পবিত্র ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে রাজধানীর সবচেয়ে বড় পশুর হাট গাবতলীতে জমে উঠতে শুরু করেছে কেনাবেচা। তবে টানা বৃষ্টি, কাদাপানি, তীব্র যানজট, সংকীর্ণ অবকাঠামো ও অতিরিক্ত ভিড়ের কারণে মঙ্গলবার (২৬ মে) দিনভর চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন ক্রেতা, বিক্রেতা ও খামারিরা। কোথাও হাঁটার জায়গা নেই, কোথাও কাদায় ডুবে আছে রাস্তা। গরু ও মহিষ দেখতে গিয়ে বিপাকে পড়ছেন ক্রেতারা, আবার পশু নিয়ন্ত্রণ হারালে আতঙ্কও ছড়িয়ে পড়ছে হাটজুড়ে।
সকাল থেকে থেমে থেমে বৃষ্টির পর বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হাটে মানুষের উপস্থিতি বাড়ে। কিন্তু বেচাকেনার পাশাপাশি বাড়তে থাকে বিশৃঙ্খলাও। গাবতলী থেকে মোহাম্মদপুরমুখী এবং মোহাম্মদপুর থেকে গাবতলীমুখী সড়কে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। গরুবাহী ট্রাক, পিকআপ, ক্রেতা ও বিক্রেতাদের ভিড়ে হাটের বিভিন্ন অংশে স্বাভাবিক চলাচল প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।
ছুটন্ত গরু, কাদায় পড়ে আহত হওয়ার শঙ্কা
দুপুরের দিকে ১০ নম্বর হাসিল ঘরের কাছে একটি গরু হঠাৎ ছুটে গেলে চারদিকে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। প্রাণ বাঁচাতে ছোটাছুটি শুরু হলে এক ব্যক্তি কাদায় পড়ে যান। কিছু সময়ের জন্য পুরো এলাকায় বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরি হয়।
পরে দুপুর দেড়টার দিকে একই এলাকায় আরও একটি গরু নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পাশের সেডে ঢুকে পড়ে। গরুর ধাক্কায় কয়েকজন মাটিতে পড়ে গেলে পাটুরিয়া থেকে আসা বিক্রেতা নূর ইসলাম তাঁদের উদ্ধার করেন। হাটজুড়ে এমন ছোটখাটো ঘটনা প্রায়ই ঘটছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
কাদা আর পানিতে ডুবে হাট
দুপুর থেকে বিকেল পর্যন্ত গাবতলীর বিস্তীর্ণ অংশ কাদা ও বৃষ্টির পানিতে সয়লাব হয়ে থাকে। কোথাও কোথাও পানি জমে ছোট ছোট জলাশয়ের মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়। প্রধান সড়কের বিভিন্ন অংশ কাদায় ডুবে থাকায় পশু আনা-নেওয়া এবং ক্রেতাদের চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়।
দিনাজপুরের বিরামপুর থেকে আটটি গরু নিয়ে আসা খামারি সাইদুল ইসলাম বলেন, ‘বৃষ্টি আর ভোগান্তির কারণে একটি গরুও বিক্রি করতে পারিনি। গরু বিক্রি করে লাভ হবে কি না, তা নিয়েই এখন চিন্তায় আছি।’
ক্রেতা শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘কাদা আর ভিড়ের কারণে ঠিকমতো গরু দেখাই যাচ্ছে না। দরদাম করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।’
সেড ভাড়ার চাপ, খুঁটির জায়গা নিয়েও অভিযোগ
হাটের বর্ধিত অংশে গরু বাঁধার জন্য তৈরি করা হয়েছে শত শত খুঁটির সেড। এসব সেডের ভাড়া নিয়ে ক্ষোভ রয়েছে ব্যবসায়ীদের মধ্যে।
৯৬ খুঁটির একটি সেডের দায়িত্বে থাকা রফিক উদ্দিন জানান, তিনি আড়াই লাখ টাকায় সেডটি ভাড়া নিয়েছেন। সেখানে তিন সারিতে ৯৬টি খুঁটি রয়েছে।
কুষ্টিয়ার কুমারখালীর শাহজাহান উদ্দিন বলেন, তিনটি গরুর জন্য তাঁকে ১০ হাজার টাকা সেড ভাড়া দিতে হয়েছে। পরিবহন ব্যয়ও প্রায় সমপরিমাণ। তিনি বলেন, ‘গরুর দাম উঠছে না। খরচের হিসাব করলে লাভের চেয়ে লোকসানের আশঙ্কাই বেশি।’
