পিত্তথলিতে পাথর হলো এমন একটি অবস্থা- যেখানে পিত্তরসের উপাদান জমে শক্ত দানার সৃষ্টি হয়। পেটের ডানপাশে তীব্র ব্যথা, বমি ভাব ও চর্বিযুক্ত খাবারে অস্বস্তি এর প্রধান লক্ষণ। সাধারণত পেটের আল্ট্রাসাউন্ড পরীক্ষার মাধ্যমে এটি নিশ্চিত করা হয়। এর মূল চিকিৎসা হলো অস্ত্রোপচার করে পিত্তথলি অপসারণ করা।
পেটের উপরিভাগের ডান দিকে ছোট নাশপাতিসদৃশ একটি অঙ্গ পিত্তথলি। হজমে সহায়তা দেওয়াই অঙ্গটির কাজ। পিত্তথলিতে পাথর সাধারণত ৩০ থেকে ৪০ বছর বয়সে হয়ে থাকে, তবে যেকোনো বয়সেই হতে পারে। এটা খুবই পরিচিত একটি সমস্যা। পুরুষদের তুলনায় নারীরা এই রোগে বেশি আক্রান্ত হয়ে থাকেন।
পিত্তথলিতে সাধারণত দুই ধরনের পাথর হয়ে থাকে। যার মধ্যে কোলেস্টেরল জাতীয় পাথরের আধিক্য বেশি। পাথরের আকার ছোট ধূলিকণা থেকে টেনিস বলের মতোও হতে পারে। এক বা একাধিক পাথরও থাকতে পারে। মজার ব্যাপার হলো, বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই পিত্তথলিতে পাথর কোনো উপসর্গ তৈরি করে না। তবে পিত্তথলিতে পাথরজনিত উপসর্গ দেখা দিলে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে।
পিত্তথলিতে পাথর জন্মানো বিশ্বজুড়ে পরিপাকতন্ত্রের একটি সাধারণ রোগ। এতে আক্রান্ত অনেকের ক্ষেত্রে বছরের পর বছর কোনো উপসর্গ দেখা যায় না। কিন্তু কারও কারও ক্ষেত্রে এটি তীব্র ব্যথা, সংক্রমণ, জন্ডিস এবং প্রদাহের মতো গুরুতর সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে। যদি প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত করে সঠিকভাবে চিকিৎসা করা হয়, তাহলে সম্পূর্ণরূপে এর নিরাময় সম্ভব।
পিত্তরস কী: যকৃতের নিচে অবস্থিত একটি ছোট থলির মতো অঙ্গকে বলা হয় পিত্তথলি। এটি প্রায় ৭ থেকে ১০ সেন্টিমিটার লম্বা হয়। এর প্রধান কাজ হলো যকৃত দ্বারা প্রতিদিন উৎপাদিত পিত্তরস সাময়িকভাবে সংরক্ষণ করে রাখা।
পিত্তথলিতে পাথর কীভাবে তৈরি হয়: পিত্তথলিতে প্রধানত তিনটি উপাদান থাকে। তা হলো কোলেস্টেরল, পিত্ত লবণ ও বিলিরুবিন। যখন এ তিনটি উপাদানের ভারসাম্য নষ্ট হয়, তখন ছোট ছোট স্ফটিক তৈরি হতে শুরু করে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই স্ফটিকগুলোই বড় হয়ে পাথরে পরিণত হয়।
পিত্তথলিতে পাথর তৈরির কারণ: পিত্তরসে কোলেস্টেরলের মাত্রা বেশি থাকা, পিত্তথলির সম্পূর্ণরূপে খালি হতে না পারা, অতিরিক্ত বিলিরুবিন উৎপাদন ও পিত্তথলির সংক্রমণ বা প্রদাহ।
পিত্তথলির পাথর সাধারণত তিন প্রকারের হয়। তা হলো-
১. কোলেস্টেরল পাথর: এ ধরনের পাথরই সব থেকে বেশি হয়। ৮০ শতাংশ ক্ষেত্রে এই ধরনের পাথরই তৈরি হয়।
