ভোর এখনো পুরোপুরি জাগেনি। আকাশের কিনারায় ফোটেনি আলো, তবুও বুড়িগঙ্গার কালচে পানিতে নেমে গেছে একটি বৈঠা। সেই বৈঠার প্রতিটি টান যেন একেকটি দিনের শুরু, একেকটি জীবনের দায়ভার। মাঝি রইস উদ্দিনের জন্য এটাই প্রতিদিনের গল্প-নতুন করে লড়াইয়ের, বেঁচে থাকার।
বয়স পঞ্চান্ন ছুঁইছুঁই। শরীর ক্লান্ত, তবুও থেমে থাকার অবকাশ নেই। সদরঘাটের চিরচেনা কোলাহল, লঞ্চের হুইসেল, মানুষের ভিড় আর নদীর গন্ধ-এই সবকিছুর ভেতরেই কেটে গেছে তার টানা পঁচিশ বছর। সময় বদলেছে, বদলেছে শহর, নদীর চেহারাও আর আগের মতো নেই; কিন্তু বদলায়নি রইস উদ্দিনের জীবনের হিসাব।
এই নদীই তার রুজি, এই নদীই তার ভরসা। নিজের কোনো জমিজমা নেই, নেই স্থায়ী আয়ের নিশ্চয়তা। বৈঠার টানে টানেই গড়ে উঠেছে তার সংসার-স্ত্রী আর দুই সন্তানের ছোট্ট পৃথিবী। তাদের মুখের হাসিই তাকে প্রতিদিন আবার নদীতে নামায়। কিন্তু সেই হাসি ধরে রাখা এখন দিন দিন কঠিন হয়ে উঠছে।
একসময় বুড়িগঙ্গার বুকজুড়ে বৈঠাচালিত নৌকার কদর ছিল। মানুষ চলাচল করত, পণ্য যেত আসত-মাঝিদের দিন শেষে কিছুটা স্বস্তি থাকত। এখন সেই দৃশ্য বদলে গেছে। নদীতে নেমেছে ইঞ্জিনচালিত নৌকা, বেড়েছে মাঝির সংখ্যাও। যাত্রী কম, প্রতিযোগিতা বেশি। সারাদিন নদীতে কাটিয়েও আগের মতো আয় আর হয় না।
হতাশার সুরে রইস উদ্দিন বলেন, আগে দিনে হাজার টাকার মতো আয় হতো, এখন সাতশ টাকাও ঠিকমতো ওঠে না। মানুষ এখন দ্রুত যেতে চায়, বৈঠার নৌকায় উঠতে চায় না। অনেক অদক্ষ মাঝিও নদীতে নেমেছে-সব মিলিয়ে কমে গেছে আয়ের পথ।
এই সামান্য আয়ের ভেতর থেকেই তাকে দিতে হয় নৌকার ভাড়া-১৩০ টাকা। তারপর নিজের খাওয়া, নিত্যপ্রয়োজন মিটিয়ে যা থাকে, সেটুকুই নিয়ে ফিরতে হয় ঘরে। সেই টাকাতেই চলে পুরো সংসার। কখনো কখনো যাত্রীর অবস্থার দিকে তাকিয়ে ১০-২০ টাকা বেশি চাওয়ার চেষ্টা করেন-কেউ দেন, কেউ ফিরিয়ে দেন।
তার ঘরে আছে এক কিশোরী কন্যা-১২-১৩ বছরের। সংসারের চাহিদা, সন্তানের ভবিষ্যৎ-সবকিছুই নির্ভর করে এই সীমিত আয়ের ওপর। কিন্তু এত বছরের পরিশ্রমেও জমেনি কোনো সঞ্চয়। হঠাৎ প্রয়োজন এলে ভরসা কিস্তির টাকা-যা সাময়িক স্বস্তি দিলেও ভবিষ্যতের দুশ্চিন্তা বাড়িয়ে দেয়।
গ্রামের বাড়িতে নেই নিজের জমি। অন্যের জমিতে সামান্য চাষাবাদ করেন। তবুও বড় কোনো বিপদে পড়লে কিস্তির আশ্রয় নিতে হয়, আর সেই ঋণের বোঝা বইতে হয় দিনের পর দিন।
প্রকৃতিও যেন তার জীবনের আরেক প্রতিপক্ষ। সপ্তাহের ছুটির দিনে কিছুটা আয় বাড়লেও ঝড়-বৃষ্টির দিনে সব হিসাব এলোমেলো হয়ে যায়। আকাশ মেঘলা হলে, নদীতে ঢেউ উঠলে যাত্রী কমে যায়। কখনো কখনো নিরাপত্তার কারণে নৌকা চালানোই কঠিন হয়ে পড়ে। এমন দিনও যায়, যখন সারাদিন নদীতে থেকেও হাতে তেমন কিছু আসে না।
বয়স বাড়ছে, শরীরের শক্তি কমছে। তবুও থামার সুযোগ নেই। তার জীবনে অবসর বলে কিছু নেই-আছে শুধু দায়িত্ব। সন্তানদের ভবিষ্যৎ, পরিবারের চাহিদা-এইসবই তাকে প্রতিদিন নতুন করে শক্তি জোগায়।
শহরের ব্যস্ত মানুষের ভিড়ে রইস উদ্দিন যেন এক অদৃশ্য চরিত্র। তার কষ্ট, তার গল্প-কেউ শোনে না। অথচ প্রতিদিন অসংখ্য মানুষকে নদী পার করে দিয়ে তিনি হয়ে ওঠেন এক নীরব সহযোদ্ধা। তার বৈঠার প্রতিটি টানে জমা থাকে জীবনের ইতিহাস, সংগ্রামের দীর্ঘ ছায়া আর অদম্য বেঁচে থাকার ইচ্ছা।
বুড়িগঙ্গার কোলাহলময় পাড়ে রইস উদ্দিন একা নন। তার মতো আরো অনেক মাঝি আছেন-যাদের জীবন নদীর স্রোতের মতোই বয়ে চলে। কেউ ক্লান্ত, কেউ সংগ্রামী, কেউ স্বপ্ন দেখে আগামী দিনের। তবুও থেমে থাকে না কেউ। কারণ তাদের বিশ্বাস-জীবন মানেই চলার নাম। আর সেই চলার সঙ্গী হয়ে বুড়িগঙ্গার বুকে ভেসে থাকে ছোট্ট নৌকাটি-তাদের আশা, তাদের বেঁচে থাকার শেষ অবলম্বন।
সানা/আপ্র/৩/৫/২০২৬