গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
রোববার, ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

মেনু

স্পেনের সোনালি প্রত্যাবর্তন, মেসির স্বপ্নভাঙা বিশ্বকাপ

ক্রীড়া ডেস্ক

ক্রীড়া ডেস্ক

প্রকাশিত: ২১:৩২ পিএম, ২০ জুলাই ২০২৬ | আপডেট: ১৬:১০ এএম ২০২৬
স্পেনের সোনালি প্রত্যাবর্তন, মেসির স্বপ্নভাঙা বিশ্বকাপ
ছবি

বিশ্বচ্যাম্পিয়ন স্পেনের উল্লাস -ছবি রয়টার্স

ফুটবল কখনো কখনো শুধু একটি খেলা থাকে না; এটি হয়ে ওঠে কোটি মানুষের স্বপ্ন, আবেগ, আনন্দ আর অশ্রুর মহাকাব্য। নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে রোববার (১৯ জুলাই) দিবাগত মধ্যরাতে তেমনই এক ইতিহাসের জন্ম হলো। একদিকে ছিল লিওনেল মেসির শেষ বিশ্বকাপ স্বপ্নপূরণের আকুতি, অন্যদিকে ছিল নতুন প্রজন্মের স্পেনের অপরাজেয় আত্মবিশ্বাস। শেষ পর্যন্ত জয় হলো সেই ফুটবলের, যে ফুটবল সৌন্দর্য, শৃঙ্খলা, কৌশল ও দলগত ঐক্যের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে।

আর্জেন্টিনাকে ১-০ গোলে হারিয়ে ১৬ বছর পর আবারো বিশ্বকাপের সোনালি ট্রফি উঁচিয়ে ধরেছে স্পেন। অতিরিক্ত সময়ের ১০৬তম মিনিটে ফেরান তোরেসের একমাত্র গোলে বর্তমান চ্যাম্পিয়নদের স্বপ্ন ভেঙে দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বসেরার মুকুট পরেছে লা রোজারা।

স্কোরলাইন বলছে, ব্যবধান মাত্র এক গোল। কিন্তু মাঠের গল্প ছিল অনেক বড়। এটি ছিল স্পেনের আধিপত্যের, নিখুঁত দলগত ফুটবলের এবং সত্যিকারের সুন্দর খেলার জয়। পুরো ম্যাচজুড়ে বলের নিয়ন্ত্রণ, আক্রমণের ধার, মাঝমাঠের কর্তৃত্ব এবং কৌশলগত শ্রেষ্ঠত্বে স্পেনই ছিল এগিয়ে।

মেসির চোখে ছিল শেষবারের মতো বিশ্বকাপ ট্রফি ছোঁয়ার স্বপ্ন। ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপে শিরোপা জয়ের পর এবার চেয়েছিলেন আরো একটি ইতিহাস লিখতে। ৩৯ বছর বয়সী আর্জেন্টাইন জাদুকর জানতেন, এটাই হয়তো তাঁর শেষ বিশ্বকাপের মঞ্চ। কিন্তু ফুটবল আবারো প্রমাণ করল-এই খেলায় ব্যক্তিগত মহিমা যত বড়ই হোক, শেষ কথা বলে দলগত সামর্থ্য।

স্পেনের ছন্দে আটকে গেল আর্জেন্টিনা: শুরু থেকেই ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নেয় স্পেন। ছোট ছোট পাস, দ্রুত বল আদান-প্রদান, মাঝমাঠে আধিপত্য এবং দুই প্রান্ত দিয়ে ধারালো আক্রমণে আর্জেন্টিনাকে শুরু থেকেই চাপে রাখে তারা।

প্রথম পাঁচ মিনিটেই দুইবার আর্জেন্টিনার রক্ষণে ভয় তৈরি করে স্পেন। দানি ওলমোর পাস থেকে লামিন ইয়ামালের কোনাকুনি শট দুর্দান্ত দক্ষতায় ঠেকিয়ে দেন এমিলিয়ানো মার্তিনেজ। এরপরও একের পর এক সুযোগ তৈরি করে স্পেন, আর প্রতিবারই আর্জেন্টিনাকে বাঁচাতে এগিয়ে আসেন বিশ্বকাপজয়ী গোলরক্ষক।

পরিসংখ্যানও ছিল স্পেনের আধিপত্যের সাক্ষ্য। প্রায় ৬৫ শতাংশ সময় বল নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখে স্পেন গোলের জন্য নেয় ২০টি শট, যার ১২টি ছিল লক্ষ্যে। বিপরীতে আর্জেন্টিনা পুরো ম্যাচে মাত্র দুটি শট নিতে পারে, একটিও ছিল না লক্ষ্যে।

বিশ্বকাপ ফাইনালের মতো মঞ্চে এই পরিসংখ্যানই বলে দেয়, কোন দল ম্যাচের নিয়ন্ত্রণে ছিল।

