শত বছরেরও বেশি সময় ধরে অমীমাংসিত থাকা জটিল গাণিতিক সমস্যার সমাধানের স্বীকৃতি হিসেবে গণিতের সর্বোচ্চ মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কার ফিল্ডস মেডেল অর্জন করেছেন দুই চীনা গণিতবিদ হং ওয়াং ও ইউ দেং। চীনের গণিতবিদ হিসেবে প্রথমবারের মতো তারা এই সম্মাননা অর্জন করলেন।
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হং ওয়াং ও ইউ দেংয়ের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের জন পারডন এবং কানাডার জ্যাকব সিমারম্যানও এবারের ফিল্ডস মেডেল পেয়েছেন। ৪০ বছরের কম বয়সী অসাধারণ কৃতিত্বপূর্ণ গণিতবিদদের প্রতি চার বছর পর এই পুরস্কার দেওয়া হয়। গণিতের ক্ষেত্রে এ পুরস্কারকে নোবেল পুরস্কারের সমতুল্য মর্যাদা দেওয়া হয়।
গত বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্রে এক অনুষ্ঠানে বিজয়ীদের হাতে পুরস্কারের অর্থ তুলে দেওয়া হয়। প্রত্যেক বিজয়ী পেয়েছেন ১৫ হাজার কানাডীয় ডলার। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যখন মানুষের গণনাশক্তি ও গবেষণার পদ্ধতিকে নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলছে, ঠিক এমন সময়ে এ পুরস্কার প্রদানকে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
চীনা গণিতবিদদের এই অর্জন দেশটির সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। চীনের বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘ফিল্ডস মেডেল’ নিয়ে লাখ লাখ মানুষ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। অনেকেই এটিকে চীনের বৈজ্ঞানিক গবেষণার জন্য ঐতিহাসিক অর্জন হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
হং ওয়াং ও তাঁর সহকর্মী জশ জালের সঙ্গে মিলে ১৯১৭ সালে জাপানি গণিতবিদ সোইচি কাকেয়া উত্থাপিত বিখ্যাত ‘কাকেয়া সমস্যা’র সমাধান করেন। শত বছরের বেশি সময় ধরে গণিতবিদদের কাছে এটি ছিল এক কঠিন চ্যালেঞ্জ।
সমস্যাটির মূল প্রশ্ন ছিল-একটি পেনসিলকে সম্পূর্ণ একবার ঘুরিয়ে নেওয়ার জন্য সেটিকে কতটুকু সর্বনিম্ন ক্ষেত্রফলের মধ্য দিয়ে যেতে হবে। হং ওয়াং ও জাল সমস্যাটিকে নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করেন। তারা দেখান, পেনসিলটি যদি সমতল পৃষ্ঠে না থেকে ত্রিমাত্রিক শূন্যে ভাসমান অবস্থায় থাকে, তাহলে সমস্যাটির সমাধানের নতুন পথ তৈরি হয়। তাঁদের গবেষণা গত বছর প্রকাশিত হয়।
এএফপিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে হং ওয়াং বলেন, এই অনুমানটি মানুষকে আকৃষ্ট করেছে, কারণ বিভিন্ন ক্ষেত্রের অনেক সমস্যার মধ্যেই এ ধরনের গাণিতিক কাঠামোর উপস্থিতি দেখা যায়।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিতের অধ্যাপক ইউ দেং এক শতাব্দী ধরে অমীমাংসিত আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যার সমাধানের জন্য ফিল্ডস মেডেল পেয়েছেন।
১৯০০ সালে জার্মান গণিতবিদ ডেভিড হিলবার্ট যে প্রশ্নটি উত্থাপন করেছিলেন, সেটিই পরে ‘হিলবার্টের ষষ্ঠ সমস্যা’ নামে পরিচিত হয়। পৃথক পৃথক কণার গতিবিধির ওপর ভিত্তি করে কীভাবে একটি বৃহৎ সামগ্রিক ব্যবস্থার আচরণ নির্ণয় করা যায়-এই ছিল সমস্যাটির মূল বিষয়। ইউ দেং গ্যাসের আচরণ বিশ্লেষণের মাধ্যমে এই জটিল সমস্যার সমাধান করেন।
পুরস্কার পাওয়ার পর ইউ দেং বলেন, যেসব মহান গণিতবিদকে তিনি সব সময় শ্রদ্ধা করেছেন, তাঁদের নামের পাশে নিজের নাম দেখতে পাওয়া তাঁর জন্য অত্যন্ত সম্মানের বিষয়।
হং ওয়াং মূলত হারমোনিক অ্যানালাইসিস নিয়ে গবেষণা করেছেন, যেখানে তরঙ্গের গতি ও বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করা হয়। চীনের পিকিং বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শুরু করা হং ওয়াং প্রথমে ভূবিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হলেও পরে গণিত বিভাগে চলে যান। এরপর ফ্রান্সের প্যারিস-সুদ বিশ্ববিদ্যালয় ও একোল পলিটেকনিকে পড়াশোনা করেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। বর্তমানে তিনি নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক।
ইউ দেং ছোটবেলা থেকেই গণিত প্রতিযোগিতা ও অলিম্পিয়াডে অংশ নিতেন। তিনি পিকিং বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর ২০০৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজিতে স্থানান্তরিত হন। পরে প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি সম্পন্ন করেন। ২০২৪ সাল থেকে তিনি শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করছেন।
দুই চীনা গণিতবিদের এই অর্জন শুধু ব্যক্তিগত সাফল্য নয়, বরং আধুনিক গণিত গবেষণায় চীনের ক্রমবর্ধমান অবস্থানেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতি হিসেবে দেখছেন বিজ্ঞানীরা। সূত্র: বিবিসি
সানা/ডিসি/আপ্র/২৭/৭/২০২৬