চট্টগ্রামের শিশু আবিদা সুলতানা আয়নী হত্যা মামলায় আসামি মো. রুবেলের মৃত্যুদণ্ডের রায়ে স্বস্তি ফিরেছে পরিবারে। তবে সন্তান হারানোর গভীর ক্ষত কোনো বিচারেই পূরণ হওয়ার নয় বলে জানিয়েছেন আয়নীর মা মোছাম্মৎ বিবি ফাতেমা। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেছেন, “আমার মেয়ে তো আর ফিরবে না। এভাবে আর কোনো মেয়ের যেন মৃত্যু না হয়।” সোমবার (২০ জুলাই) চট্টগ্রামের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-২-এর বিচারক মোহাম্মদ সাইফুর রহমান আয়নী হত্যা মামলার রায় ঘোষণা করেন।
রায়ে হত্যার দায়ে মো. রুবেলকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। পাশাপাশি অপহরণের অভিযোগে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে ১০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। প্রতিটি ধারায় ৫ হাজার টাকা করে অর্থদণ্ডও করা হয়েছে।
রায় ঘোষণার পর আদালত প্রাঙ্গণে কান্নায় ভেঙে পড়েন আয়নীর পরিবারের সদস্যরা। তাদের চোখে ছিল দীর্ঘ অপেক্ষার পর বিচার পাওয়ার স্বস্তি, আবার ছিল প্রিয় সন্তানকে হারানোর অসহনীয় বেদনা।
চট্টগ্রামের পাহাড়তলী এলাকার আব্দুল হাদি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল আয়নী। পাহাড়তলীর আব্দুর কাজীর দীঘির পাড় এলাকায় পরিবারের সঙ্গে থাকত সে। তার মা ফাতেমা পোশাক কারখানায় কাজ করতেন, আর বাবা ঢাকার একটি পোশাক কারখানায় কর্মরত ছিলেন।
মামলার তথ্য অনুযায়ী ২০২৩ সালের ২১ মার্চ বিকেল থেকে নিখোঁজ হয় আয়নী। অনেক খোঁজাখুঁজির পরও সন্ধান না পেয়ে পরিবার থানায় সাধারণ ডায়েরি করে। কিন্তু কোনো অগ্রগতি না হওয়ায় সাত দিন পর ২৮ মার্চ আদালতে গিয়ে অপহরণের মামলা করেন আয়নীর মা। পরে আদালতের নির্দেশে পাহাড়তলী থানায় মামলাটি এজাহার হিসেবে গ্রহণ করা হয়।
মামলায় প্রতিবেশী সবজি বিক্রেতা ৩৫ বছর বয়সী মো. রুবেলকে আসামি করা হয়। পরে তাকে গ্রেফতার করে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে আয়নীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
মামলার এজাহারে আয়নীর মা জানিয়েছিলেন, ঘটনার কয়েক দিন আগে স্কুলের এক বান্ধবী বিড়ালছানা কিনেছে জানতে পেরে আয়নীও একটি বিড়ালছানা কিনে দেওয়ার আবদার করেছিল। মা তাকে বলেছিলেন, বেতন পাওয়ার পর বিড়ালছানা কিনে দেবেন।
আয়নীর ওই ছোট্ট আবদারই যেন পরিণত হয়েছিল ভয়াবহ ট্র্যাজেডিতে।
তদন্তে উঠে আসে, ২০২৩ সালের ২০ মার্চ রাস্তায় বিড়ালছানা ধরতে গিয়ে আয়নীর সঙ্গে রুবেলের পরিচয় হয়। বিড়ালছানা এনে দেওয়ার কথা বলে রুবেল তার সঙ্গে কথা বলে। পরদিন ২১ মার্চ বিকেলে আবার দেখা হলে বিড়ালছানা দেওয়ার কথা বলে রুবেল আয়নীকে একটি ফাঁকা বাসায় নিয়ে যায়।
পিবিআইয়ের তদন্ত অনুযায়ী, ওই বাসায় নিয়ে গিয়ে রুবেল শিশুটির ওপর নির্যাতনের চেষ্টা করে। আয়নী চিৎকার করে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করলে তাকে ভয়ভীতি দেখানো হয়। বিষয়টি প্রকাশ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় তাকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয় বলে তদন্তে উঠে আসে। পরে রুবেল মরদেহটি বস্তায় ভরে একটি ডোবায় ফেলে দেয় বলে তদন্তে জানা যায়।
রায়ের পর রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী মাহমুদ-উল আলম চৌধুরী মারুফ বলেন, আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হওয়ায় আদালত সর্বোচ্চ সাজা দিয়েছেন। আদালত পর্যবেক্ষণে বলেছে, এটি সাড়ে দশ বছরের একটি শিশুকে হত্যার নির্মম ঘটনা এবং আসামির মধ্যে কোনো অনুশোচনা দেখা যায়নি। তিনি বলেন, “যখন ভিকটিমের মা থানায় গিয়েছিলেন, তখন যদি মামলা গ্রহণ করা হতো, তাহলে হয়তো শিশুটিকে উদ্ধার করা সম্ভব হতো।”
বাদীপক্ষের আইনজীবী গোলাম মাওলা মুরাদ বলেন, “আয়নী একটি ছোট্ট শিশু। তার আনন্দের একটি উপাদান ছিল বিড়ালছানা। একটি বিড়ালছানার জন্য তার জীবনটা চলে যাওয়া কত বড় নিষ্ঠুরতা।” তিনি বলেন, “একটি শিশুকে ধর্ষণের চেষ্টা করে হত্যা করা হয়েছে। এরপর আট দিন তার মরদেহ মাটির নিচে পুঁতে রাখা হয়েছিল। সাড়ে তিন বছর পর আজ বিচার হয়েছে। সত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।”
আয়নীর মা ফাতেমা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, কোনো ভুক্তভোগী অভিযোগ নিয়ে থানায় গেলে তা যেন গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়া হয়। একই সঙ্গে তিনি সহযোগিতার জন্য পিবিআই ও সিআইডির প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান।
আয়নীর দাদা শাহানা বেগম বলেন, “আমি দ্রুত রুবেলের ফাঁসি চাই। আমার নাতনি তো আর ফিরবে না। আমি খুনির ফাঁসি চাই, আর কিছু চাই না।”
একটি শিশুর নির্মম হত্যাকাণ্ডের বিচার শুধু একটি পরিবারের অপেক্ষার অবসান নয়, বরং শিশু নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতি নতুন করে এক কঠিন প্রশ্নও রেখে গেল।
সানা/ডিসি/আপ্র/২০/৭/২০২৬