গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
রোববার, ৩১ মে ২০২৬

মেনু

বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর উদ্যোগ

সীমান্তে মানুষের ভিড়, পুশ-ইন বিতর্কে নতুন উত্তাপ

প্রত্যাশা ডেস্ক

প্রত্যাশা ডেস্ক

প্রকাশিত: ১০:২৩ পিএম, ৩১ মে ২০২৬ | আপডেট: ১১:০৮ এএম ২০২৬
সীমান্তে মানুষের ভিড়, পুশ-ইন বিতর্কে নতুন উত্তাপ
ছবি

পশ্চিমবঙ্গের উত্তর ২৪ পরগনা জেলার হাকিমপুর সীমান্তে বাংলাদেশে প্রবেশের জন্য জড়ো হওয়া লোকজনের একাংশ -ছবি আইএএনএস

ভারতের পশ্চিমবঙ্গে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে সীমান্ত পরিস্থিতি আবারও আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে। কথিত ‘অবৈধ অভিবাসী’ ও ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী’ শনাক্তের নামে বাংলা ভাষাভাষী মানুষকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর উদ্যোগ, সীমান্তবর্তী এলাকায় অস্থায়ী হোল্ডিং সেন্টার স্থাপন, বিপুলসংখ্যক মানুষের সীমান্তমুখী হওয়া এবং পুশ-ইন নিয়ে অভিযোগ—সব মিলিয়ে তৈরি হয়েছে নতুন উদ্বেগ। বিষয়টি এখন শুধু অভিবাসন বা সীমান্ত ব্যবস্থাপনার প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নেই; বরং মানবাধিকার, নাগরিক পরিচয়, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং বাংলাদেশ-ভারত কূটনৈতিক সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে পরিণত হয়েছে।

সীমান্তে মানুষের ভিড়
পশ্চিমবঙ্গের উত্তর ২৪ পরগনার হাকিমপুর সীমান্তে গত কয়েকদিন ধরে বাংলাদেশে প্রবেশের উদ্দেশ্যে বহু মানুষ জড়ো হচ্ছেন। রাজ্য সরকার তাদের সাময়িকভাবে রাখার জন্য তিনটি অস্থায়ী কেন্দ্র স্থাপন করেছে। স্থানীয় প্রশাসনের দাবি, সীমান্ত রক্ষী বাহিনীর হাতে তুলে দেওয়ার আগে প্রত্যেকের পরিচয় ও নথিপত্র যাচাই করা হবে।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ইতোমধ্যে প্রায় ৩০০ জন ব্যক্তি হাকিমপুর সীমান্তে পৌঁছেছেন। তবে তাদের প্রকৃত পরিচয় নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত কাউকে বাংলাদেশে পাঠানো হবে না। প্রশাসনের ভাষ্য অনুযায়ী, শুধুমাত্র প্রকৃত বাংলাদেশিরাই যেন সীমান্ত অতিক্রম করতে পারেন, তা নিশ্চিত করতে শারীরিক ও নথিগত যাচাই-বাছাই চলছে।

রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর নতুন পরিস্থিতি
মে মাসের শুরুতে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির নেতৃত্বে নতুন সরকার গঠনের পর পরিস্থিতি আরও আলোচনায় আসে। নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বিতর্কিত নাগরিকত্ব সংশোধন আইন কার্যকরের ঘোষণা দেন এবং সন্দেহভাজন বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা জানান।

একই সঙ্গে রাজ্যের বিভিন্ন জেলায় ‘আটক শিবির’ বা হোল্ডিং সেন্টার গড়ে তোলা হয়। সমালোচকদের মতে, এই পদক্ষেপের ফলে পশ্চিমবঙ্গজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং অনেক মানুষ স্বেচ্ছায় সীমান্তমুখী হতে শুরু করেন।

পরিচয় যাচাই না হওয়া পর্যন্ত আটকে রাখা হচ্ছে
স্থানীয় প্রশাসনের দাবি, সীমান্তে জড়ো হওয়া প্রত্যেক ব্যক্তির পরিচয় নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত তাদের বাংলাদেশে পাঠানো হবে না। যারা তাৎক্ষণিকভাবে নিজেদের বাংলাদেশি পরিচয় প্রমাণ করতে পারছেন না, তাদের হোল্ডিং সেন্টারে রাখা হচ্ছে।

উত্তর ২৪ পরগনার এক জ্যেষ্ঠ পুলিশ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, প্রায় ৩০০ জনকে আটক রাখা হয়েছে এবং তাদের নথিপত্র যাচাইয়ের কাজ এখনও চলছে। তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত কাউকে আনুষ্ঠানিকভাবে সীমান্ত পার করানো হয়নি কিংবা সীমান্ত রক্ষী বাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হয়নি।