২. পিগমেন্ট পাথর: বিলিরুবিনের মাত্রা বেড়ে যাওয়ার কারণে এগুলো তৈরি হয়। সাধারণত যকৃতের রোগ বা রক্ত সম্পর্কিত কিছু নির্দিষ্ট অসুস্থতার কারণে এগুলো দেখা দেয়।
৩. মিশ্র পাথর: এগুলো কোলেস্টেরল, ক্যালসিয়াম ও বিলিরুবিনের মিশ্রণে গঠিত হয়।
কারা সব থেকে বেশি ঝুঁকি থাকেন: এক্ষেত্রে চিকিৎসকরা ‘৫এফ’ -এর সূত্রটি মনে রাখেন। তা হলো-
ফিমেল বা নারী: এ সমস্যাটি নারীদের মধ্যে বেশি দেখা যায়।
ফর্টি বা ৪০: ৪০ বছরের বেশি বয়সি ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে বেশি দেখা যায়।
ফ্যাট বা চর্বি: যাদের অতিরিক্ত শারীরিক ওজন, তাদের ঝুঁকি বেশি
ফার্টাইল বা গর্ভবতী হওয়ার উপযুক্ত: একজন নারী- যিনি গর্ভবতী হতে পারেন।
ফেয়ার বা ফর্সা: পশ্চিমের দেশগুলোয়ত বসবাসকারী ফর্সা ত্বকের মানুষ বেশি ভোগেন।
অন্যান্য ঝুঁকির কারণগুলো কী: স্থূলতা, মধুমেহ, উচ্চ কোলেস্টেরল, গর্ভাবস্থা, ইস্ট্রোজেন হরমোনের ওষুধ, পিত্তথলিতে, পাথর হওয়ার পারিবারিক ইতিহাস, দীর্ঘ উপবাস বা না খেয়ে থাকা, দ্রুত ওজন হ্রাস, উচ্চ-চর্বিযুক্ত খাবার, কম ফাইবারযুক্ত খাবার, যকৃতের রোগ, হিমোলাইটিক অ্যানিমিয়া, বয়স বৃদ্ধি।
বর্তমানে পিত্তপাথর একটি গুরুতর স্বাস্থ্য সমস্যা হয়ে উঠছে। আনুমানিক ৫ থেকে ১৫ শতাংশ মানুষ তাদের জীবদ্দশায় অন্তত একবার পিত্তপাথর সংক্রান্ত সমস্যায় আক্রান্ত হতে পারেন।
পুরুষদের তুলনায় নারীদের মধ্যে এ সমস্যাটি দুই থেকে তিন গুণ বেশি দেখা যায় এবং ৪০ বছর বয়সের পর এর ঝুঁকি বাড়ে।
তরুণদের মধ্যেও এই সমস্যা দেখা যায়, যার প্রধান কারণগুলো হলো ক্রমবর্ধমান স্থূলতা, ব্যায়ামের অভাব এবং অতিরিক্ত ফাস্ট ফুড গ্রহণ।
পিত্তথলির পাথর হওয়ার লক্ষণগুলো কী: বেশির ভাগ মানুষের ক্ষেত্রেই এ সমস্যাটি আলট্রাসাউন্ড করার সময় আকস্মিকভাবে ধরা পড়ে।
লক্ষণ কখন দেখা দেয়: পেটের ডানপাশে তীব্র ব্যথা, কাঁধ বা পিঠে ব্যথা ছড়িয়ে পড়া, চর্বিযুক্ত খাবার খাওয়ার পর ব্যথা, উদ্বেগ, বমি, বদহজম, পেট ফাঁপা, পেটে গ্যাস জমা
বিপজ্জনক লক্ষণগুলো কী: জ্বর, কাঁপুনি, জন্ডিস, চোখ হলুদ হয়ে যাওয়া, গাঢ় রঙের প্রস্রাব, সাদা বা ফ্যাকাশে মল, পেটে তীব্র ব্যথা, ক্রমাগত বমি হওয়া- এ লক্ষণগুলো দেখা দিলে অবশ্যই হাসপাতালে যাওয়া উচিত।
পিত্তথলির পাথর কীভাবে নির্ণয় করা হয়: আল্ট্রাসাউন্ড টেস্ট হলো একটি খুব সহজ, স্বল্প খরচ ও অত্যন্ত নির্ভুল পরীক্ষা।
রক্ত পরীক্ষা: সিবিসি, লিভার ফাংশন টেস্ট, সিরাম বিলিরুবিন ও লিভার এনজাইম পরীক্ষা করা হয়।
এমআরসিপি ও সিটি স্ক্যান: পিত্তনালিতে পাথর রয়েছে- এমন সন্দেহ হলে সিটি স্ক্যান বা এমআরসিপি করা হয়।
ইআরসিপি: এটি শুধু পাথর শনাক্ত করতেই নয়, কিছু ক্ষেত্রে তা অপসারণ করতেও ব্যবহৃত হয়।
