চার বছরের প্রতীক্ষার অবসান। কোটি কোটি মানুষের আবেগ, স্বপ্ন, উন্মাদনা আর অগণিত গল্পকে সঙ্গে নিয়ে শুরু হলো ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে বড় উৎসব। আলো, সুর, ইতিহাস, সংস্কৃতি ও রঙিন আবহে মেক্সিকো সিটির কিংবদন্তি আজতেকা স্টেডিয়ামে বর্ণাঢ্য উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে পর্দা উঠেছে ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এর।
নানা আলোচনা, সমালোচনা ও বিতর্কের আবহ পেরিয়ে বিশ্বকাপের প্রথম বাঁশি বাজার আগেই যেন উৎসবের রূপ নেয় আজতেকা। গ্যালারিজুড়ে হাজারো সমর্থকের ঢেউ, স্টেডিয়ামের বাইরে ভোর থেকে মানুষের দীর্ঘ সারি, আর ভেতরে ফুটবলকে ঘিরে এক অনন্য সাংস্কৃতিক আয়োজন—সব মিলিয়ে বিশ্বকাপের সূচনালগ্নেই ফুটবলপ্রেমীদের সামনে হাজির হয় এক স্মরণীয় রজনী।
বিশ্বকাপের ৯৬ বছরের ইতিহাসে এবারই প্রথম তিন দেশ—মেক্সিকো, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা—যৌথভাবে আয়োজন করছে ফুটবলের সর্বোচ্চ আসর। একই সঙ্গে এটিই ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিশ্বকাপ, যেখানে অংশ নিচ্ছে ৪৮টি দল। ১৬টি শহরে অনুষ্ঠিত হবে মোট ১০৪টি ম্যাচ।
বাংলাদেশ সময় বৃহস্পতিবার (১১ জুন) রাত ১১টা ৪৩ মিনিটে শুরু হওয়া উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যেন একসঙ্গে মিলিত হয়েছিল অতীতের ঐতিহ্য ও আধুনিকতার দীপ্তি। মেক্সিকোর প্রাচীন মেসোআমেরিকান সভ্যতার উত্তরাধিকার—ওলমেক, মায়া ও অ্যাজটেক সংস্কৃতির নানা উপাদান তুলে ধরা হয় মনোমুগ্ধকর পরিবেশনায়। আদিবাসী শিল্পীদের অংশগ্রহণ, লোকজ নৃত্য, ঐতিহ্যবাহী কাগজশিল্প এবং আধুনিক আলোকসজ্জার সমন্বয়ে তৈরি হয় এক অনন্য দৃশ্যপট।
তবে রাতের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ ছিল সংগীত। বিশ্বকাপের অফিসিয়াল গান ‘দাই দাই’ পরিবেশন করেন বিশ্বখ্যাত সংগীতশিল্পী শাকিরা ও নাইজেরিয়ার জনপ্রিয় শিল্পী বার্না বয়। তাদের পরিবেশনায় মুহূর্তেই উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়ে আজতেকার গ্যালারি। ফুটবল ও সংগীতের এই মিলনমেলায় দর্শকদের কণ্ঠও মিশে যায় সুরের সঙ্গে।
এ ছাড়া মঞ্চে ছিলেন আন্দ্রেয়া বোচেলি, ডেভিড গেটা, মেগান থি স্ট্যালিয়ন, ইজেএ, আলেহান্দ্রো ফার্নান্দেজ, বেলিন্ডা, ড্যানি ওশান, জে বালভিন, লিলা ডাউনস, মানা এবং লস অ্যাঞ্জেলেস আজুলসসহ বিশ্বের নানা প্রান্তের জনপ্রিয় শিল্পীরা। তাদের পরিবেশনায় উদ্বোধনী অনুষ্ঠান রূপ নেয় এক বৈশ্বিক সাংস্কৃতিক মিলনমেলায়।
আজতেকার এই আয়োজন শুধু একটি বিশ্বকাপের উদ্বোধন নয়, ইতিহাসেরও নতুন অধ্যায়। ১৯৭০ ও ১৯৮৬ সালের পর এবারও বিশ্বকাপের ম্যাচ আয়োজন করছে এই কিংবদন্তি স্টেডিয়াম। ফলে বিশ্বের প্রথম ভেন্যু হিসেবে তিনটি ভিন্ন বিশ্বকাপের আয়োজক হওয়ার বিরল কীর্তি গড়ল আজতেকা। এখানেই একদিন পেলের বিশ্বজয়, এখানেই দিয়েগো ম্যারাডোনার অমর কীর্তিগাঁথা; আর এবার এখান থেকেই শুরু হলো নতুন প্রজন্মের বিশ্বকাপের গল্প।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শেষে চোখ যায় মাঠের লড়াইয়ের দিকে। স্বাগতিক মেক্সিকো ও দক্ষিণ আফ্রিকার খেলোয়াড়রা নেমে পড়েন শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতিতে। মেক্সিকোর গোলবার রক্ষার দায়িত্ব পান তরুণ গোলরক্ষক রাউল রানহেল। ফলে রেকর্ড ষষ্ঠ বিশ্বকাপ খেলতে আসা অভিজ্ঞ গোলরক্ষক গিয়ের্মো ওচোয়া জায়গা পাননি শুরুর একাদশে।
বিশ্বকাপের উদ্বোধনী উৎসব অবশ্য শুধু মেক্সিকোতেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। সহ-আয়োজক কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রেও পৃথক উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে ফিফা। টরন্টো ও লস অ্যাঞ্জেলসের মঞ্চেও থাকবেন বিশ্বের খ্যাতনামা সংগীতশিল্পীরা, যা বিশ্বকাপকে রূপ দিচ্ছে সত্যিকারের বৈশ্বিক উৎসবে।
এবারের বিশ্বকাপে আরো যুক্ত হয়েছে নতুন মাত্রা। প্রতিটি ম্যাচের আগে বিশেষ প্রাক-ম্যাচ আয়োজন, উন্নত ভিজ্যুয়াল উপস্থাপনা এবং দর্শকদের জন্য নতুন ধরনের স্টেডিয়াম অভিজ্ঞতার ব্যবস্থা করেছে ফিফা। পাশাপাশি প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ ফাইনালে থাকছে হাফটাইম শো।
আগামী ১৯ জুলাই ফাইনালের মধ্য দিয়ে শেষ হবে এই মহাযজ্ঞ। তবে তার আগে এক মাসেরও বেশি সময় ধরে ফুটবলের রোমাঞ্চ, বেদনা, আনন্দ, বিস্ময় আর ইতিহাসের নতুন নতুন অধ্যায়ের সাক্ষী হবে বিশ্ব।
আজতেকার আকাশে যে আলোর মশাল জ্বলে উঠেছে, তা এখন ছড়িয়ে পড়বে পৃথিবীর প্রতিটি প্রান্তে। কারণ বিশ্বকাপ মানেই শুধু একটি টুর্নামেন্ট নয়—এটি মানুষের আবেগের সর্বজনীন ভাষা, যা চার বছর পর আবারও এক সুতোয় বেঁধেছে পুরো বিশ্বকে।
সানা/আপ্র/১২/৬/২০২৬