অস্থায়ী শিবিরে নারী-শিশুসহ শত শত মানুষ
ক্রমবর্ধমান সংখ্যক মানুষের চাপ সামাল দিতে প্রথমে তেঁতুলিয়ার একটি মোটেলকে হোল্ডিং সেন্টারে রূপান্তর করা হয়। পরে আরও দুটি কেন্দ্র চালু করতে হয়। প্রশাসনের দাবি, এসব কেন্দ্রে নারী, শিশু ও বৃদ্ধদের জন্য থাকা, খাওয়া এবং চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়েছে।

সরকারি কর্মকর্তারা বলছেন, সীমান্ত রক্ষী বাহিনী ও বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সমন্বয়ের মাধ্যমে পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পরই প্রত্যাবর্তনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হবে।

পরিচয়ের সংকটে বাংলা ভাষাভাষীরা
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর অভিযোগ, ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে চলমান ‘বাংলাদেশি শনাক্তকরণ’ অভিযানে অনেক ক্ষেত্রে ভাষা, ধর্ম কিংবা আর্থসামাজিক অবস্থান সন্দেহের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

বিশেষ করে দরিদ্র বাংলা ভাষাভাষী শ্রমজীবী মানুষদের নাগরিকত্ব প্রমাণে নানা জটিলতার মুখে পড়তে হচ্ছে। বন্যা, নদীভাঙন ও দারিদ্র্যের কারণে বহু পরিবার পুরোনো নথিপত্র হারিয়ে ফেলেছে। ফলে নিজেদের নাগরিকত্ব প্রমাণ করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, অনেক ক্ষেত্রে আনুষ্ঠানিক প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার পরিবর্তে বিতর্কিত ও অনানুষ্ঠানিক পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়। ডিটেনশন ক্যাম্পে দীর্ঘদিন আটকে রেখে মানসিক চাপ সৃষ্টি এবং পরে অনেককে নিজেদের বাংলাদেশি পরিচয় স্বীকারে বাধ্য করার অভিযোগও রয়েছে।

বাড়ছে দালাল চক্রের তৎপরতা
সীমান্ত পর্যবেক্ষকদের মতে, এই সংকটের সঙ্গে একটি শক্তিশালী দালাল অর্থনীতিও জড়িয়ে আছে। আটকের ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায়, জাল পরিচয়পত্র তৈরি এবং অবৈধ সীমান্ত পারাপারের নেটওয়ার্ক পরিচালনার অভিযোগ রয়েছে বিভিন্ন সংঘবদ্ধ চক্রের বিরুদ্ধে।

বিশ্লেষকদের মতে, অভিবাসন ইস্যুকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই অনানুষ্ঠানিক অর্থনৈতিক কাঠামো পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।

অনিশ্চয়তার মানবিক মূল্য
পুশ-ইন বিতর্কের সবচেয়ে করুণ দিক হলো সীমান্তে আটকে পড়া মানুষের দুর্ভোগ। জিরো লাইন, অস্থায়ী ক্যাম্প, সরকারি গেস্ট হাউস কিংবা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দিন কাটাচ্ছেন নারী, শিশু ও বৃদ্ধরা।

তারা কোন দেশের নাগরিক, কোথায় যাবেন কিংবা তাদের ভবিষ্যৎ কী—এসব প্রশ্নের উত্তর না পাওয়ার অনিশ্চয়তাই তাদের সবচেয়ে বড় মানসিক যন্ত্রণা বলে মনে করছেন মানবাধিকারকর্মীরা।

পরিসংখ্যান যা বলছে
সীমান্তভিত্তিক গবেষণা সংস্থা সপ্রাণ-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ভারত থেকে ২ হাজার ৪৩৬ জনকে বাংলাদেশে পুশ-ইন করার অভিযোগ রয়েছে। এর মধ্যে শুধু মে ও জুন মাসেই ছিল ২ হাজার ২০ জন।

২০২৫ সালের মে মাসে বাংলাদেশ সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতের কাছে এ ধরনের একতরফা পদক্ষেপের প্রতিবাদ জানিয়ে একে ‘অগ্রহণযোগ্য’ বলে উল্লেখ করে।


বাংলাদেশের ওপর বাড়তি চাপ
বিশ্লেষকদের মতে, কক্সবাজারে ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গার ভার বহন করা বাংলাদেশের জন্য নতুন করে বিপুলসংখ্যক মানুষকে গ্রহণ করা প্রশাসনিক ও মানবিক উভয় দিক থেকেই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

এ কারণে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ সীমান্তে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। সরকারের অবস্থানও স্পষ্ট—যাচাই-বাছাই ও আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া ছাড়া কাউকে গ্রহণ করা হবে না।

