গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
বৃহস্পতিবার, ২০ আগস্ট ২০২৬

মেনু

ইসলাম===

মুমিনের জীবনের প্রতিটি কাজ কেন ইবাদত

প্রত্যাশা ডেস্ক

প্রত্যাশা ডেস্ক

প্রকাশিত: ২০:৫১ পিএম, ০৩ জুলাই ২০২৬ | আপডেট: ১৮:০৪ এএম ২০২৬
মুমিনের জীবনের প্রতিটি কাজ কেন ইবাদত
ছবি

ছবি সংগৃহীত

ইসমত আরা

আমরা অনেকেই ইবাদত বলতে শুধু নামাজ, রোজা, হজ, জাকাত কিংবা কিছু নির্দিষ্ট ধর্মীয় আমলকেই বুঝি। অথচ ইসলামের দৃষ্টিতে ইবাদতের পরিধি এর চেয়ে অনেক বেশি বিস্তৃত। একজন মুমিনের পুরো জীবন—তার কথা, চিন্তা, অনুভূতি, কাজ, পরিবার, উপার্জন, এমনকি বিশ্রামও—সঠিক নিয়ত ও আল্লাহর আনুগত্যের মাধ্যমে ইবাদতে পরিণত হতে পারে।

ইসলাম মানুষের জীবনকে এভাবে ভাগ করেনি যে এক ভাগ দুনিয়া আর আরেক ভাগে ইবাদত। ইসলাম শিখিয়েছে, মানুষের পুরো জীবনই ইবাদত বা আল্লাহর জন্য নিবেদিত হতে পারে এবং সেটাই হওয়া উচিত।

ইবাদতের স্বরূপ ও মূল ভিত্তি: আরবি ‘আল-ইবাদাহ’ শব্দের অর্থ হলো দাসত্ব, আনুগত্য ও বিনয় প্রকাশ করা। শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়্যাহ ইবাদতের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলেন, ‘ইবাদত হলো এমন সকল প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য কথা ও কাজের সমষ্টি- যা আল্লাহ ভালোবাসেন এবং যার প্রতি তিনি সন্তুষ্ট (ইবনে তাইমিয়া, আল-উবুদিয়্যাহ, পৃষ্ঠা: ৪৩, আল-মাকতাবুল ইসলামি, বৈরুত, ১৪০৫ হিজরি)। এ সংজ্ঞাটি আমাদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্যকে উন্মোচন করে। ইবাদত শুধু কিছু যান্ত্রিক আচার-অনুষ্ঠানের নাম নয়; বরং এমন একটি সামগ্রিক জীবনব্যবস্থা, যেখানে মানুষের অন্তর, মুখ, শরীর, সম্পদ এবং আচরণ- সবকিছুই আল্লাহর সন্তুষ্টির দিকে পরিচালিত হয়।

আল্লাহর দরবারে ইবাদত কবুল হওয়ার প্রধান শর্ত দুটি- চরম বিনয় ও নিঃশর্ত আনুগত্য। বিনয় মানে মনের সব অহঙ্কার দূর করে আল্লাহর সামনে নিজেকে পুরোপুরি ছোট ও অসহায় মনে করা। আর আনুগত্য হলো নিজের খেয়ালখুশিমতো না চলে আল্লাহর প্রতিটি আদেশ-নিষেধ নিখুঁতভাবে মেনে চলা। সহজ কথায়- অহঙ্কার ও অবাধ্যতা পরিহার করে নিজের ইচ্ছা-অনিচ্ছাকে আল্লাহর কাছে পুরোপুরি সমর্পণের নামই হলো প্রকৃত ইবাদত। কোন কথা বা কাজ আল্লাহ পছন্দ করেন, তা জানার একমাত্র নির্ভরযোগ্য মাধ্যম হলো পবিত্র কোরআন ও নবীজির বিশুদ্ধ সুন্নাহ। ওহির প্রমাণ ছাড়া কোনো মনগড়া আমলকে শরিয়তে ইবাদত বলা যায় না।

ইবাদতের নানামুখী রূপ: ইসলামে ইবাদতকে তার প্রকাশ ও মাধ্যমের ওপর ভিত্তি করে কয়েকটি ভাগে বিন্যস্ত করা যায়। তা হলো-

অন্তরের ইবাদত: যা কেবল মনের গভীরের বিশ্বাসের সাথে সম্পৃক্ত। যেমন—ইমান, ইখলাস (একনিষ্ঠতা), আল্লাহর রহমতের আশা, তাঁর শাস্তির ভয়, ধর্মীয় জ্ঞান অর্জন এবং আল্লাহর জন্য ভালোবাসা।

মৌখিক ইবাদত: যে ইবাদত করতে অন্তর ও জিহ্বা উভয়ের প্রয়োজন হয়। যেমন—কালিমা শাহাদাত পাঠ করা, দোয়া, জিকির-তাসবিহ, কোরআন তিলাওয়াত, আজান-ইকামত এবং ভালো কথার মাধ্যমে মানুষকে সত্যের পথে দাওয়াত দেওয়া।

