ইরানে আবারো হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। হরমুজ প্রণালিতে গুলি করে একটি মার্কিন হেলিকপ্টার ভূপাতিত করার জন্য ইরানকে দায়ি করে সরাসরি হুঁশিয়ারি দেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এ অভিযোগের কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে এই হামলা চালানো হয়।
বুধবার এ তথ্য জানিয়েছে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম)। সামাজিকমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে সেন্টকম জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের পূর্বাঞ্চলীয় সময় বিকেল ৫টা ১৫ মিনিটে এবং ইরানের স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার মধ্যরাতের পর এসব হামলা শুরু হয়।
সেন্টকম আরো জানায়, ইরানের অযাচিত ও অব্যাহত আগ্রাসনের প্রতিক্রিয়ায় এসব হামলা চালানো হয়। তবে ইরানের ঠিক কোথায় হামলা চালানো হয়েছে, তা সুস্পষ্ট করে জানানো হয়নি।
ইরানের সংবাদমাধ্যমের খবর, বন্দরনগরী বন্দর আব্বাসে বড় ধরনের বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। এ ছাড়া কাশেম দ্বীপ, গোরগান, সিরিক ও মিনাবের দক্ষিণের শহরে বিস্ফোরণ ঘটেছে। ইরানের সংবাদ সংস্থা মেহের জানিয়েছে, রাজধানী তেহরানের পশ্চিমাঞ্চলে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় করেছে কর্তৃপক্ষ।
এসব হামলায় হতাহত ও ক্ষয়ক্ষতির খবর প্রাথমিকভাবে জানা যায়নি।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানায়, এই অভিযানটি ইরানের চালানো অন্যায্য আগ্রাসনের বিরুদ্ধে একটি প্রতিক্রিয়া।
পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালির উপকূলজুড়ে বিস্ফোরণের খবর পাওয়া গেছে বলেও জানানো হয়।
সেন্টকম আরো জানিয়েছে, ভূপাতিত হওয়া মার্কিন অ্যাপাচি হেলিকপ্টারের দুই ক্রু সদস্যকে একটি আমেরিকান সি-ড্রোন দিয়ে উদ্ধার করা হয়েছে।
এই প্রথম মার্কিন সামরিক বাহিনী আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করল যে, এমন অভিযানে এই ধরণের যান ব্যবহার করা হয়েছে।
দুইজন পাইলট ছিলেন, তারা উভয়ই নিরাপদে আছেন এবং তাদের কোনো আঘাত লাগেনি। তবুও, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে এই হামলার জবাব দিতেই হবে, সামাজিক মাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে লিখেছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প।
মার্কিন কর্মকর্তাদের দাবি, একটি ড্রোন ব্যবহার করে এই হামলা চালিয়েছে ইরান।
তবে বিবিসির মার্কিন সহযোগী সিবিএস নিউজকে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ইরানের ড্রোনটি ইচ্ছাকৃতভাবে ওই হেলিকপ্টারে হামলা চালিয়েছিল কি না, সেটি এখনো স্পষ্ট নয়।
ইরানি গণমাধ্যমও এই ঘটনা নিশ্চিত করেছে। তবে ইরান বিমানটি ভূপাতিত করার দায় স্বীকার করেনি বলে জানিয়েছে দেশটির আধা-সরকারি মেহর নিউজ এজেন্সি।
হামলার কয়েক ঘণ্টা পর সেন্টকম ঘোষণা করে যে, ইরানকে জবাব দিতে যুক্তরাষ্ট্র ইরানে হামলা চালিয়েছে।
এটিকে ইরানের অন্যায্য আগ্রাসনের আনুপাতিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে অভিহিত করছে তারা।
মার্কিন ওয়েবসাইট এক্সিওস এর তথ্য অনুযায়ী, ইরানের প্রতিরক্ষা ও রাডার ব্যবস্থাকে লক্ষ্য করে নতুন এই হামলাগুলো চালানো হয়েছে।
বন্দর আব্বাস, কেশম এবং সিরিকসহ পারস্য উপসাগরের উপকূলজুড়ে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে বলে জানিয়েছে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম।
এবিসি নিউজকে টেলিফোনে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এই হামলার জন্য ইরানকেই দায়ী করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
তিনি বলেন, আমাদের হেলিকপ্টারের সাথে গত রাতে তারা যা করেছে এটি তার একটি জবাব। আমার মনে হয় এই প্রতিক্রিয়া খুবই শক্তিশালী এবং জোরালো হওয়া উচিত, আর এই হামলাটি ঠিক তেমনই।
