মা-বাবা, ভাই-বোন আর সন্তান মিলেই সৃষ্টি হয় পরিবার। এক সময় পরিবারের সদস্যদের দিনের গল্প শুরু হতো একসঙ্গে বসে। অফিসে কী কী হলো সে কথা বলতেন বাবা। মা গল্প করতেন সংসারের নানা বিষয় নিয়ে। সন্তান শোনাত স্কুলের ঘটনা। সন্ধ্যার পর জমত পারিবারিক আড্ডা। সবাই মিলে টেলিভিশন দেখা, চা-নাশতা খেতে খেতে গল্পে মেতে ওঠা কিংবা ছুটির দিনে একসঙ্গে বাইরে ঘুরতে যাওয়া ছিল পারিবারিক স্বাভাবিক জীবনের অংশ। এখন ঘরভর্তি মানুষ। অথচ নেই তেমন কথাবার্তা। সবাই নিজ নিজ ছোট্ট জগতে বন্দি। বর্তমানে পরিবার আছে ঠিকই কিন্তু নেই ওই বন্ধন। এ বিষয় নিয়েই এবারের লাইফস্টাইল পাতার প্রধান ফিচার
সকালে ঘুম থেকে উঠেই দিন শুরু হয় ফোন হাতে নিয়ে। খাবার টেবিলে বসেও ফোন দেখা, অবসরে ফোন স্ক্রল করা। এমনকি ঘুমাতে যাওয়ার আগেও ফোন হাতে নিয়ে বিছানায় যাওয়া। পরিবারের মানুষগুলো পাশাপাশি বসে থেকেও যেন একে অপরের থেকে ক্রমেই দূরে সরে যাচ্ছে। আর এই দূরত্ব সৃষ্টির প্রধান ভিলেনের ভূমিকা পালন করছে স্মার্টফোন নামক গ্যাজেট।
পাশে থেকেও যেন নেই: স্মার্টফোনের সবচেয়ে বড় প্রভাব হয়ত এখানেই। মানুষ শারীরিকভাবে পাশাপাশি থাকলেও মানসিকভাবে উপস্থিত থাকে না। পরিবারের কেউ একজন হয়ত আবেগ নিয়ে কথা বলছেন। অথচ অন্যজন ফোনের পর্দায় চোখ রেখে ‘হুম’, ‘আচ্ছা’ বলে যাচ্ছেন। কথোপকথন চলে ঠিকই কিন্তু নেই মনোযোগ। একজন সন্তান হয়তো মায়ের সঙ্গে কথা বলতে চাইছে। কিন্তু মা ব্যস্ত ফেসবুক স্ক্রল করাতে। বাবা হয়তো দিনের অভিজ্ঞতা বলতে চাইছেন। সন্তান তখন মগ্ন অনলাইন গেমে। ভাই-বোন একই ঘরে থেকেও একে অপরের সঙ্গে কথা না বলে চ্যাট করছে অন্য কারও সঙ্গে। এভাবে ধীরে ধীরে পরিবারে কথাবার্তা কমে যায়। সেসঙ্গে কমে বোঝাপড়াও।
সন্তানের সঙ্গে বাড়ছে মা-বাবার দূরত্ব: স্মার্টফোনের অতিরিক্ত ব্যবহার শুধু বড়দের নয়, শিশুদের সঙ্গেও বাবা-মায়ের দূরত্বও বাড়াচ্ছে। অনেক বাবা-মা সন্তানকে নিজে সময় দেওয়ার বদলে ফোন হাতে দিয়ে ব্যস্ত রাখেন। আবার সন্তানও বড় হতে হতে নিজের আলাদা ডিজিটাল জগৎ তৈরি করে ফেলে। ফলে একই পরিবারে থেকেও বাবা-মা জানেন না সন্তানের মনের ভেতর কী চলছে। সন্তানও অনেক সময় তার ভয়, দুশ্চিন্তা, কষ্ট কিংবা আনন্দের কথা বাবা-মাকে না বলে অনলাইনের বন্ধুদের সঙ্গে ভাগ করে নেয়। এই দূরত্ব একদিনে তৈরি হয় না। প্রতিদিনের ছোট ছোট অবহেলা, ‘এখন না, পরে কথা বলব’, ‘একটু অপেক্ষা করো’, ‘ফোনটা দেখি’- এমন ছোট ছোট আচরণেই সম্পর্কের উষ্ণতা কমতে থাকে।
যোগাযোগ বাড়ছে ভার্চুয়ালি, কমছে বাস্তবে: স্মার্টফোন আমাদের দূরের মানুষদের কাছে এনে দিয়েছে। পৃথিবীর অন্য প্রান্তে থাকা প্রিয়জনের সঙ্গে চাইলেই কথা বলা যাচ্ছে এই যন্ত্রের মাধ্যমে। অবশ্যই এটি প্রযুক্তির অন্যতম বড় সুবিধা। কিন্তু সমস্যা তখনই তৈরি হয় যখন ভার্চুয়াল যোগাযোগ বাস্তব সম্পর্কের জায়গা দখল করে নেয়। অনলাইনে শত শত বন্ধু থাকলেও পাশে থাকা মানুষটির সঙ্গে কথা বলার সময় নেই। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অন্যের জীবনের খবর জানা হচ্ছে, অথচ নিজের পরিবারের সদস্যের দিন কেমন গেল- সেটি জানার আগ্রহ কমে যাচ্ছে। মানুষের জীবনে প্রযুক্তি যতটা জায়গা করে নিচ্ছে, ততটাই যেন কমে যাচ্ছে একে অন্যকে সময় দেওয়ার অভ্যাস।
সম্পর্ক বাঁচাতে করণীয়: স্মার্টফোন ছেড়ে দেওয়া সম্ভব নয়, তার প্রয়োজনও নেই। বরং ফোন আর বাস্তব জীবনের ভারসাম্য তৈরি করা জরুরি। পরিবারে প্রতিদিন কিছু সময় ‘ফোনমুক্ত সময়’ রাখা যেতে পারে। খাবারের সময় ফোন দূরে রাখা, ঘুমানোর আগে পরিবারের সঙ্গে কথা বলা, সপ্তাহে অন্তত একটি দিন সবাই একসঙ্গে সময় কাটানো- এসব ছোট উদ্যোগ বড় পরিবর্তন আনতে পারে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, পরিবারের মানুষকে সশরীরে সময় দেওয়া। শুধু একই ঘরে থাকা নয়; মনোযোগ দিয়ে একে অন্যের কথা শোনা, চোখে চোখ রাখা, কথা বলার মতো বিষয়গুলোই সম্পর্ককে জীবন্ত রাখে।
স্মার্টফোন আমাদের পৃথিবীকে হাতের মুঠোয় এনে দিয়েছে এ কথা সত্য। তবে সেই মুঠো থেকে যেন কাছের মানুষগুলো হারিয়ে না যায় সেদিকে নজর দিতে হবে। নয়তো একসময় স্মার্টফোন থাকলেও পরিবারের মানুষগুলো নিজের থাকবে না। আর তখন বিশাল এই পৃথিবীতে নিজেকে ভীষণ একা মনে হবে।
কেএমএএ/আপ্র/২০.০৭.২০২৬