গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
রোববার, ০৯ আগস্ট ২০২৬

মেনু

বাংলাদেশের ডিজিটাল অর্থনীতির সম্ভাবনায় বাধা দক্ষতার ঘাটতি

প্রযুক্তি ডেস্ক

প্রযুক্তি ডেস্ক

প্রকাশিত: ২১:১৫ পিএম, ০৯ আগস্ট ২০২৬ | আপডেট: ২১:৫৬ এএম ২০২৬
বাংলাদেশের ডিজিটাল অর্থনীতির সম্ভাবনায় বাধা দক্ষতার ঘাটতি
ছবি

ছবি সংগৃহীত

প্রযুক্তি পৃথিবীর শ্রমবাজারকে ভৌগোলিক সীমারেখার বাইরে নিয়ে গেছে। যে দেশ দক্ষ জনবল, নির্ভরযোগ্য ইন্টারনেট, নিরাপদ ডেটা অবকাঠামো ও প্রতিযোগিতামূলক খরচ নিশ্চিত করতে পারছে; ওই দেশই বৈশ্বিক সেবাবাজারে জায়গা করে নিচ্ছে। এই বাজারে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি তরুণ জনগোষ্ঠী। বাংলাদেশে বিপুলসংখ্যক তরুণ প্রযুক্তি ব্যবহার করছে, ইংরেজি ও অন্যান্য ভাষায় যোগাযোগের সক্ষমতা অর্জন করছে এবং অনলাইনভিত্তিক কাজের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণেও বাংলাদেশের ডিজিটাল অর্থনীতির সম্ভাবনা ও দক্ষতার ঘাটতি- দুই বিষয়ই গুরুত্ব পেয়েছে। দেশে বিপুলসংখ্যক নিবন্ধিত ফ্রিল্যান্সার থাকলেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, উন্নত সফটওয়্যার, ডেটা বিশ্লেষণ ও উচ্চমূল্যের প্রযুক্তি সেবায় দক্ষতার ঘাটতি এখনো বড় বাধা। এ বিষয় নিয়েই এবারের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি পাতার প্রধান ফিচার

বাংলাদেশের অর্থনীতির সামনে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্নগুলোর একটি হলো—আগামী দিনের কর্মসংস্থান কোথায়? তৈরি পোশাক খাত এখনো আমাদের রপ্তানি অর্থনীতির প্রধান ভিত্তি। প্রবাসী আয়ও অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি। কিন্তু জনসংখ্যার কাঠামো বদলাচ্ছে, তরুণদের কর্মসংস্থানের চাপ বাড়ছে, আর বিশ্ব অর্থনীতিও দ্রুত প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে উঠছে। এমন এক সময়ে বিজনেস প্রসেস আউটসোর্সিং (বিপিও) ও তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর সেবা বা আইটিএস খাত বাংলাদেশের জন্য শুধু একটি সম্ভাবনাময় শিল্প নয়; ভবিষ্যৎ অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হয়ে উঠতে পারে।

বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব কনট্যাক্ট সেন্টার অ্যান্ড আউটসোর্সিংয়ের (বাক্কো) সভাপতি তানভীর ইব্রাহীমের সাম্প্রতিক এক সাক্ষাৎকারে যে সম্ভাবনার কথা উঠে এসেছে, তা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার দাবি রাখে। তাঁর মতে, বর্তমানে দেশে বিপিও ও আইটিএস খাতের বাজার প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার। ফ্রিল্যান্সিংসহ সংশ্লিষ্ট খাত মিলিয়ে এর পরিধি প্রায় দেড় বিলিয়ন ডলার। আগামী পাঁচ বছরে এই বাজার ৫ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করা সম্ভব এবং কর্মসংস্থান প্রায় ১ লাখ থেকে ৩ লাখে উন্নীত হতে পারে।

বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও আমরা এখনো সম্ভাবনার তুলনায় অনেক কম অর্জন করছি। 
বাংলাদেশের বিপিও খাত এখনো অনেকাংশে অপেক্ষাকৃত কমমূল্যের কাজের ওপর নির্ভরশীল। কল সেন্টার, গ্রাহকসেবা, ডেটা এন্ট্রি বা সাধারণ ব্যাক-অফিস সেবা গুরুত্বপূর্ণ হলেও এগুলোই ভবিষ্যতের শেষ কথা নয়। উচ্চমূল্যের বাজারে প্রবেশ করতে হলে ফাইন্যান্সিয়াল অ্যান্ড অ্যাকাউন্টিং প্রসেস আউটসোর্সিং, সফটওয়্যার সাপোর্ট, সাইবার নিরাপত্তা, ডেটা অ্যানালিটিকস, ক্লাউড সেবা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্বাস্থ্যসেবা প্রযুক্তি এবং ডিজিটাল মার্কেটিংয়ের মতো খাতে যেতে হবে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিপিও খাত দ্রুততর ও সাশ্রয়ী করে তুলছে। একটি চ্যাটবট একসঙ্গে হাজার হাজার সাধারণ প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে। সফটওয়্যার স্বয়ংক্রিয়ভাবে হিসাব তৈরি করতে পারে। এআই ডেটা বিশ্লেষণ করতে পারে। ফলে প্রচলিত রুটিনভিত্তিক কাজের চাহিদা কমতে পারে। কিন্তু একই সঙ্গে নতুন ধরনের কাজেরও সৃষ্টি হচ্ছে। বিশ্বজুড়ে আউটসোর্সিং খাত এখন সাধারণ ‘বডি-শপিং’ মডেল থেকে প্রযুক্তি, বিশ্লেষণ ও বুদ্ধিবৃত্তিক সেবার দিকে যাচ্ছে। তাই বাংলাদেশের কৌশল হওয়া উচিত এআইকে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে না দেখে উৎপাদনশীলতার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা। এ জন্য শিক্ষাব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন প্রয়োজন।

বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এখনো অনেক ক্ষেত্রে এমন গ্র্যাজুয়েট তৈরি করছে, যাদের ডিগ্রি আছে, কিন্তু কর্মক্ষেত্রের প্রয়োজনীয় দক্ষতা নেই। শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে পরে কয়েক মাস বা এক বছর ধরে নতুন কর্মীকে প্রশিক্ষণ দিতে হয়। এই ব্যবধান কমানো জরুরি। বিশ্ববিদ্যালয়, কারিগরি প্রতিষ্ঠান, প্রশিক্ষণকেন্দ্র ও শিল্পখাতের মধ্যে নিয়মিত সংযোগ তৈরি করতে হবে। পাঠ্যক্রম দ্রুত পরিবর্তনশীল প্রযুক্তির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে। শুধু প্রোগ্রামিং শেখালেই হবে না। ইংরেজি যোগাযোগ, সমস্যা সমাধান, প্রকল্প ব্যবস্থাপনা, আন্তর্জাতিক ব্যবসা, ডেটা সুরক্ষা, সাইবার নিরাপত্তা এবং পেশাগত আচরণ- সবই গুরুত্বপূর্ণ। আগামী দিনের একজন দক্ষ বিপিও কর্মীকে হয়তো একই সঙ্গে হিসাবরক্ষণ সফটওয়্যার, এআই টুল এবং আন্তর্জাতিক গ্রাহকের সঙ্গে যোগাযোগ—তিনটিই জানতে হবে।

সরকার সবচেয়ে বড় বাজার তৈরি করতে পারে। সরকারি নাগরিক সেবা, কল সেন্টার, ডেটা ব্যবস্থাপনা, ডিজিটাল নথি, হেল্পডেস্ক ও বিভিন্ন সহায়ক সেবা নির্দিষ্ট মানদণ্ডের ভিত্তিতে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া যেতে পারে। তবে এজন্য স্বচ্ছ দরপত্র, তথ্য সুরক্ষা এবং কঠোর জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। বেসরকারি খাতেও একই পরিবর্তন দরকার। ব্যাংক, হাসপাতাল, বিশ্ববিদ্যালয়, ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান, শিল্পকারখানা—প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে ভাবতে হবে, কোন কাজটি তাদের মূল ব্যবসা এবং কোন কাজ বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে আরও দক্ষভাবে করা যায়। আউটসোর্সিং মানে কর্মী ছাঁটাই নয়; বরং বিশেষায়িত সেবার মাধ্যমে দক্ষতা ও উৎপাদনশীলতা বাড়ানো।

বাংলাদেশের জন্য আরেকটি বড় সুযোগ হলো আন্তর্জাতিক বাজারে বৈচিত্র্য আনা। বর্তমানে কোনো একটি বাজার বা দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা ঝুঁকিপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ গুরুত্বপূর্ণ হলেও মধ্যপ্রাচ্য, জাপান, অস্ট্রেলিয়া, সিঙ্গাপুর, কানাডা ও আফ্রিকার উদীয়মান বাজারেও বাংলাদেশের সেবা রপ্তানির সুযোগ রয়েছে। ফিলিপাইন দীর্ঘদিন ধরে কল সেন্টারনির্ভর সাফল্য অর্জন করেছে, ভারত উচ্চমূল্যের আইটি ও বিপিও সেবায় বিশ্বশক্তিতে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশের উচিত তাদের অনুকরণ না করে নিজস্ব শক্তির জায়গা তৈরি করা। বাংলাদেশের বিশেষ সুবিধা হলো, আমরা এখনো এমন পর্যায়ে আছি- যেখানে দ্রুত পরিবর্তন সম্ভব। বড় দেশগুলোর মতো পুরোনো অবকাঠামো ও প্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থার ভার আমাদের তুলনামূলক কম। কিন্তু এই সুবিধা কাজে লাগাতে হলে নীতির ধারাবাহিকতা দরকার।

