প্রস্টেট ক্যান্সারের জটিল পর্যায়ের চিকিৎসায় নতুন এক আশার সম্ভাবনা দেখছেন বিজ্ঞানীরা। একটি নতুন ওষুধের প্রাথমিক পরীক্ষায় আশাব্যঞ্জক ফলাফল পাওয়া গেছে বলে গবেষকরা জানিয়েছেন।
বিশ্বের বহু দেশে পুরুষদের মধ্যে প্রস্টেট ক্যান্সার একটি সাধারণ রোগ। প্রতিবছর বিশ্বজুড়ে প্রায় পনেরো লাখ পুরুষ এ রোগে আক্রান্ত হন।
নতুন ওষুধটি বিশেষভাবে আশাব্যঞ্জক বলে মনে করা হচ্ছে, কারণ এটি রোগ প্রতিরোধভিত্তিক চিকিৎসা পদ্ধতির অন্তর্ভুক্ত। এ পদ্ধতিতে দেহের নিজস্ব রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা ব্যবহার করে ক্যান্সারের বিরুদ্ধে লড়াই করা হয়।
অন্যান্য কয়েক ধরনের ক্যান্সারের চিকিৎসায় এরই মধ্যে এ ধরনের ওষুধ কার্যকারিতা দেখিয়েছে। তবে প্রস্টেট ক্যান্সারের ক্ষেত্রে এর প্রভাব আগে তেমনভাবে দেখা যায়নি।
গবেষকরা এখন যে নতুন ওষুধটির ফলাফল প্রকাশ করেছেন, তা জটিল পর্যায়ের প্রস্টেট ক্যান্সারে আক্রান্ত পুরুষদের জন্যও সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
গবেষণার নেতৃত্বে থাকা লন্ডনের ক্যান্সার গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও রয়্যাল মার্সডেন চিকিৎসা ট্রাস্টের অধ্যাপক জোহান ডি বোনো বলেন, এ ধরনের চিকিৎসা পদ্ধতি দীর্ঘমেয়াদে রোগ নিরাময়ের পথ দেখাতে পারে বলে তাদের ধারণা।
তিনি জানান, নতুন ওষুধটি কৃত্রিমভাবে তৈরি এক ধরনের প্রতিরক্ষামূলক প্রোটিন, যা শরীরের রোগ প্রতিরোধকারী ঘাতক কোষ ও ক্যান্সার কোষকে মুখোমুখি করে দেয়। ফলে প্রতিরোধী কোষগুলো ক্যান্সার কোষ ধ্বংস করার সুযোগ পায়।
ওষুধটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো এটি এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে, যাতে তা কেবল টিউমারের ভেতরেই সক্রিয় হয়। এর ফলে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া তুলনামূলকভাবে কম হয়। পাশাপাশি এটি রক্তে দীর্ঘ সময় সক্রিয় থাকতে পারে, তাই কম মাত্রার ওষুধেই কার্যকারিতা পাওয়া সম্ভব।
একটি জৈবপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের অর্থায়নে পরিচালিত এ প্রাথমিক পরীক্ষায় প্রস্টেট ক্যান্সারের শেষ ধাপে থাকা আটান্ন জন পুরুষকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। তাদের ক্ষেত্রে আগের কোনো চিকিৎসা আর কার্যকর ছিল না।
গবেষকদের তথ্য অনুযায়ী, অংশগ্রহণকারী রোগীদের প্রায় আটাশি শতাংশ খুবই সামান্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার মুখোমুখি হয়েছেন।
পরবর্তী ধাপে গবেষকেরা রোগীদের রক্তে প্রস্টেট নির্দিষ্ট অ্যান্টিজেন নামের একটি সূচকের মাত্রা পরীক্ষা করেন। এ সূচকের মাত্রা বেশি হলে সাধারণত প্রস্টেটের সমস্যার লক্ষণ হিসেবে ধরা হয়।
গবেষণায় দেখা গেছে, সর্বোচ্চ মাত্রার ওষুধ গ্রহণ করা সতেরো জন রোগীর মধ্যে চৌদ্দ জনের ক্ষেত্রে চিকিৎসার পর এ সূচকের মাত্রা অন্তত অর্ধেক কমে গেছে। নয়জনের ক্ষেত্রে এটি প্রায় নব্বই শতাংশ কমেছে এবং পাঁচজনের ক্ষেত্রে প্রায় নিরানব্বই শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পেয়েছে।
গবেষণার ফলাফলকে ‘বিস্ময়কর’ বলে উল্লেখ করেছেন অধ্যাপক ডি বোনো। কারণ আগে এই ধরনের ক্যান্সারকে রোগ প্রতিরোধভিত্তিক চিকিৎসায় কম সাড়া দেয় বলে মনে করা হত।
গবেষকরা আরো জানিয়েছেন, সর্বোচ্চ মাত্রার ওষুধ গ্রহণ করা এগারো জন রোগীর মধ্যে যাদের টিউমার পরিমাপ করা সম্ভব হয়েছে, তাদের পাঁচজনের ক্ষেত্রে টিউমারের আকার ছোট হয়ে এসেছে।
বিশেষ করে তেষট্টি বছর বয়সী এক রোগীর ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ফলাফল দেখা গেছে। তার ক্যান্সার যকৃতে ছড়িয়ে পড়েছিল এবং সেখানে চৌদ্দটি ক্ষত তৈরি হয়েছিল। মাত্র ছয় ধাপ চিকিৎসার পর সেগুলো সম্পূর্ণ সেরে যাওয়ার প্রমাণ পাওয়া গেছে।
তবে গবেষণার এসব ফলাফল এখনও অন্য বিজ্ঞানীদের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে যাচাই করা হয়নি। ফলাফলগুলো একটি আন্তর্জাতিক ক্যান্সার বিষয়ক বৈজ্ঞানিক সম্মেলনে উপস্থাপন করা হয়েছে।
অধ্যাপক ডি বোনো জানিয়েছেন, এখন পরবর্তী ধাপের বৃহত্তর পরীক্ষার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। তার ভাষায়, আরো তথ্য প্রয়োজন হলেও এখন পর্যন্ত পাওয়া ফলাফল সত্যিই অত্যন্ত উৎসাহব্যঞ্জক।
অন্যদিকে লন্ডনের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যান্সার জীববিজ্ঞানের অধ্যাপক শার্লট বেভান বলেন, প্রস্টেট ক্যান্সারের চিকিৎসায় রোগ প্রতিরোধভিত্তিক এই অগ্রগতি অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক এবং এটি নতুন ধরনের ওষুধ তৈরির পথ খুলে দিতে পারে। তবে তিনি মনে করেন, বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর রোগীদের ওপরও এ ধরনের গবেষণা চালানো জরুরি। কারণ প্রস্টেট ক্যান্সারের ফলাফলে জাতিগত পার্থক্য দেখা যেতে পারে।
সানা/আপ্র/৬/৩/২০২৬