প্রায় দেড় দশকের নেতৃত্বের অধ্যায় শেষ করে অ্যাপলের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা পদ থেকে সরে দাঁড়াচ্ছেন টিম কুক। স্টিভ জবসের পর কোম্পানিটির দায়িত্ব নেওয়া এই শীর্ষ নির্বাহী আগামী ১ সেপ্টেম্বর দায়িত্ব হস্তান্তর করবেন অ্যাপলের হার্ডওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের প্রধান জন টার্নাসের কাছে। দীর্ঘ এই নেতৃত্বপর্বে অ্যাপলকে বৈশ্বিক প্রযুক্তি বাজারে অভাবনীয় উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছেন তিনি।
প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, দায়িত্ব ছাড়লেও টিম কুক অ্যাপলের সঙ্গে যুক্ত থাকবেন এক্সিকিউটিভ চেয়ারম্যান হিসেবে। ফলে তিনি সরাসরি নির্বাহী দায়িত্বে না থাকলেও কৌশলগত পর্যায়ে ভূমিকা অব্যাহত রাখবেন। একই ধরনের কাঠামোর মাধ্যমে পূর্বে আমাজন ও নেটফ্লিক্সের শীর্ষ নেতৃত্বেও পরিবর্তন আনা হয়েছিল।
টিম কুকের নেতৃত্বে অ্যাপল এক অভূতপূর্ব অর্থনৈতিক সাফল্য অর্জন করেছে। আইফোনকেন্দ্রিক প্রবৃদ্ধির মাধ্যমে কোম্পানিটির বাজারমূল্য বৃদ্ধি পেয়ে তিন দশমিক ছয় ট্রিলিয়ন ডলারেরও বেশি হয়েছে, যা প্রযুক্তি শিল্পে অন্যতম বৃহৎ সাফল্য হিসেবে বিবেচিত। বিশ্লেষকদের মতে, স্টিভ জবসের উদ্ভাবনী ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে কুক দক্ষ ব্যবস্থাপনা ও সরবরাহ শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে অ্যাপলকে একটি স্থিতিশীল বৈশ্বিক ব্র্যান্ডে পরিণত করেছেন।
নিজের বিদায়ী বিবৃতিতে টিম কুক বলেন, অ্যাপলের নেতৃত্ব দেওয়া তাঁর জীবনের সর্বোচ্চ প্রাপ্তি। তিনি প্রতিষ্ঠানটির প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেন, এই যাত্রা তাঁর জন্য গর্বের।
অ্যাপলের পরবর্তী প্রধান নির্বাহী জন টার্নাস গত ২৫ বছর ধরে প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে যুক্ত। তিনি আইফোন, আইপ্যাড ও ম্যাকের হার্ডওয়্যার প্রকৌশল বিভাগে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। গত পাঁচ বছরে তিনি এসব পণ্যের প্রযুক্তিগত উন্নয়নের দায়িত্বে ছিলেন, যা তাঁকে ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের প্রধান প্রার্থী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।
দায়িত্ব গ্রহণের পর টার্নাস বলেন, অ্যাপলের লক্ষ্য ও উদ্ভাবনের ধারা এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ পাওয়া তাঁর জন্য গভীর সম্মানের বিষয়।
প্রযুক্তি বিশ্লেষকদের মতে, এই নেতৃত্ব পরিবর্তন এমন এক সময়ে ঘটছে যখন বৈশ্বিক প্রযুক্তি শিল্প কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নির্ভর বড় পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অ্যাপল এ ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে কিছুটা পিছিয়ে পড়লেও নতুন কৌশল গ্রহণের মাধ্যমে সেই ঘাটতি পূরণের চেষ্টা করছে। বিশেষ করে ভার্চুয়াল সহকারী প্রযুক্তির উন্নয়নে বিভিন্ন অংশীদারিত্বের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি পুনরায় প্রতিযোগিতায় ফিরতে চাইছে।
টিম কুকের নেতৃত্বকালকে অ্যাপলের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচনা করা হয়। নব্বইয়ের দশকে আর্থিক সংকটে থাকা প্রতিষ্ঠানটি তাঁর সময়েই বিশ্ব প্রযুক্তি বাজারের অন্যতম শক্তিশালী কোম্পানিতে পরিণত হয়। সরবরাহ ব্যবস্থা, উৎপাদন দক্ষতা এবং বৈশ্বিক বাজার সম্প্রসারণে তাঁর কৌশলগত সিদ্ধান্ত অ্যাপলকে স্থিতিশীল প্রবৃদ্ধির পথে নিয়ে গেছে।
স্টিভ জবসের পর অনেকেই অ্যাপলের ভবিষ্যৎ নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছিলেন। তবে টিম কুক সেই শঙ্কা দূর করে প্রতিষ্ঠানটিকে শুধু টিকিয়ে রাখেননি, বরং বৈশ্বিক নেতৃত্বের অবস্থানে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।
এখন প্রশ্ন উঠছে, জন টার্নাসের নেতৃত্বে অ্যাপল নতুন প্রযুক্তি যুগে-বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রতিযোগিতায়-নিজের অবস্থান কতটা শক্তভাবে ধরে রাখতে পারবে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি হবে অ্যাপলের জন্য পরবর্তী বড় পরীক্ষা।
সানা/ডিসি/আপ্র/২১/৪/২০২৬