ডেটা সুরক্ষা আইন, সাইবার নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক পেমেন্ট ব্যবস্থা, বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন, করনীতি এবং ফ্রিল্যান্সারদের অর্থ গ্রহণ—এসব বিষয়ে সহজ, স্বচ্ছ ও ব্যবসাবান্ধব কাঠামো প্রয়োজন। বিদেশি গ্রাহক বাংলাদেশের কোনো প্রতিষ্ঠানের কাছে কাজ দেওয়ার আগে জানতে চাইবে—তার ডেটা কতটা নিরাপদ, চুক্তি কতটা কার্যকর এবং বিরোধ হলে আইনি সুরক্ষা কী। তাই প্রযুক্তি অবকাঠামোর পাশাপাশি আস্থার অবকাঠামোও তৈরি করতে হবে।

বাংলাদেশের সামনে এখন একটি ঐতিহাসিক সুযোগ রয়েছে। আমাদের তরুণ জনগোষ্ঠী আছে, ডিজিটাল সংযোগ বাড়ছে, উদ্যোক্তা তৈরি হচ্ছে এবং বিশ্ববাজারে দূরত্ব কমে আসছে। কিন্তু সুযোগ কখনো নিজে থেকে সাফল্যে পরিণত হয় না। তাকে রূপ দিতে হয় দক্ষতা দিয়ে, নীতির ধারাবাহিকতা দিয়ে এবং সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়ে। আগামী দিনের অর্থনীতি হয়তো এমন হবে, যেখানে দেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি পণ্য কোনো পোশাক, পণ্য বা কাঁচামাল নয়—একজন তরুণের দক্ষতা, একটি সফটওয়্যার, একটি অ্যালগরিদম, একটি ডিজিটাল সেবা কিংবা একটি সৃজনশীল ধারণা।

বাংলাদেশ যদি ওই পরিবর্তনের ভাষা বুঝতে পারে, শিক্ষাব্যবস্থা কর্মবাজারের সঙ্গে যুক্ত করতে পারে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ভয় না পেয়ে দক্ষতার সঙ্গে ব্যবহার করতে পারে এবং বিশ্ববাজারের আস্থা অর্জন করতে পারে; তাহলে ৫ বিলিয়ন ডলারের লক্ষ্য কেবল একটি সংখ্যা থাকবে না। এটি হয়ে উঠতে পারে অর্থনীতির নতুন দিগন্তের সূচনা।

কেএমএএ/আপ্র/০৯.০৮.২০২৬

সংশ্লিষ্ট খবর

ঢাকায় এ সপ্তাহে প্রযুক্তির বাজারে স্মার্টফোনের দাম
০৯ আগস্ট ২০২৬

ঢাকায় এ সপ্তাহে প্রযুক্তির বাজারে স্মার্টফোনের দাম

দেশের বাজারে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় প্রায় সব প্রতিষ্ঠানের হালনাগাদ প্রযুক্তির স্মার্টফোন পাওয়া যায়। তা...

তারার মৃত্যুর শুরু থেকে শেষ দেখলেন বিজ্ঞানীরা
০৯ আগস্ট ২০২৬

তারার মৃত্যুর শুরু থেকে শেষ দেখলেন বিজ্ঞানীরা

মহাবিশ্বের এক প্রকাণ্ড তারার বিস্ফোরণ ও মৃত্যুর প্রায় শুরু থেকে পরবর্তী বিবর্তন পর্যন্ত বিরলভাবে পর্...

বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবায় উন্নত আলট্রাসাউন্ড প্রযুক্তি চালু
০৯ আগস্ট ২০২৬

বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবায় উন্নত আলট্রাসাউন্ড প্রযুক্তি চালু

স্বাস্থ্য প্রযুক্তি খাতের শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান উইপ্রো জিই হেলথকেয়ার ‘হেলথ এক্সপ্রেস’ নামে একটি নত...

এআই অলিম্পিয়াডে বাংলাদেশের তিন ব্রোঞ্জপদক অর্জন
০৯ আগস্ট ২০২৬

এআই অলিম্পিয়াডে বাংলাদেশের তিন ব্রোঞ্জপদক অর্জন

তৃতীয় আন্তর্জাতিক আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স অলিম্পিয়াডে (আইওএআই ২০২৬) তিনটি ব্রোঞ্জপদক অর্জন করেছে ব...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

শেখ হাসিনার বক্তব্য সমর্থন করে না ভারত, জানালেন জয়সওয়াল

বাংলাদেশের বর্তমান বৈধ ও গঠিত সরকারের বিষয়ে ভারতে অবস্থানরত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেওয়া বক্তব্য সমর্থন করে না নয়াদিল্লি। শুক্রবার (৭ আগস্ট) ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল এ কথা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, “এই অনুষ্ঠান সম্পর্কে আমাদের অবস্থান আগেই স্পষ্ট করা হয়েছে। আমি আবারো সেটিই বলছি। এটি একটি বেসরকারি সংবাদমাধ্যম আয়োজিত অনুষ্ঠান ছিল, যেখানে ভারত সরকারের কোনো ভূমিকা ছিল না।” প্রিয় পাঠক. আপনি কি মনে করেন ভারত সঠিক বলেছে?

মোট ভোট: ১ | শেষ আপডেট: 1 দিন আগে