মেসিকে ঘিরে স্পেনের নিখুঁত পরিকল্পনা: বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম সেরা খেলোয়াড় লিওনেল মেসিকে থামানো প্রায় অসম্ভব-এমন ধারণা ছিল অনেকের। কিন্তু ফাইনালের রাতে স্পেন দেখিয়ে দিলো, নিখুঁত পরিকল্পনা ও সম্মিলিত প্রয়াস থাকলে বড় তারকাকেও আটকে রাখা যায়।

রদ্রি, দানি ওলমো, পাউ কুবার্সি, মার্ক কুকুরেয়া এবং স্পেনের পুরো রক্ষণভাগ মিলে মেসির জন্য তৈরি করে কঠিন এক দেয়াল। আর্জেন্টাইন অধিনায়ক চেষ্টা করেছেন, সতীর্থদের উজ্জীবিত করেছেন, কিন্তু নিজের চেনা জাদু দেখানোর মতো জায়গা খুব কমই পেয়েছেন।

মেসিকে ঘিরে থাকা কোটি সমর্থকের স্বপ্নও ধীরে ধীরে রূপ নেয় এক গভীর অপেক্ষায়। কিন্তু সেই অপেক্ষার শেষটা এবার হলো বিষণ্নতায়।

মার্তিনেজের দেয়াল ভাঙলেন ফেরান: স্পেনের একের পর এক আক্রমণের সামনে বারবার প্রাচীর হয়ে দাঁড়ান এমিলিয়ানো মার্তিনেজ। নিকো উইলিয়ামস, লামিন ইয়ামাল ও মিকেল ওইয়ারসাবালের বেশ কয়েকটি নিশ্চিত গোলের প্রচেষ্টা ফিরিয়ে দিয়ে তিনি আর্জেন্টিনাকে ম্যাচে টিকিয়ে রাখেন।

কিন্তু একজন গোলরক্ষক আর কতক্ষণ একটি দলকে বাঁচিয়ে রাখতে পারেন?

নির্ধারিত ৯০ মিনিট শেষ হয় গোলশূন্য সমতায়। অতিরিক্ত সময়েও স্পেনের আক্রমণের চাপ অব্যাহত থাকে। অবশেষে আসে সেই কাঙ্ক্ষিত মুহূর্ত।

১০৬তম মিনিটে ডান দিক থেকে পেদ্রো পররোর বাড়ানো ক্রস দূরের পোস্টে নিয়ন্ত্রণে নেন নিকো উইলিয়ামস। অসাধারণ দক্ষতায় বল নামিয়ে ফেরান তোরেসের সামনে তুলে দেন তিনি। এক মুহূর্ত দেরি না করে ডান পায়ের শক্তিশালী শটে মার্তিনেজকে পরাস্ত করেন বার্সেলোনা ফরোয়ার্ড।

সেই এক গোলেই লেখা হয়ে যায় বিশ্বজয়ের ইতিহাস।

শেষ মুহূর্তে মুছে গেল আর্জেন্টিনার আশা: গোল হজমের পরও হাল ছাড়েনি আর্জেন্টিনা। মেসি শেষ পর্যন্ত লড়েছেন। ১১৫তম মিনিটে তাঁর অসাধারণ ক্রস প্রায় গোলের ঠিকানা খুঁজে নিয়েছিল। কর্নার ও ফ্রি-কিক থেকে সমতা ফেরানোর মরিয়া চেষ্টাও করেছে তারা।

কিন্তু ভাগ্য এবার আর্জেন্টিনার পাশে ছিল না।

এর আগে নির্ধারিত সময়ের যোগ করা মিনিটে দ্বিতীয় হলুদ কার্ড দেখে মাঠ ছাড়েন এনজো ফার্নান্দেজ। ১০ জনের দলে পরিণত হওয়ার পর আরো কঠিন হয়ে যায় মেসিদের পথ। শেষ পর্যন্ত স্পেনের সংগঠিত রক্ষণ ভাঙতে পারেনি তারা।

শেষ বাঁশি বাজার পর একদিকে শুরু হয় স্পেনের লাল-হলুদ উৎসব, অন্যদিকে নেমে আসে আর্জেন্টিনার নীরবতা। মেসির মুখে ছিল অপূর্ণ স্বপ্নের গভীর বেদনা।

বিশ্বকাপের মঞ্চে অসংখ্য স্মৃতি, রেকর্ড ও সাফল্যের পরও আরেকটি শিরোপা অধরাই থেকে গেল তাঁর।

তবে এই পরাজয় মেসির মহত্ত্বকে একটুও ম্লান করবে না। তিনি ফুটবলকে দিয়েছেন এক যুগের অনন্য সৌন্দর্য, আর ফুটবল তাঁকে দিয়েছে সর্বকালের সেরাদের কাতারে অমর স্থান। এবারের বিশ্বকাপেও আট গোল করে তিনি প্রমাণ করেছেন, বয়স শুধু একটি সংখ্যা।