শারীরিক ইবাদত: যা সম্পন্ন করতে অন্তরের একাগ্রতার পাশাপাশি দৈহিক শ্রমের প্রয়োজন হয়। যেমন—নামাজ পড়া (রুকু, সিজদা, কিয়াম), কাবা শরিফ তাওয়াফ করা এবং সাফা-মারওয়া পাহাড়ে সায়ি করা।

আর্থিক ইবাদত: এ জন্য অন্তরের সদিচ্ছার সঙ্গে সম্পদের প্রয়োজন পড়ে। যেমন—জাকাত, ফিতরা, কোরবানি ও দান-সদকা।

সমন্বিত ইবাদত: যাতে শারীরিক পরিশ্রম, মানসিক একাগ্রতা এবং আর্থিক সামর্থ্য—সবকিছুরই প্রয়োজন হয়। যেমন—পবিত্র হজ পালন এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য জিহাদ করা।

হারাম থেকে বেঁচে থাকা একটি  ইবাদত: আমরা সাধারণত ইবাদত বলতে কিছু ‘করা’কে বুঝি। কিন্তু ইসলাম আমাদের শেখায়, অনেক সময় নির্দিষ্ট কিছু ‘না করাটাও’ অনেক বড় ইবাদত হতে পারে। মানুষ মনে করে, শুধু বেশি বেশি নফল আমল করলেই বড় ইবাদতকারী হওয়া যায়। অথচ আসল বিষয় হলো, আল্লাহর ভয়ে হারাম কাজ থেকে নিজেকে বিরত রাখাও অনেক বড় একটি ইবাদত।

যখন একজন মানুষ গোপনে হারাম কাজ করার পূর্ণ সুযোগ পায়; অথচ শুধু আল্লাহর ভয়ে নিজেকে সে কাজ থেকে বিরত রাখে, সেটি তখন আল্লাহর কাছে মূল্যবান আমল হয়ে যায়। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘তুমি হারাম বিষয়গুলো থেকে বেঁচে থাকো। তাহলে তুমি মানুষের মধ্যে সর্বাধিক ইবাদতকারী হবে’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৩০৫)। সহিহ হাদিসে এসেছে, কেয়ামতের দিন সাত শ্রেণির মানুষ আল্লাহর আরশের ছায়া লাভ করবে। তাদের একজন সেই ব্যক্তি, যাকে কোনো সুন্দরী ও সম্ভ্রান্ত নারী অবৈধ সম্পর্কের আহ্বান জানিয়েছিল। কিন্তু সে দৃঢ়ভাবে বলেছিল, ‘আমি আল্লাহকে ভয় করি’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৬০)।

আবার বনি ইসরাইলের সেই তিন ব্যক্তির ঘটনাতেও দেখা যায়, একজন ব্যক্তি সব ধরনের সুযোগ থাকা সত্ত্বেও শুধুমাত্র আল্লাহর ভয়ে হারাম সম্পর্ক থেকে ফিরে এসেছিলেন। পরবর্তী সময়ে সেই আন্তরিক আমলের অসিলাতেই আল্লাহ তাঁদের পাহাড়ের গুহায় আটকে পড়া অবস্থা থেকে অলৌকিকভাবে মুক্তি দান করেছিলেন (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২২১৫)। আজকের যুগে যেখানে বিভিন্ন ধরনের গুনাহ মানুষের হাতের মুঠোয়- মোবাইল বা কম্পিউটারের স্ক্রিন বেয়ে মানুষের একদম ব্যক্তিগত সময়ে পৌঁছে গেছে, সেখানে এই হাদিসের শিক্ষা আরও বেশি প্রাসঙ্গিক। প্রকৃত তাকওয়া তখনই প্রকাশ পায়, যখন কেউ মানুষের চোখের আড়ালে থেকেও আল্লাহকে স্মরণ করে ও ভয় করে।

সাধারণ কাজের ইবাদতে রূপান্তর: ইসলামের অন্যতম সৌন্দর্য হলো একজন মুমিন তার দৈনন্দিন বৈধ ও প্রাত্যহিক কাজগুলোকেও সৎ নিয়তের মাধ্যমে ইবাদতে পরিণত করতে পারেন। ঘুমানো, খাওয়া, হালাল উপার্জন, ব্যবসা, বিয়ে, সন্তান লালন-পালন, লেখাপড়া, রান্নাবান্না কিংবা কৃষিকাজ—সবকিছুই এর অন্তর্ভুক্ত; এমনকি প্রযুক্তি ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকেও উত্তম নিয়তের মাধ্যমে ব্যবহার করা ইবাদত হয়ে যেতে পারে; যদি আমাদের উদ্দেশ্য হয় আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা, নিজেকে হারাম থেকে রক্ষা করা এবং ভালো কাজে অন্যকে সাহায্য করা।