পিত্তথলিতে পাথরের চিকিৎসা: পিত্তথলিতে পাথর থাকা সত্ত্বেও যাদের কোনো উপসর্গ থাকে না, তাদের বেশির ভাগেরই কোনো চিকিৎসার প্রয়োজন হয় না; ডাক্তারের পর্যবেক্ষণই যথেষ্ট। যদি উপসর্গ দেখা দেয় এবং বারবার ব্যথা অনুভূত হয়, তাহলে অস্ত্রোপচার একটি ভালো বিকল্প। ল্যাপারোস্কোপিক কোলেসিস্টেকটমি বর্তমানে বিশ্বব্যাপী আদর্শ চিকিৎসা পদ্ধতি, যেখানে পিত্তথলি অপসারণ করা হয়।
ল্যাপারোস্কোপিক সার্জারির সুবিধা: ছোট ছেদ, কম ব্যথা, স্বল্প, রক্তপাত, দ্রুত আরোগ্য লাভ, এক বা দুই দিনের মধ্যে হাসপাতাল থেকে ছুটি।
কখন জরুরিভিত্তিতে অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন: পিত্তথলিতে তীব্র প্রদাহ, পিত্তথলি ফেটে যাওয়ার ঝুঁকি, পিত্তনালীতে প্রতিবন্ধকতা, অগ্ন্যাশয়ের প্রদাহ, সংক্রমণ
ওষুধ কি পিত্তপাথর গলাতে পারে: কিছু নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে ওষুধ ব্যবহার করা যেতে পারেভ কিন্তু তা সবার জন্য কার্যকর নয়। ছোট কোলেস্টেরল পাথরের ক্ষেত্রে কিছু মানুষের জন্য ওষুধ সহায়ক হতে পারে। চিকিৎসায় কয়েক মাস বা এমনকি কয়েক বছরও লাগতে পারে। তবে পুনরায় পাথর তৈরি হওয়ার ঝুঁকি অনেক বেশি থাকে। তাই অস্ত্রোপচারকে একটি স্থায়ী সমাধান হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
পিত্তথলি অপসারণ কি বিপজ্জনক: অনেকেই এই বিষয়টিতে ভয় পান। পিত্তথলি অপসারণের পরেও যকৃত পিত্তরস উৎপাদন করতে থাকে- যা সরাসরি ক্ষুদ্রান্ত্রে চলে যায়, তাই অনেকেই সম্পূর্ণ স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারেন।
চিকিৎসায় বিলম্ব হলে কী হয়: পিত্তথলির তীব্র প্রদাহ, পিত্তথলিতে ফোঁড়া, পিত্তথলির টিস্যু ধ্বংস, পিত্তথলি ছিদ্র হয়ে যাওয়া, বাধা, সৃষ্টির কারণে জন্ডিস, পিত্ত নালীতে সংক্রমণ, অগ্ন্যাশয়ের প্রদাহ, অন্ত্রে প্রতিবন্ধকতা। এ ছাড়া পিত্তথলির ক্যানসার হওয়ার একটি বিরল ঝুঁকি থাকে।
পিত্তথলিতে পাথর হওয়া আটকানো যায় কি: যদিও শতভাগ প্রতিরোধ সম্ভব নয়, তবুও ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো যেতে পারে। এ জন্য স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখুন। স্থূলতা কমান। কিন্তু ওজন কমানো যেন হঠাৎ না হয়। এমন ওজন কমানোর পদ্ধতি পরিহার করুন- যাতে এক মাসে ২ থেকে ৪ কেজির বেশি ওজন কমে যায়। প্রতিদিন অন্তত ৩০ থেকে ৪৫ মিনিট ব্যায়াম করুন।
ফল, শাকসবজি, দানা শস্য ও ফাইবার সমৃদ্ধ একটি সুষম খাদ্য গ্রহণ করুন। ফাস্ট ফুড, ভাজা খাবার, ঘি, মাখন, ট্রান্স ফ্যাট এবং অতিরিক্ত চিনিযুক্ত খাবার খাওয়া কমান। প্রতিদিন প্রচুর পরিমাণ পানি পান করুন। আপনার যদি ডায়াবেটিস থাকে, তাহলে তা নিয়ন্ত্রণে রাখলে ঝুঁকি কমে যায়।
সূত্র: বিবিসি
কেএমএএ/আপ্র/০৯.০৮.২০২৬