দেশে হামের প্রাদুর্ভাব বৃদ্ধি পাওয়ায় রোববার (৫ এপ্রিল) সকাল ৯টা থেকে দেশের ১৮টি জেলার ৩০টি নির্বাচিত উপজেলায় বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি শুরু করেছে সরকার। এই জরুরি স্বাস্থ্য কার্যক্রমের আওতায় ৬ মাস থেকে ৫ বছরের কম বয়সী সব শিশুকে হামের টিকা দেওয়া হচ্ছে। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে দ্রুত সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আনতেই এই বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করে টিকাদান শুরু: স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ইউনিসেফ এবং বিশ্বব্যাংকের মূল্যায়নের ভিত্তিতে দেশের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ১৮টি জেলার ৩০টি উপজেলায় এই কর্মসূচি শুরু করা হয়েছে।
এর আগে শনিবার (৪ এপ্রিল) সচিবালয়ে জরুরি সংবাদ ব্রিফিংয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান, যেসব এলাকায় সাম্প্রতিক সময়ে হামের প্রকোপ বেশি দেখা গেছে, সেসব এলাকাকে অগ্রাধিকার দিয়ে এই কর্মসূচি চালু করা হয়েছে। তিনি বলেন, বর্তমানে দেশের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং এ নিয়ে অযথা আতঙ্কিত না হওয়ার জন্য সবাইকে অনুরোধ করা হচ্ছে।
টিকা নেওয়া থাকলেও আবার নেওয়া যাবে: স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, যারা ইতিপূর্বে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির আওতায় হামের টিকা গ্রহণ করেছে, তারাও এই বিশেষ কর্মসূচিতে টিকা নিতে পারবে। তিনি বলেন, চিকিৎসা বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে একাধিকবার এই টিকা গ্রহণে কোনো ক্ষতিকর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার ঝুঁকি নেই। বরং এতে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা আরও শক্তিশালী হয়।
ঝুঁকিপূর্ণ ১৮ জেলা ও ৩০ উপজেলা: রোববার যেসব এলাকায় বিশেষ টিকাদান কার্যক্রম শুরু হয়েছে সেগুলো হলো—
বরগুনা (বরগুনা পৌরসভা ও সদর), পাবনা (পাবনা পৌরসভা ও সদর, ঈশ্বরদী, আটঘরিয়া, বেড়া), চাঁদপুর (চাঁদপুর পৌরসভা ও সদর, হাইমচর), কক্সবাজার (মহেশখালী, রামু), গাজীপুর (গাজীপুর সদর), চাঁপাইনবাবগঞ্জ (চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌরসভা ও সদর, শিবগঞ্জ, ভোলাহাট), নেত্রকোনা (আটপাড়া), ময়মনসিংহ (ময়মনসিংহ সদর, ত্রিশাল, তারাকান্দা, শ্রীনগর), রাজশাহী (গোদাগাড়ী), বরিশাল (মেহেন্দীগঞ্জ, বাকেরগঞ্জ), নওগাঁ (পোরশা), যশোর (যশোর পৌরসভা ও সদর), নাটোর (নাটোর সদর), মুন্সীগঞ্জ (মুন্সীগঞ্জ পৌরসভা ও সদর, লৌহজং), মাদারীপুর (মাদারীপুর পৌরসভা ও সদর), ঢাকা (নবাবগঞ্জ), ঝালকাঠি (নলছিটি), শরীয়তপুর (জাজিরা)।
১২ এপ্রিল থেকে উচ্চঝুঁকির এলাকায় দ্বিতীয় ধাপ: স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, আগামী ১২ এপ্রিল থেকে উচ্চঝুঁকির দুই সিটি করপোরেশন ও দুই জেলায় দ্বিতীয় ধাপে এই কর্মসূচি শুরু করা হবে। এর আওতায় ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন, ময়মনসিংহ জেলা এবং বরিশাল জেলায় কার্যক্রম পরিচালিত হবে।
৩ মে থেকে সারাদেশে একযোগে টিকাদান: স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় আরও জানিয়েছে, আগামী ৩ মে থেকে দেশের সব জেলা ও উপজেলায় একযোগে বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি শুরু করা হবে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী রোববার ঢাকার নবাবগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কর্মসূচির উদ্বোধনকালে বলেন, দেশের প্রতিটি শিশুকে টিকার আওতায় আনতে সরকার সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। তিনি বলেন, তৃতীয় মে থেকে অর্থাৎ আগামী মাসের তিন তারিখ থেকে সারাদেশে একযোগে এই টিকাদান কর্মসূচি চালানো হবে।
গাজীপুরে আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন, অভিভাবকদের অংশগ্রহণ বাড়ছে: একই দিনে গাজীপুর সদর উপজেলার ভাওয়াল মির্জাপুর ইউনিয়ন পরিষদ চত্বরে হাম ও রুবেলা প্রতিরোধে জরুরি টিকাদান কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী বলেন, শিশুদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় সরকার সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। কোনো শিশুই যেন টিকার বাইরে না থাকে, সেই লক্ষ্যেই এই কার্যক্রম নেওয়া হয়েছে। তিনি আরও বলেন, আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সংস্থা ও বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী সম্পূর্ণ বৈজ্ঞানিক ভিত্তিতে এই কর্মসূচি পরিচালিত হচ্ছে। টিকার কোনো ঘাটতি থাকবে না এবং তা দ্রুত পূরণ করা হচ্ছে।
গাজীপুরে আক্রান্ত ও ভর্তি পরিস্থিতি: শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত হামে আক্রান্ত হয়ে ৮৯ জন শিশু হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। এর মধ্যে ৪৯ জন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে। বর্তমানে চিকিৎসাধীন রয়েছে ৪৬ জন। গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ১৬ জন শিশু ভর্তি হয়েছে এবং ২০ জনকে ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে। জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গাজীপুরে ৬ মাস থেকে ৫ বছরের কম বয়সী প্রায় ২৮ হাজার শিশুকে টিকার আওতায় আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। আগামী ১৫ দিনব্যাপী এই কর্মসূচি জেলার বিভিন্ন এলাকায় পরিচালিত হচ্ছে। স্বাস্থ্য বিভাগ আশা করছে, এই বিশেষ টিকাদান কর্মসূচির মাধ্যমে দেশে হামের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে এনে শিশুদের নিরাপদ রাখা সম্ভব হবে।
সানা/আপ্র/৫/৪/২০২৬