ওয়াশিংটনে ফিরে হাউজ স্পিকার মাইক জনসন জানিয়েছেন, ট্রাম্প যখন ইরানের ওপর মার্কিন হামলা পুনরায় শুরুর সিদ্ধান্ত নেন, তখন তিনিও সেখানে উপস্থিত ছিলেন।
এই শীর্ষ রিপাবলিকান নেতা আরো বলেন, এটি যে প্রয়োজনীয় হয়ে পড়েছিল তা দুঃখজনক, তবে এই পরিস্থিতি আমাদেরকে সামাল দিতেই হবে।
এই ঘটনার প্রেক্ষিতে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী যুক্তরাষ্ট্রকে হুমকি দিয়ে বলেছেন যে, তারাও কোনো হামলা বা হুমকিই বিনা জবাবে ফেলে রাখবে না।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি সামাজিক মাধ্যক এক্সে লিখেছেন, যুদ্ধের ময়দানে পরাজয় সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্র আমাদের সংকল্প পরীক্ষা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
যদি নিরাপদ থাকতে চাও, তবে আমাদের অঞ্চল থেকে বেরিয়ে যাও, তিনি আরো যোগ করেন।
ইসরায়েলি বাহিনী মঙ্গলবার দক্ষিণ লেবাননজুড়ে হামলা চালানোর সময় ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের এই সামরিক পদক্ষেপের সম্ভাবনা দেখা দেয়।
তখনই তেহরান সতর্ক করে বলেছিল যে, দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি হামলা পাল্টা হামলার নতুন তরঙ্গ সৃষ্টি করবে।
মঙ্গলবার আরাঘচি বলেন, ইরানের ভূখণ্ডের কাছাকাছি বিদেশি বাহিনী মানবিক ভুল, সাধারণ দুর্ঘটনা কিংবা ভুলবশত গোলাগুলির কবলে পড়ার কারণে সবসময় ঝুঁকির মধ্যে থাকে।
তিনি আরো বলেন, ঝুঁকি কমাতে তাদের (বিদেশি বাহিনী) জন্য সবচেয়ে ভালো সমাধান হলো এই অঞ্চল ত্যাগ করা।
মঙ্গলবার হেলিকপ্টার ভূপাতিত হওয়ার বিষয়ে ট্রাম্পের মন্তব্যের কয়েক মিনিট আগে, সামাজিক মাধ্যমে পাল্টা হামলার ইঙ্গিত দেন- ওয়াশিংটনের সাথে শান্তি আলোচনায় ইরানের শীর্ষ আলোচক মোহাম্মদ বাকের কলিবফ।
তিনি লিখেছেন, আমরা কূটনীতির ভাষাকে প্রাধান্য দেই, কিন্তু আমরা অন্য ভাষাও বেশ ভালোভাবেই বলতে জানি। তোমরা যদি প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করো, তবে আমরা আমাদের আয়ত্তে থাকা সেরা ভাষায় কথা বলব।
উল্লেখ্য, সপ্তাহজুড়ে পাল্টাপাল্টি হামলা শেষে গত এপ্রিলে যে যুদ্ধবিরতি শুরু হয়েছিল তারপর আবারো একে অপরের ওপর হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল ও ইরান।
ট্রাম্প প্রকাশ্যে দুই দেশকেই তাৎক্ষণিকভাবে গুলি চালানো বন্ধ করতে বলেছিলেন কারণ তারা তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যকার আঞ্চলিক যুদ্ধ অবসানের চুক্তিকে ঝুঁকিতে ফেলছিল।
ট্রুথ সোশ্যালে তিনি বলেছিলেন, ইসরায়েল ও ইরান ‘তাৎক্ষণিক যুদ্ধবিরতি’ করতে চাইছে, কিন্তু শান্তি প্রতিষ্ঠার পথে ‘অজ্ঞতা বা বোকামি’ বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
মঙ্গলবার তিনি সাংবাদিকদের আরো বলেন, আমরা এমন একটি চুক্তির একেবারে শেষ পর্যায়ে রয়েছি যা খুবই ভালো হবে।
এটি সম্পন্ন হতে ‘দুই বা তিন দিন’ সময় লাগতে পারে এবং এর পরপরই হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া হবে বলেও যোগ করেন ট্রাম্প।
এর আগে মঙ্গলবারের বিবৃতিতে সেন্টকম জানিয়েছিল যে, সোমবার স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৭টা ৩৩ মিনিটে ভূপাতিত অ্যাপাচি হেলিকপ্টারের দুই ক্রু সদস্যকে উদ্ধার করা হয়।
এই উদ্ধার অভিযানে নেতৃত্ব দেয় ইউএস নেভাল ফোর্সেস সেন্ট্রাল কমান্ড এবং ৮২তম এয়ারবোর্ন ডিভিশন। এতে ইউএস ফিফথ ফ্লিটের টাস্ক ফোর্স ৫৯সহ মার্কিন বিমান ও নৌবাহিনী সহায়তা করে।
সেন্টকমের একজন মুখপাত্র বিবিসিকে জানান, বাহরাইনভিত্তিক- টাস্ক ফোর্স ৫৯ দ্বারা পরিচালিত একটি আনম্যান্ড সারফেস ড্রোন (চালকবিহীন সমুদ্র যান) ক্রু সদস্যদের উদ্ধার করে।
ড্রোনটি সৈন্যদের উদ্ধার করে পানির ওপর অন্য একটি স্থানে নিয়ে যায়, যেখান থেকে পরে তাদের হেলিকপ্টারে তুলে নেওয়া হয়, মুখপাত্র আরো জানান।
সুত্র: এবিসি নিউজ, বিবিসি, ইউরো নিউজ, দ্য গার্ডিয়ান
এসি/আপ্র/১১/০৬/২০২৬