রাজধানীর উত্তরার দিয়াবাড়ীতে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে বিমানবাহিনীর প্রশিক্ষণ যুদ্ধবিমান বিধ্বস্তের ঘটনায় উড়োজাহাজের কোনো কারিগরি ত্রুটি পাওয়া যায়নি। সরকারি তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনে দুর্ঘটনার মূল কারণ হিসেবে উঠে এসেছে মনুষ্য-ত্রুটি, যা পরিবেশগত কিছু প্রভাবকের কারণে আরো জটিল হয়ে ওঠে।
তদন্ত কমিশনের ভাষ্য, পাইলটের ধারাবাহিক প্রশিক্ষণের ঘাটতি, গ্রাউন্ড বা কমান্ডিং সুপারভাইজারের পর্যাপ্ত তদারকির অভাব এবং মাইলস্টোনের ভবন নির্মাণে ত্রুটি-এই তিনটি বিষয় দুর্ঘটনার ভয়াবহতা বাড়িয়েছে।
২০২৫ সালের ২১ জুলাই বিমানবাহিনীর প্রশিক্ষণ যুদ্ধবিমান ‘এফ-৭বিজিআই’ মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের হায়দার আলী ভবনে বিধ্বস্ত হয়। ভয়াবহ ওই দুর্ঘটনায় পাইলটসহ ৩৬ জন নিহত হন। নিহতদের মধ্যে ২৮ জন শিক্ষার্থী, তিনজন শিক্ষক, তিনজন অভিভাবক ও একজন স্কুলকর্মী ছিলেন।
তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের গঠিত নয় সদস্যের তদন্ত কমিশন গত বছরের ৪ নভেম্বর প্রতিবেদন জমা দেয়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, “সামগ্রিক পর্যালোচনায় এই বিমান বিধ্বস্তের দুর্ঘটনার মূল কারণ হিসেবে মনুষ্য-ত্রুটি চিহ্নিত করা যায়, যা পরিবেশগত প্রভাবক দ্বারা ত্বরান্বিত হয়েছে।”
বিমানের কোনো যান্ত্রিক ত্রুটি ছিল না: তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দুর্ঘটনার দিন আবহাওয়া স্বাভাবিক ছিল। পাইলট ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তৌকির ইসলাম উড্ডয়নের জন্য উপযুক্ত ছিলেন এবং এফ-৭বিজিআই যুদ্ধবিমানেও কোনো কারিগরি ত্রুটি পাওয়া যায়নি।
বিমানটির ইঞ্জিন, হাইড্রলিক সিস্টেম ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায় কোনো সতর্ক সংকেতও পাওয়া যায়নি। দুর্ঘটনার পর বিমানের ফ্লাইট ডেটা রেকর্ডার (এফডিআর) বিশ্লেষণ করে এ তথ্য পাওয়া যায়।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঘাঁটি থেকে চূড়ান্ত বাঁক নেওয়ার সময় মাত্র কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে বিমানের ‘ব্যাংক অ্যাঙ্গেল’ ৫৯ ডিগ্রি থেকে বেড়ে ৬৫ দশমিক ৩০ ডিগ্রিতে পৌঁছায়। এরপর পাইলট কন্ট্রোল স্টিক টানলে বিমানের ‘অ্যাঙ্গেল অব অ্যাটাক’ নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করে। ফলে বিমানটি ‘স্টল’ অবস্থায় চলে যায়।
এরপর পাইলট চেষ্টা করেও বিমানটির নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে আনতে পারেননি। ক্রমাগত উচ্চতা হারিয়ে বিমানটি মাইলস্টোনের ভবনের সামনে আছড়ে পড়ে।
পাইলটের প্রশিক্ষণ ও তদারকিতে ঘাটতি: তদন্ত কমিশন বলেছে, এটি ছিল পাইলট তৌকির ইসলামের প্রথম একক উড্ডয়ন। পর্যাপ্ত ধারাবাহিক প্রশিক্ষণের অভাবের কারণে সংকটপূর্ণ পরিস্থিতিতে যথাযথ সিদ্ধান্ত নিতে তিনি ব্যর্থ হন।
