা-খরচ’ দিতে আপত্তি নেই। আমরা চাই সবাই আইন মানুক- কিন্তু নিজের ক্ষেত্রে আইনটি একটু নমনীয় হলে মন্দ হয় না। আমরা চাই সমাজে শৃঙ্খলা থাকুক। কিন্তু নিজের গাড়িটি রাস্তার মাঝখানে রেখে পাঁচ মিনিটের জন্য দোকানে ঢুকতে আমাদের আপত্তি নেই।
অন্যের দায়িত্ব নিয়ে আমরা খুবই সচেতন। নিজের দায়িত্বের ক্ষেত্রে কিছতা উদার; এমনকি ‘দেশকে ভালোবাসি’- এ কথাটিও আমরা খুব বেশি বলি। দেশপ্রেমের স্ট্যাটাস, দেশপ্রেমের বক্তৃতা, দেশপ্রেমের স্লোগান- সবই আছে। কিন্তু দেশকে ভালোবাসার সবচেয়ে সাধারণ কাজগুলো—কর দেওয়া, আইন মানা, রাস্তা নোংরা না করা, ঘুস না দেওয়া, দায়িত্ব ঠিকমতো পালন করা- এসবের ক্ষেত্রে আমরা অনেক সময় আবেগের ওপর নির্ভর করি, আচরণের ওপর নয়। দেশপ্রেম যদি শুধু পতাকা উত্তোলনের দিন সক্রিয় থাকে, তাহলে তা দেশপ্রেম নয়; এটি মৌসুমি আবেগ। রাজনীতির ক্ষেত্রেও কথার সঙ্গে কাজের মিল থাকা অত্যন্ত জরুরি। একজন রাজনীতিক যদি জনগণকে পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দেন, তাহলে তাকে সেই পরিবর্তনের প্রমাণ দিতে হবে। একজন সংসদ সদস্য যদি উন্নয়নের কথা বলেন, তাহলে তার এলাকার মানুষের জীবনে সেই উন্নয়নের ছাপ দেখা যেতে হবে। একজন মন্ত্রী যদি সুশাসনের কথা বলেন, তাহলে তার মন্ত্রণালয়ের কাজেও তার প্রতিফলন থাকা উচিত।
শুধু বক্তৃতায় উন্নয়ন হলে দেশের জনগণ এক সময় ক্লান্ত হয়ে পড়ে। কারণ মানুষ শেষ পর্যন্ত বক্তৃতা খায় না, বাস্তব সেবা চায়। মানুষ চায় রাস্তা ঠিক থাকুক, হাসপাতালে চিকিৎসা মিলুক, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষা হোক, অফিসে কাজ সময়মতো হোক। মানুষ চায় তার সন্তান নিরাপদে বড় হোক। সে চায় তার আয় দিয়ে মাসের খরচ চলুক। জনগণকে সবচেয়ে বেশি আশ্বস্ত করে কোনো বক্তৃতা নয়; একটি কাজের ফলাফল। একজন কর্মকর্তা যদি কম কথা বলে নিয়মিত কাজ করেন, তাহলে তিনি হয়তো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে খুব জনপ্রিয় হবেন না। কিন্তু তার কাজ মানুষের জীবনে পরিবর্তন আনবে। একজন শিক্ষক হয়তো প্রতিদিন বড় বড় কথা বলেন না; কিন্তু তার ছাত্ররা যদি ভালো মানুষ ও দক্ষ নাগরিক হয়ে ওঠে, সেটিই তার সবচেয়ে বড় বক্তৃতা। একজন চিকিৎসক হয়তো স্বাস্থ্যনীতি নিয়ে দীর্ঘ পোস্ট লেখেন না; কিন্তু রোগীর পাশে দাঁড়িয়ে দায়িত্ব পালন করেন- তার কাজই তখন তার পরিচয়।
আমাদের সমাজে কথার চেয়ে কাজের মূল্য আবার ফিরিয়ে আনা দরকার। এ জন্য শুধু রাজনীতিকদের দায়ী করলে হবে না। আমরা প্রত্যেকেই কোনো না কোনোভাবে কথার মানুষ হয়ে উঠছি। পরিবারে সন্তানকে নৈতিকতার শিক্ষা দিই, কিন্তু সে যখন দেখে বড়রা নিয়ম ভাঙছে, তখন সে বক্তৃতা নয়, আচরণ শেখে। কর্মক্ষেত্রে আমরা সময়নিষ্ঠার কথা বলি, কিন্তু নিজের কাজে দেরি করি। সততার প্রশংসা করি। কিন্তু সুবিধা পেলে নীতির সংজ্ঞা বদলে ফেলি। শিশুরা আমাদের কথা শুনে যতা শেখে, তার চেয়ে বেশি শেখে আমাদের কাজ দেখে। তাই সমাজ বদলের সবচেয়ে কার্যকর বক্তৃতা হতে পারে একটি ভালো কাজ। একজন মানুষ ঘুস না দিলে, একজন চালক ট্রাফিক আইন মানলে, একজন নাগরিক ময়লা নির্দিষ্ট স্থানে ফেললে, একজন কর্মকর্তা দায়িত্বের কাজ সময়মতো করলে- এসব ছোট কাজই রাষ্ট্রের বড় পরিবর্তনের ভিত্তি তৈরি করে।