মানবাধিকার ও কূটনৈতিক উদ্বেগ
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ বলছে, বলপ্রয়োগ করে কাউকে সীমান্তে ঠেলে দেওয়া আন্তর্জাতিক মানবাধিকার নীতি ও আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী। সংস্থাটির মতে, এ ধরনের ঘটনা শুধু মানবিক সংকটই সৃষ্টি করে না, দুই দেশের পারস্পরিক আস্থা ও কূটনৈতিক সম্পর্কেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন পরিস্থিতিকে বাংলাদেশের জন্য ‘অশনিসংকেত’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তাঁর মতে, একতরফা পুশ-ইন কোনো স্থায়ী সমাধান নয়; বরং এটি মানবিক ও ভূরাজনৈতিক সংকটকে আরও গভীর করতে পারে।

‘চাপ সৃষ্টির কৌশল’ দেখছেন বিশ্লেষকরা
সাবেক সেনা কর্মকর্তা ও প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক আবু রুশদ এ আর এম শহিদুল ইসলামের মতে, সীমান্তে সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোকে এক ধরনের ‘চাপ সৃষ্টির কৌশল’ হিসেবে দেখা যেতে পারে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশ সাম্প্রতিক সময়ে কৌশলগত, বাণিজ্যিক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে নতুন উদ্যোগ নিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সম্পর্ক সম্প্রসারণের প্রচেষ্টাও দৃশ্যমান। ভারতের দৃষ্টিতে এসব বিষয় উদ্বেগের কারণ হতে পারে এবং সেই প্রেক্ষাপটে বিভিন্ন ধরনের চাপ প্রয়োগের চেষ্টা দেখা যেতে পারে।

তাঁর মতে, রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক টানাপোড়েনের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হন সীমান্তবর্তী দরিদ্র মানুষ, যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

সরকারের অবস্থান

গত ৬ মে জেলা প্রশাসক সম্মেলন শেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচনী প্রচারণার সময় মুসলিমদের বাংলাদেশে পাঠানোর বক্তব্য শোনা গিয়েছিল। তবে সরকার পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।

তিনি জানান, সম্ভাব্য যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিজিবিকে সতর্ক থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে সরকার সীমান্ত পরিস্থিতির ওপর সার্বক্ষণিক নজর রাখছে।

আস্থার পরীক্ষায় দুই প্রতিবেশী
বিশ্লেষকদের মতে, সীমান্তে চলমান পুশ-ইন বিতর্ক এখন আর শুধু অবৈধ অভিবাসনের প্রশ্ন নয়। এটি নাগরিক পরিচয়, মানবাধিকার, সীমান্ত নিরাপত্তা এবং বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের পারস্পরিক আস্থার একটি বড় পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে।

তাদের মতে, অবৈধ অভিবাসন নিয়ে উদ্বেগ থাকলে তার সমাধান হতে পারে তথ্যভিত্তিক যাচাই, দ্বিপাক্ষিক আলোচনা এবং আন্তর্জাতিক আইনসম্মত প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। অন্যথায় সীমান্তে মানবিক সংকট এবং কূটনৈতিক অস্বস্তি আরও বাড়তে পারে।
সানা/আপ্র/৩১/৫/২০২৬
 

সংশ্লিষ্ট খবর

বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের আত্মত্যাগের প্রশংসা জাতিসংঘের
৩০ মে ২০২৬

বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের আত্মত্যাগের প্রশংসা জাতিসংঘের

অস্থির ও সংঘাতপূর্ণ বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠায় নিয়োজিত চার হাজারেরও বেশি বাংলাদেশি সদস্যসহ ৫০ হাজারের...

কলকাতায় বদলে যাওয়া ঈদের আবহ
২৯ মে ২০২৬

কলকাতায় বদলে যাওয়া ঈদের আবহ

পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর নতুন বাস্তবতায় এবারের কোরবানির ঈদ উদযাপিত হয়েছে ভিন্ন পরিবেশে।...

যুদ্ধবিরতি সম্প্রসারণে সমঝোতা, ট্রাম্পের অনুমোদনের অপেক্ষা
২৯ মে ২০২৬

যুদ্ধবিরতি সম্প্রসারণে সমঝোতা, ট্রাম্পের অনুমোদনের অপেক্ষা

ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাতের প্রেক্ষাপটে যুদ্ধবিরতির মেয়াদ আরও ৬০ দিন বাড়াতে একটি সমঝোতা স্মারকে পৌঁছ...

যুদ্ধক্ষেত্র ও সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে যৌন সহিংসতায় জাতিসংঘের কালো তালিকায় ইসরায়েল
২৮ মে ২০২৬

যুদ্ধক্ষেত্র ও সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে যৌন সহিংসতায় জাতিসংঘের কালো তালিকায় ইসরায়েল

যুদ্ধক্ষেত্র ও সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে যৌন সহিংসতার অভিযোগে ইসরায়েলকে ‘কালো তালিকাভুক্ত’ করেছে জাতিসংঘ। বৃ...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

কোনো সক্রিয় জরিপ নেই