হালাল উপার্জনের জন্য পরিশ্রম করাও ইসলামের দৃষ্টিতে একটি বড় ইবাদত। এক ব্যক্তি নবীজির সামনে দিয়ে অতিক্রম করলে সাহাবিরা তার কর্মশক্তি দেখে আফসোস করে বললেন, ‘সে যদি আল্লাহর পথে (জিহাদে) থাকত!’ তখন রাসুল (সা.) বললেন, ‘যদি সে তার ছোট সন্তানদের ভরণ-পোষণের জন্য বের হয়ে থাকে; তাহলে সে আল্লাহর পথেই আছে। যদি সে নিজেকে মানুষের মুখাপেক্ষী হওয়া থেকে রক্ষা করার জন্য উপার্জন করে, তবুও সে আল্লাহর পথেই আছে। আর যদি সে অহংকার ও লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে বের হয়ে থাকে, তবে সে শয়তানের পথে রয়েছে’ (তাবারানি, আল-মু’জামুল কাবির, ১৯/১২৯)।

ইবাদতের জন্য শুধু মসজিদে নয়: ইসলামে ইবাদত শুধু মসজিদের চার দেয়ালের মাঝে সীমাবদ্ধ থাকে না। একজন মুমিনের জন্য তার রান্নাঘর, কর্মক্ষেত্র, বাজার, বিদ্যালয়, বিশ্ববিদ্যালয় ও সংসার পরিচালনা- সবই ইবাদতের স্থান হতে পারে।

বাজার থেকে অফিস পর্যন্ত, কৃষিক্ষেত্র থেকে গবেষণাগার পর্যন্ত-পৃথিবীর প্রতিটি বৈধ ক্ষেত্রই একজন মুমিনের জন্য ইবাদতের ময়দান; যদি সে আল্লাহর সন্তুষ্টিকে সামনে রেখে জীবন পরিচালনা করে। তেমনি একজন নারীর জন্যও মা-বাবা, স্বামী-সন্তান ও পরিবারের মানুষের জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম করা স্রেফ নিয়তের কারণে ইবাদতে রূপান্তরিত হতে পারে। একজন মুমিন যখন অন্তরে ইমান, ইখলাস আর আল্লাহর সন্তুষ্টির নিয়ত নিয়ে চলে; তখন তার জীবনের প্রতিটি সাধারণ কাজও অসাধারণ হয়ে ওঠে। তার পুরো জীবনটাই হয়ে ওঠে আল্লাহর আনুগত্য ও তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের এক অবিরাম ও পবিত্র যাত্রা।

লেখক: শিক্ষক ও প্রাবন্ধিক

কেএমএএ/আপ্র/০৩.০৭.২০২৬

সংশ্লিষ্ট খবর

জানা গেল ২০২৭ সালের রমজান ও ঈদের সম্ভাব্য তারিখ
১৯ আগস্ট ২০২৬

জানা গেল ২০২৭ সালের রমজান ও ঈদের সম্ভাব্য তারিখ

জ্যোতির্বিজ্ঞানের হিসাব অনুযায়ী ২০২৭ সালের রমজান ও ঈদুল ফিতরের সম্ভাব্য দিনক্ষণ জানা গেছে। সৌদি আরবে...

পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) পালিত হবে ২৬ আগস্ট বুধবার
১৩ আগস্ট ২০২৬

পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) পালিত হবে ২৬ আগস্ট বুধবার

বাংলাদেশের আকাশে আজ রবিউল আউয়াল মাসের চাঁদ দেখা যায়নি। এ জন্য আগামী শনিবার (১৫ আগস্ট) থেকে রবিউল আউ...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

প্রধানমন্ত্রীর কাজে সন্তুষ্ট ৬৬ শতাংশ, সরকারের প্রতি ৫৪ শতাংশ

সরকারের ছয় মাস পূর্তি উপলক্ষে পরিচালিত এক জনমত জরিপে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দায়িত্ব পালনে ৬৬ দশমিক ৩০ শতাংশ উত্তরদাতা সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন। তাঁদের মতে, প্রধানমন্ত্রী ভালোভাবে দায়িত্ব পালন করছেন। অন্যদিকে সরকারের সামগ্রিক কর্মকাণ্ডে সন্তুষ্টির কথা জানিয়েছেন ৫৪ দশমিক ৫০ শতাংশ মানুষ। সরকারের কর্মকাণ্ডকে খারাপ বলেছেন ৩২ দশমিক ৯০ শতাংশ। ডপলার অপিনিয়ন রিসার্চের ‘অ্যাপ্রুভাল রেটিং সার্ভে ২০২৬’-এ এসব তথ্য উঠে এসেছে। প্রিয় পাঠক, আপনি কি মনে করেন এই জরিপে সরকারের সঠিক মূল্যায়ন হয়েছে?

মোট ভোট: ১ | শেষ আপডেট: 3 ঘন্টা আগে