দলগত ফুটবলের বিশ্বজয়: অন্যদিকে স্পেন প্রমাণ করেছে, ফুটবলে শুধু তারকার সমাবেশ নয়, প্রয়োজন একটি পরিপূর্ণ দল। রদ্রির নেতৃত্ব, তরুণদের সাহস, রক্ষণভাগের দৃঢ়তা এবং কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তের কৌশল-সব মিলিয়ে তৈরি হয়েছে বিশ্বজয়ী এক দল।

পুরো আসরে মাত্র একটি গোল হজম করে স্পেন গড়েছে বিশ্বকাপজয়ী দলের সর্বনিম্ন গোল হজমের নতুন রেকর্ড। আক্রমণ যেমন ম্যাচ জেতায়, তেমনি রক্ষণ যে ট্রফি জেতায়-স্পেন সেটিই আবারো প্রমাণ করেছে।

বিশ্বকাপ, ইউরো ও ধারাবাহিক সাফল্যের এই পথচলায় স্পেন জানান দিলো, তাদের ফুটবলের ভবিষ্যৎও উজ্জ্বল।

একদিকে স্পেনের সোনালি উৎসব, অন্যদিকে মেসির স্বপ্নভাঙা রাত-২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনাল তাই শুধু একটি ম্যাচের ফল নয়, এটি হয়ে থাকবে ফুটবল ইতিহাসের এক চিরস্মরণীয় অধ্যায়।

একজন কিংবদন্তির স্বপ্ন থেমেছে, আরেকটি প্রজন্মের স্বপ্নের সূচনা হয়েছে। ফুটবল আবারো প্রমাণ করেছে-শেষ হাসি সেই দলেরই হয়, যারা মাঠে সবচেয়ে সুন্দর গল্পটি লিখতে পারে।

ফাইনালের ফলাফল: আর্জেন্টিনা ০-১ স্পেন (অতিরিক্ত সময়)।
গোল: ফেরান তোরেস (১০৬ মিনিট)
বিশ্বচ্যাম্পিয়ন: স্পেন
রানার্সআপ: আর্জেন্টিনা
সানা/আপ্র/২০/৭/২০২৬
 

সংশ্লিষ্ট খবর

যে কারণে ‘যুক্তরাষ্ট্রের ক্রিকেট’কে ক্রিকেট বলতে নারাজ পন্টিং
০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

যে কারণে ‘যুক্তরাষ্ট্রের ক্রিকেট’কে ক্রিকেট বলতে নারাজ পন্টিং

২০২৪ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের সহ-আয়োজক ছিল যুক্তরাষ্ট্র। লক্ষ্যটা পরিষ্কার– বেসবল ও সকারের দেশে ক্রিকে...

বাংলাদেশি বংশোদ্ভুত কাভান সুলিভানের আরেকটি রেকর্ড
০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

বাংলাদেশি বংশোদ্ভুত কাভান সুলিভানের আরেকটি রেকর্ড

আগের ম্যাচে মেজর লিগ সকারের (এমএলএস) ইতিহাসে সর্বকনিষ্ঠ (১৬ বছর ৩৩৬ দিন) ফুটবলার হিসেবে টানা চার ম্য...

২০৩০ সাল পর্যন্ত পিএসজিতেই থাকছেন এনরিকে
০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

২০৩০ সাল পর্যন্ত পিএসজিতেই থাকছেন এনরিকে

দুটি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জেতানো কোচ লুইস এনরিকের সঙ্গে চুক্তির মেয়াদ আরও বাড়িয়েছে পিএসজি। আগামী ২০৩০ সা...

বিতর্কের মধ্যেও ইনফান্তিনোর পাশে আফ্রিকার ফুটবল কর্তারা
০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

বিতর্কের মধ্যেও ইনফান্তিনোর পাশে আফ্রিকার ফুটবল কর্তারা

সাম্প্রতিক সময়ে ফিফা সভাপতির দায়িত্ব নিয়ে চরম বিপদের মুখে থাকলেও জিয়ান্নি ইনফান্তিনো শুরু থেকেই পাশে...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

র‌্যাব বিলুপ্ত করে এসআরবি গঠনের বিল সংসদে

র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন বিলুপ্ত করে পুলিশের আওতাধীন ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন’ নামে নতুন একটি বিশেষায়িত ইউনিট গঠনের বিধান রেখে ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন আইন, ২০২৬’-এর বিল জাতীয় সংসদে উত্থাপন করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনের চতুর্থ দিনে বিলটি সংসদে উত্থাপন করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। এ সময় সংসদের বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন ভারপ্রাপ্ত স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল। প্রিয় পাঠক, আপনি মনে করেন র‌্যাব বিলুপ্তির এই উদ্যোগ সঠিক?

মোট ভোট: ১ | শেষ আপডেট: 2 দিন আগে