প্রতিবেদনে বলা হয়, স্টল পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের ক্ষেত্রে পাইলটের প্রতিক্রিয়া যথাযথ ছিল না। চাপপূর্ণ পরিস্থিতি মোকাবিলায় তার ধীর প্রতিক্রিয়াও দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
একই সঙ্গে দায়িত্বপ্রাপ্ত অফিসার কমান্ডিংয়ের পর্যাপ্ত তদারকির অভাবের বিষয়টিও উল্লেখ করেছে কমিশন।
তদন্তে বলা হয়েছে, প্রথম একক উড্ডয়নের মিশন প্রোফাইলের সঙ্গে সামঞ্জস্য না থাকলেও পাইলটকে পুনরায় নির্দিষ্ট অবস্থানে ফেরার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।
পাখির আঘাতের সম্ভাবনা: তদন্ত প্রতিবেদনে সম্ভাব্য পরিবেশগত প্রভাবক হিসেবে পাখির আঘাতের বিষয়টিও উঠে এসেছে।
মাইলস্টোনের সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণে দেখা যায়, দুর্ঘটনার আগে বিমানের উইন্ডশিল্ডে একটি কালো দাগ দেখা গেছে। এটি পাখি বা উড়ন্ত কোনো বস্তুর আঘাত হতে পারে বলে ধারণা করা হয়েছে।
তবে এটিসি রেকর্ডে পাইলটের পক্ষ থেকে ‘বার্ড হিট’ বা এ ধরনের কোনো সতর্কবার্তা দেওয়ার প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
ভবন নির্মাণেও ত্রুটি: তদন্ত কমিশন দুর্ঘটনার ক্ষয়ক্ষতি বাড়ার পেছনে মাইলস্টোনের ভবন নির্মাণ ব্যবস্থাকেও দায়ী করেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০০৬ সালে নির্মিত তিনতলা ওই ভবনের নিচতলা মাটি ভরাটের কারণে আংশিকভাবে নিচে চলে গিয়েছিল। ১৯টি শ্রেণিকক্ষের ওই ভবনে ৭৩৭ জন শিক্ষার্থী ও অর্ধশতাধিক শিক্ষক থাকলেও ছিল মাত্র একটি সিঁড়ি। এ কারণে বিমান বিধ্বস্তের পর আগুন ছড়িয়ে পড়লে অনেক শিক্ষার্থী ও শিক্ষক দ্রুত বের হতে পারেননি। কমিশন আরো জানিয়েছে, ভবনটির নির্মাণ অনুমোদনের বিষয়েও স্কুল কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় নথি দেখাতে পারেনি।
ভবিষ্যতে দুর্ঘটনা এড়াতে ৩০ সুপারিশ: তদন্ত কমিশন ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ঘটনা এড়াতে ৩০টি সুপারিশ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে-বিমানবাহিনীর প্রশিক্ষণ পদ্ধতিতে প্রয়োজনীয় সংস্কার, তদারকি ব্যবস্থা জোরদার, ঘনবসতিপূর্ণ এলাকার বাইরে নতুন বিমান ঘাঁটি স্থাপন, প্রশিক্ষণের জন্য ঢাকার বাইরে আলাদা সুবিধা তৈরি এবং বিমান বহর আধুনিকায়ন। এ ছাড়া সংশ্লিষ্ট সুপারভাইজিং কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশও করা হয়েছে। তদন্ত কমিশনের সদস্য নগর পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক আদিলো মুহাম্মদ খান বলেন, দুর্ঘটনার কারণ ও জননিরাপত্তার বিষয়গুলো নিয়ে জনগণের সামনে আলোচনা হওয়া প্রয়োজন, যাতে ভবিষ্যতে এমন ট্র্যাজেডি এড়ানো যায়।
সানা/আপ্র/২২/৭/২০২৬