‘লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক’ ধ্বনিতে মুখরিত হয়ে উঠল পবিত্র মক্কা ও তার আশপাশের জনপদ। মহান আল্লাহর প্রতি নিঃশর্ত আনুগত্য, আত্মসমর্পণ ও ক্ষমা প্রার্থনার মধ্য দিয়ে মঙ্গলবার (২৬ মে) পালিত হয়েছে পবিত্র হজ। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আসা লাখো মুসল্লি ইসলামের অন্যতম প্রধান ইবাদত হজ পালন করতে সমবেত হন আরাফাতের ঐতিহাসিক ময়দানে।
বার্তা সংস্থা এপির তথ্য অনুযায়ী, এবার বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা ১৫ লাখের বেশি ধর্মপ্রাণ মুসলমান হজ পালন করেছেন। সূর্যোদয়ের পর মিনার তাঁবু নগরী থেকে আরাফাতের ময়দানের উদ্দেশে রওনা দেন তাঁরা। প্রচণ্ড গরম উপেক্ষা করে হাজিদের কণ্ঠে ধ্বনিত হয় তালবিয়া—
‘লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক, লাব্বাইকা লা শারিকা লাকা লাব্বাইক, ইন্নাল হামদা ওয়ান নি’মাতা লাকা ওয়াল মুলক, লা শারিকা লাক।’
অর্থাৎ—‘আমি হাজির, হে আল্লাহ, আমি হাজির। তোমার কোনো শরিক নেই, আমি হাজির। নিশ্চয়ই সব প্রশংসা, সব নিয়ামত এবং সব রাজত্ব তোমারই। তোমার কোনো শরিক নেই।’
হজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিন
ইসলামের পাঁচ স্তম্ভের একটি হজ। আর্থিক ও শারীরিকভাবে সক্ষম মুসলমানদের জন্য জীবনে অন্তত একবার হজ পালন ফরজ। হজের অন্যতম প্রধান ও ফরজ রুকন হলো ৯ জিলহজ আরাফাতের ময়দানে অবস্থান।
মিনা থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই বিস্তীর্ণ প্রান্তরে হাজিরা দিনভর ইবাদত, জিকির, তওবা ও মোনাজাতে মশগুল থাকেন। কেউ জাবালে রহমত পাহাড়ের পাদদেশে, কেউবা তাঁবুতে কিংবা খোলা প্রান্তরে বসে আল্লাহর রহমত ও ক্ষমা প্রার্থনা করেন।
হাদিসে আরাফাতের দিনকে আল্লাহর পক্ষ থেকে বান্দার গুনাহ মাফের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সময় হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। ফলে এদিন আত্মশুদ্ধি ও পাপমুক্তির আকাঙ্ক্ষায় হাজিদের চোখে-মুখে ছিল গভীর আবেগ ও নিবেদন।
মসজিদে নামিরায় খুতবা ও দোয়া
আরাফাতের ময়দানে অবস্থিত ঐতিহাসিক মসজিদে নামিরায় অনুষ্ঠিত হয় হজের খুতবা। সেখানে জোহর ও আসরের নামাজ এক আজান ও দুই ইকামতে একসঙ্গে আদায় করেন হাজিরা।
সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা এসপিএ জানায়, খুতবা প্রদান করেন মসজিদে নববির ইমাম শেখ আলী আল-হুদাইফি। তিনি মুসলিম উম্মাহর ঐক্য, শান্তি ও কল্যাণ কামনা করে দোয়া করেন।
খুতবায় তিনি বলেন, ‘হে আল্লাহ, মুসলমানদের অবস্থা ভালো করে দিন, তাদের মধ্যে ঐক্য সৃষ্টি করুন এবং তাদের সত্যের পথে পরিচালিত করুন।’
একই সঙ্গে তিনি মুসলমানদের তাকওয়া অবলম্বন, একত্ববাদের প্রতি অবিচল থাকা এবং আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও কাছে সাহায্য না চাওয়ার আহ্বান জানান।
সূর্যাস্তের পর মুজদালিফার পথে
আরাফাতে অবস্থান শেষে সূর্যাস্তের পর হাজিরারা মুজদালিফার উদ্দেশে রওনা হন। ইসলামী বিধান অনুযায়ী, আরাফাত থেকে মুজদালিফার পথে মাগরিবের নামাজ আদায় করা হয় না। মুজদালিফায় পৌঁছে মাগরিব ও এশার নামাজ একসঙ্গে আদায় করেন তাঁরা।
খোলা আকাশের নিচে রাতযাপন করেন লাখো হাজি। ইসলামী ঐতিহ্য অনুযায়ী, আদি পিতা হজরত আদম (আ.) ও আদি মাতা হজরত হাওয়া (আ.) এই প্রান্তরেই অবস্থান করেছিলেন।
মুজদালিফায় অবস্থানকালে হাজিরা মিনায় শয়তানকে পাথর নিক্ষেপের জন্য প্রয়োজনীয় পাথর সংগ্রহ করেন।
মিনায় শয়তানকে পাথর নিক্ষেপ
ফজরের নামাজের পর সূর্যোদয়ের আগে হাজিরা আবার মিনায় ফিরে যান। সেখানে বড় জামারায় শয়তানের উদ্দেশে পাথর নিক্ষেপের মাধ্যমে হজের গুরুত্বপূর্ণ আরেকটি আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করেন।
মিনায় অবস্থিত তিনটি স্তম্ভ—ছোট জামারা, মধ্যম জামারা ও বড় জামারাকে কেন্দ্র করে পরবর্তী তিন দিন ধারাবাহিকভাবে পাথর নিক্ষেপ করবেন হাজিরা। মোট ৭০টি পাথর নিক্ষেপের বিধান রয়েছে।
পাথর নিক্ষেপের পর কোরবানি সম্পন্ন করা হয়। এরপর পুরুষ হাজিরা মাথা মুণ্ডন বা চুল ছোট করেন। এ পর্যায়ে হজের বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়।
বিদায়ী তাওয়াফ শেষে দেশে ফেরা
মিনায় নির্ধারিত কর্মসূচি শেষ করে হাজিরা পুনরায় মক্কায় ফিরে যান। সেখানে পবিত্র কাবাঘর তাওয়াফের মাধ্যমে বিদায়ী তাওয়াফ সম্পন্ন করেন।
এরপর নিজ নিজ দেশে ফেরার প্রস্তুতি নেন তাঁরা। আর যাঁরা এখনো মদিনায় যাননি, তাঁদের অনেকেই মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)–এর রওজা মোবারক জিয়ারতের উদ্দেশে মদিনার পথে যাত্রা করবেন।
বিশ্বের বিভিন্ন ভাষা, বর্ণ ও জাতিসত্তার লাখো মুসলমানের এই মহাসমাবেশ আবারও মুসলিম উম্মাহর ঐক্য, ভ্রাতৃত্ব ও আত্মত্যাগের অনন্য প্রতীক হয়ে উঠেছে। আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন, পাপমুক্তি এবং মানবজাতির শান্তি-কল্যাণের প্রার্থনায় শেষ হয়েছে পবিত্র হজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিন।
সূত্র: এপি, এসপিএ।
সানা/আপ্র/২৭/৫/২০২৬