মহাবিশ্বের এক প্রকাণ্ড তারার বিস্ফোরণ ও মৃত্যুর প্রায় শুরু থেকে পরবর্তী বিবর্তন পর্যন্ত বিরলভাবে পর্যবেক্ষণ করেছেন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা। প্রায় ৫০ কোটি আলোকবর্ষ দূরের একটি ছায়াপথে ঘটে যাওয়া এই বিস্ফোরণের প্রথম সংকেত ধরা পড়ে এ বছরের মার্চে চীনের আইনস্টাইন প্রোব মহাকাশ দূরবীক্ষণযন্ত্রে। এরপর বিশ্বের বিভিন্ন পর্যবেক্ষণকেন্দ্রের বিজ্ঞানীরা ঘটনাটি প্রায় তিন মাস ধরে অনুসরণ করেন।
বিস্ফোরণের একেবারে শুরুর মুহূর্তে ধসে পড়া তারার কেন্দ্র থেকে সৃষ্ট শক্তিশালী অভিঘাত-তরঙ্গ যখন তারার পৃষ্ঠ ভেদ করে বাইরে বেরিয়ে আসে, তখন এক ঝলক এক্স-রে বিকিরণ তৈরি হয়। এই ক্ষণস্থায়ী ঘটনাকে বলা হয় ‘শক ব্রেকআউট’। ধারণা করা হয়, অধিকাংশ অতিনবতারার বিস্ফোরণেই এমন ঘটনা ঘটে। কিন্তু এটি এত অল্প সময় স্থায়ী হয় যে সরাসরি শনাক্ত করা অত্যন্ত কঠিন। ২০০৮ সালের পর এমন একটি ঘটনার প্রত্যক্ষ পর্যবেক্ষণ ছিল অত্যন্ত বিরল।
গবেষণাটি ‘অ্যাস্ট্রোফিজিক্যাল জার্নাল লেটার্স’ সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে। গবেষণার অন্যতম প্রধান লেখক কার্নেগি মেলন বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যোতির্বিজ্ঞানী ব্রেন্ডন ও’কনর বলেন, বাস্তব সময়ে এ দৃশ্য ধারণ করতে পারা সৌভাগ্যের বিষয়।
গবেষকদের পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, ঘটনাটি ছিল একটি বিস্তৃত রেখাবিশিষ্ট প্রথম ধরনের ‘সি’ অতিনবতারা বিস্ফোরণ। এর আগে ওই তারাটি একটি উলফ-রায়েট ধরনের বিশাল নক্ষত্র ছিল এবং বিস্ফোরণের আগে নিজের বাইরের হাইড্রোজেন ও হিলিয়ামের স্তরের বড় অংশ হারিয়েছিল। নতুন বিশ্লেষণে তারাটির ভর সূর্যের প্রায় ২০ গুণ বলে নির্ধারণ করা হয়েছে। বিস্ফোরণের পর এর কেন্দ্র ধসে কৃষ্ণগহ্বর তৈরির সম্ভাবনাও রয়েছে।
ঘটনাটির সবচেয়ে বিস্ময়কর দিক হলো, এই ধরনের শক্তিশালী অতিনবতারা সাধারণত গামা-রশ্মির তীব্র ঝলকের সঙ্গে সম্পর্কিত হলেও এবার তেমন কোনো গামা-রশ্মির বিস্ফোরণ শনাক্ত হয়নি। চন্দ্রা এক্স-রে পর্যবেক্ষণকেন্দ্রসহ বিভিন্ন যন্ত্রের পরবর্তী পর্যবেক্ষণও কোনো স্বাভাবিক গামা-রশ্মি বিস্ফোরণের পরবর্তী এক্স-রে আভা শনাক্ত করতে পারেনি।
বিজ্ঞানীদের ধারণা, তারাটির কেন্দ্র থেকে প্রায় আলোর গতির কাছাকাছি বেগে বেরিয়ে আসা একটি শক্তিশালী জেট তারার বাইরের ঘন পদার্থ ভেদ করে পুরোপুরি বের হতে পারেনি। ফলে সেটি তারার ভেতরেই আটকে গিয়ে দুর্বল হয়ে থাকতে পারে। এই সম্ভাবনাকে ‘চোকড জেট’ বা আটকে যাওয়া জেটের ধারণা দিয়ে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে। কয়েক দশক আগে তাত্ত্বিকভাবে এমন সম্ভাবনার কথা বলা হলেও নতুন পর্যবেক্ষণ এই ব্যাখ্যার পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ দিয়েছে।
প্রাথমিক এক্স-রে সংকেত পাওয়ার পরপরই পৃথিবীর বিভিন্ন পর্যবেক্ষণকেন্দ্র ও মহাকাশভিত্তিক যন্ত্র ঘটনাটির দিকে নজর দেয়। এভাবে এক্স-রে থেকে শুরু করে দৃশ্যমান আলো, বেতার তরঙ্গসহ বিভিন্ন তরঙ্গদৈর্ঘ্যে বিস্ফোরণটির বিবর্তন অনুসরণ করা হয়। দীর্ঘ সময় ধরে সংগৃহীত তথ্য বিজ্ঞানীদের তারাটির বিস্ফোরণের আগে ও পরে কী ঘটেছিল, তা তুলনামূলকভাবে বিশদভাবে বিশ্লেষণের সুযোগ দিয়েছে।
গবেষকদের মতে, এই আবিষ্কার থেকে বোঝা যাচ্ছে, মহাবিশ্বের সবচেয়ে বড় তারাগুলোর মৃত্যু একই নিয়মে ঘটে না। একই ধরনের বিশাল তারার বিস্ফোরণও ভিন্ন ভিন্ন পথে ঘটতে পারে। বিশেষ করে গামা-রশ্মির ঝলক ছাড়া এমন শক্তিশালী অতিনবতারা বিস্ফোরণের পর্যবেক্ষণ তারার ধস, জেটের সৃষ্টি, কৃষ্ণগহ্বরের জন্ম এবং চরম শক্তির পদার্থবিজ্ঞানের নানা অমীমাংসিত প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে নতুন সুযোগ তৈরি করেছে।
পৃথিবীতে কৃত্রিমভাবে এমন চরম পরিবেশ তৈরি করা সম্ভব নয়। তাই দূর মহাকাশের এসব মহাজাগতিক বিস্ফোরণই বিজ্ঞানীদের জন্য প্রকৃতির তৈরি অনন্য পরীক্ষাগার। একটি তারার মৃত্যুর শুরু থেকে তার বিস্ফোরণ এবং পরবর্তী পরিণতি পর্যন্ত এত কাছ থেকে পর্যবেক্ষণের সুযোগ সেই পরীক্ষাগারে নতুন এক দরজা খুলে দিয়েছে।
সানা/ডিসি/আপ্র/৯/৮/২০২৬