অবশ্য আমরা কাজের ব্যাপারেও বেশ সৃজনশীল। কাজ না করে কাজের ছবি তুলতে পারি। কাজ শুরুর আগে উদ্বোধন করতে পারি। উদ্বোধনের পর ফলক বসাতে পারি। ফলকের সামনে ছবি তুলতে পারি। তারপর সেই ছবির সঙ্গে লিখতে পারি- ‘ঐতিহাসিক মাইলফলক’। কিছুদিন পর দেখা গেল, মাইলফলকটি আছে, কিন্তু রাস্তা নেই। এটি অবশ্য নিছক রসিকতা নয়। আমাদের উন্নয়ন সংস্কৃতিতে অনেক সময় কাজের চেয়ে কাজের প্রদর্শন বড় হয়ে ওঠে। প্রকৃত সাফল্য হলো কোনো প্রকল্পের ফল মানুষের জীবনে পৌঁছানো। ফিতা কাটা নয়, কাজটি মানুষের জন্য কতা কার্যকর হলো, সেটিই আসল প্রশ্ন। আমাদের প্রয়োজন এমন নেতৃত্ব, যেখানে কথা থাকবে, কিন্তু কথার চেয়ে কাজ বড় হবে। এমন প্রশাসন, যেখানে প্রতিশ্রুতির চেয়ে সেবা গুরুত্বপূর্ণ হবে। এমন রাজনৈতিক সংস্কৃতি, যেখানে বক্তৃতার দৈর্ঘ্য দিয়ে যোগ্যতা মাপা হবে না; বরং কাজের ফল দিয়ে নেতৃত্বের মূল্যায়ন হবে।
একজন মানুষ দিনে দশটি পোস্ট লিখে সমাজ পরিবর্তনের ডাক দিতে পারেন। কিন্তু তিনি যদি নিজের ঘরের সামনে ময়লা না ফেলেন, একজন অসহায় মানুষকে সাহায্য করেন, নিয়ম মেনে চলেন, দায়িত্ব পালন করেন- তাহলে তার একটি কাজ হয়তো দশটি পোস্টের চেয়ে বেশি প্রভাব ফেলবে। কারণ সমাজের পরিবর্তন সবসময় বড় মঞ্চ থেকে শুরু হয় না। কখনো কখনো তা শুরু হয় একটি ছোট সিদ্ধান্ত থেকে- ‘আমি নিয়ম ভাঙব না’, ‘আমি ঘুস দেব না’, ‘আমি মিথ্যা বলব না’, ‘আমি আমার দায়িত্ব ফাঁকি দেব না।’ আমাদের এখন এমন একটি সংস্কৃতি দরকার, যেখানে মানুষকে শুধু প্রশ্ন করা হবে না- ‘আপনি কী বলেছেন?’ বরং জিজ্ঞাসা করা হবে- ‘আপনি কী করেছেন?’ কথা বলা সহজ। কথার সঙ্গে কাজ মিলিয়ে চলা কঠিন। কিন্তু সভ্য সমাজের পরিচয় এখানেই। যে সমাজে মানুষ কম প্রতিশ্রুতি দিয়ে বেশি কাজ করে, সে সমাজ এগিয়ে যায়। আর যে সমাজে প্রতিশ্রুতির শব্দ যত বড়, কাজের ফল তত ছোট- সেখানে একসময় মানুষ কথার ওপর আস্থা হারায়।
আমরা এমন একটি বাংলাদেশ চাই, যেখানে রাজনীতিকের বক্তৃতা তার কাজের সঙ্গে মেলে, প্রশাসনের ঘোষণা বাস্তব সেবায় রূপ নেয়, নাগরিকের দেশপ্রেম আচরণে প্রকাশ পায় এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নৈতিকতা বাস্তব জীবনেও দেখা যায়। কুসুমকুমারী দাশের সেই আকাক্সক্ষা আজও প্রাসঙ্গিক- ‘কথায় না বড় হয়ে কাজে বড়’ হওয়া মানুষ কবে আমরা সত্যিই বেশি দেখতে পাব? সেদিন হয়তো আমাদের সভা-সমাবেশে বক্তৃতা কিছতা কমবে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উপদেশ কিছতা কমবে, টক শোতে তর্কও হয়তো একটু কমবে। কিন্তু রাস্তা ভালো হবে, সেবা দ্রুত হবে, প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী হবে, মানুষের আস্থা বাড়বে। আর তখন হয়তো আমরা বুঝব—দেশ বদলায় সবচেয়ে জোরে বলা কথায় নয়; সবচেয়ে নীরবে করা কাজেই।
লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট
(মতামত লেখকের সম্পূর্ণ নিজস্ব)