হাট ঘুরে দেখা যায়, অনেক স্থানে একটি খুঁটি থেকে আরেকটি খুঁটির দূরত্ব এক হাতেরও কম। ফলে পশু ঠিকমতো দাঁড়াতে পারছে না।
খামারি বাবুল হোসেন বলেন, ‘দেড় থেকে দুই হাজার টাকা করে খুঁটির ভাড়া নেওয়া হচ্ছে। কিন্তু গরু রাখার পর্যাপ্ত জায়গা নেই। ভালো জায়গা চাইলে আরও বেশি টাকা দিতে হয়।’
লাভের অঙ্ক মেলাতে পারছেন না খামারিরা
কুষ্টিয়ার খামারি হাবিব শেখ তিনটি গরু ৫ লাখ ৫৩ হাজার টাকায় বিক্রি করেছেন। কিন্তু এরপরও তাঁর মুখে সন্তুষ্টির হাসি নেই।
তিনি বলেন, ‘আট মাস ধরে পশু পালন করেছি। খাবার, পরিচর্যা, পরিবহন, সেড ভাড়া—সব খরচ বাদ দিলে হয়তো ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকার বেশি লাভ থাকবে না।’
অনেক ব্যবসায়ীর অভিযোগ, পশুখাদ্যের দাম, পরিবহন ব্যয় এবং হাট-সংশ্লিষ্ট খরচ বাড়লেও সেই অনুপাতে দাম পাচ্ছেন না তাঁরা।
হাসিল নিয়ে বড় অভিযোগ নেই
হাসিল আদায় নিয়ে বড় ধরনের অভিযোগ না থাকলেও ভিড়ের কারণে ভোগান্তির কথা জানিয়েছেন ক্রেতা ও বিক্রেতারা।
কুমিল্লার আল আমিন ১ লাখ ২০ হাজার টাকায় একটি গরু কিনে ৬ হাজার টাকা হাসিল দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘হাসিল নিয়ে সমস্যা নেই। কিন্তু হাসিল দিতে গিয়ে যে ভিড়ের মধ্যে পড়তে হচ্ছে, সেটাই সবচেয়ে বড় কষ্ট।’
মহিষের চাহিদা বাড়ছে, ভিড়ও বেশি
এবারের কোরবানির বাজারে গরুর পাশাপাশি মহিষের প্রতিও ক্রেতাদের আগ্রহ বাড়ছে। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এবার কোরবানির জন্য প্রস্তুত রয়েছে ১ লাখ ৪৬ হাজার ৪৯টি মহিষ।
গাবতলী হাটেও মহিষ দেখতে উৎসুক মানুষের ভিড় লক্ষ্য করা গেছে। বিশেষ করে বড় আকারের মহিষগুলোকে ঘিরে ক্রেতা ও দর্শনার্থীদের আগ্রহ বেশি।
কেরানীগঞ্জ থেকে আনা প্রায় এক টন ওজনের ‘টাইগার’ নামের একটি মহিষ ইতোমধ্যে হাটে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। খামারি মজিবর রহমান এর দাম হাঁকছেন ২৫ লাখ টাকা। সঙ্গে একটি ছোট গরু বিনা মূল্যে দেওয়ার ঘোষণাও দিয়েছেন তিনি।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) শাহজামান খান বলেন, মহিষের মাংসে তুলনামূলকভাবে চর্বি ও কোলেস্টেরল কম এবং খনিজ উপাদান বেশি থাকায় অনেকেই এখন মহিষ কোরবানির দিকে ঝুঁকছেন।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইলের জুয়েল হোসেন বলেন, সাতজন মিলে ২ লাখ ৪১ হাজার ৫০০ টাকায় একটি মহিষ কিনেছেন তাঁরা। তাঁর মতে, গরুর তুলনায় মহিষে মাংস বেশি পাওয়া যায় এবং অনেকের কাছে এটি বেশি পছন্দের।
চট্টগ্রামের সন্দ্বীপের খামারি মাকসুদুর রহমান বলেন, ‘মহিষের মাংস স্বাস্থ্যসম্মত মনে করেই অনেকেই এখন মহিষ কোরবানি দিচ্ছেন। ফলে চাহিদাও বাড়ছে।’
বৃষ্টিতে কমেছে বেচাকেনা
ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, সোমবার পর্যন্ত বিক্রি সন্তোষজনক ছিল। কিন্তু মঙ্গলবারের বৃষ্টি পুরো পরিস্থিতি বদলে দিয়েছে। ক্রেতার উপস্থিতি কমেছে, আবার অনেকেই হাটে এসেও ভোগান্তির কারণে দ্রুত ফিরে যাচ্ছেন।
অন্যদিকে ক্রেতাদের অভিযোগ, গত বছরের তুলনায় পশুর দাম বেড়েছে। যে ধরনের গরু গত বছর ৬৫ থেকে ৭০ হাজার টাকায় পাওয়া যেত, এবার তার জন্য প্রায় এক লাখ টাকা বা তারও বেশি গুনতে হচ্ছে।
ঈদের আর মাত্র কয়েক দিন বাকি। তাই আবহাওয়া স্বাভাবিক হলে এবং হাটের ব্যবস্থাপনা উন্নত করা গেলে শেষ মুহূর্তে বেচাকেনা আরও জমে উঠবে বলে আশা করছেন ব্যবসায়ী ও খামারিরা।
সানা/আপ্র/২৭/৫/২০২৬