টানা বৃষ্টি আর উজান থেকে নেমে আসা ঢলের পানিতে কিশোরগঞ্জ ও মৌলভীবাজারের হাওরাঞ্চলে বোরো ধানের ভয়াবহ ক্ষতি হয়েছে। কাটা ধান যেমন পানিতে তলিয়ে পচে যাচ্ছে, তেমনি মাঠে থাকা পাকা ধানও ডুবে নষ্ট হচ্ছে। কৃষকেরা বলছেন, এক বছরের ভরসার ফসল এখন চোখের সামনে হারিয়ে যাচ্ছে।
কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জ উপজেলার মানিকপুর হাওরের কৃষক জহিরুল ইসলাম এক সপ্তাহ আগে প্রায় ৩৫০ মণ ধান কেটে মাড়াই শেষে জমির পাড়ে শুকানোর জন্য স্তূপ করে রেখেছিলেন। কিন্তু টানা সাত দিনের বৃষ্টিতে সেই ধান শুকানো তো দূরের কথা, বরং চারা গজিয়ে গেছে। পচনের তীব্র দুর্গন্ধে এলাকা ভারী হয়ে ওঠে। শেষ পর্যন্ত কোনো উপায় না পেয়ে তিনি শনিবার (২ মে) ধানগুলো হাওরের পানিতে ভাসিয়ে দেন।
তিনি বলেন, “পচা ধানের গন্ধ আর সহ্য হচ্ছে না। হাওরের পানিতে দিছি ভাসাইয়া।”
একই গ্রামের কৃষক তমিজ উদ্দিন জানান, মাড়াই করা ৭০ বস্তা ধান শুকাতে না পারায় পুরো ফসল নষ্ট হয়ে গেছে। বাধ্য হয়ে বস্তাসহ ধান পানিতে ফেলে দিতে হয়েছে। তার ভাষায়, “সারা বছরের খাটুনি চোখের সামনে পানিতে মিশে গেল।”
নিকলী, ইটনা, মিঠামইন ও অষ্টগ্রামের বিস্তীর্ণ হাওরে একই চিত্র। কোথাও কাটা ধান পানিতে ডুবে আছে, কোথাও আবার স্তূপ করে রাখা ধানে অঙ্কুর গজিয়েছে। শ্রমিক সংকট, অতিরিক্ত মজুরি এবং টানা বৃষ্টির কারণে সময়মতো ধান শুকানো সম্ভব হয়নি।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চলে অন্তত ৯ হাজার ৪৫ হেক্টর বোরো ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। এতে প্রায় ৩০ হাজারের বেশি কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। অনেক পরিবার এখনো কাটা ধান ঘরে তুলতে পারেনি, আবার অনেকের ফসল পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গেছে।
নিকলীর কৃষক কালা মিয়া বলেন, “যে ধান কেটে এনেছিলাম, সেটাও রক্ষা করতে পারলাম না। এখন দেখি কালো হয়ে পচে যাচ্ছে। শ্রমিকও পাওয়া যায় না, টাকাও লাগে বেশি।”
মিঠামইনের ঢাকি এলাকার কৃষক কামাল হোসেন জানান, তার পাঁচ একরের বেশি জমির ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। কিছু অংশ ভেসে থাকলেও শ্রমিক না পাওয়ায় কাটতে পারছেন না। তিনি বলেন, অনেকেই বাধ্য হয়ে জমি উন্মুক্ত করে দিয়েছেন-যে যেভাবে পারে ধান কেটে নিয়ে যাক।
এদিকে মৌলভীবাজারের হাকালুকি, কাউয়াদিঘি ও মনু প্রকল্প এলাকার হাওরেও অন্তত ২ হাজার ১৬০ হেক্টর জমির ফসল নষ্ট হয়েছে। টানা বৃষ্টিতে এসব এলাকায় ধান পানিতে পচে যাচ্ছে এবং স্তূপ করা ধানে অঙ্কুরোদগম দেখা দিচ্ছে।
হাকালুকি হাওর পাড়ের কৃষক খসরু মিয়া বলেন, “ঋণ করে ধান করেছি। এখন সব শেষ। ঘরে খাবার নাই, ঋণ শোধের পথও নাই।”
পানি উন্নয়ন বোর্ড জানায়, নদ-নদীর পানি এখনো বিপৎসীমার নিচে থাকলেও হাওরে বৃষ্টির পানি জমে পরিস্থিতি জটিল হয়েছে। পানি নিষ্কাশনের তুলনায় বৃষ্টির পরিমাণ বেশি হওয়ায় দ্রুত স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা কম।
কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, বৃষ্টি অব্যাহত থাকলে ক্ষতির পরিমাণ আরো বাড়তে পারে। আর হাওরের কৃষকেরা বলছেন, ফসল হারানোর এই যন্ত্রণা শুধু অর্থনৈতিক নয়-এটা এক বছরের বেঁচে থাকার লড়াই ভেঙে পড়া। কৃষকদের অনেকেই আর্তনাদ করছেন-বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে সংসার চলবে কীভাবে? আমরা খাবো কী?
হাওরে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সহযোগিতায় তহবিল বাড়ছে: টানা বৃষ্টিতে হাওরে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য সরকারি সহযোগিতার তহবিল বাড়ানোর কথা বলেছেন কৃষি এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ।
তিনি বলেছেন, আক্রান্ত হাওরাঞ্চলের জেলা প্রশাসক ও কৃষি অধিদপ্তর থেকে ক্ষতিগ্রস্তদের তথ্য নিচ্ছে সরকার। যারা চরম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, তাদের জন্য সরকারের যে তহবিল সেটি বাড়ানোর উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। সেইসঙ্গে যেসব বেড়িবাঁধ ভেঙে হাওর প্লাবিত হয়েছে, সেগুলো টেকসই করার জন্য পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।
শনিবার কুমিল্লায় শহীদ ভাষা সৈনিক ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত স্টেডিয়ামের জিমনেসিয়ামে ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস-২০২৬’ এর জেলা পর্যায়ে উদ্বোধন অনুষ্ঠানে গিয়ে সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন তিনি।
জাতীয়ভাবে এদিন বিকাল পৌনে ৪টায় সিলেট জেলা স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠানটি উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। কুমিল্লায় অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন কৃষিমন্ত্রী।
ইউনিয়নে ইউনিয়নে মাইকিং করে ন্যায্যমূল্যে ধান সংগ্রহ করার কথা জানিয়ে আমিন উর রশিদ বলেন, ইউনিয়ন পর্যায়ে ধান সংগ্রহ করা হলে কৃষকরা ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বেশি লাভবান হবেন। হাওরে চরম ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সহযোগিতায় তিন মাসের খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি এবং অন্যদেরও সহযোগিতার আওতায় আনায় প্রকল্প নেওয়া হবে।
এর আগে মন্ত্রী কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের আন্তঃবিভাগ বিতর্ক প্রতিযোগিতার পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠানে বলেন, কৃষিই অর্থনীতির মূল চালিকা শক্তি। তাই কৃষকের মর্যাদা বাড়লে দেশের মর্যাদা বাড়বে।
ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর মো. আবুল বাশার ভূঁঞার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের প্রশাসক ইউসুফ মোল্লা টিপু, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) সাইফুল ইসলাম, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সাইফুল মালিক, আদর্শ সদর উপজেলা বিএনপির সভাপতি রেজাউল কাইয়ূম, কুমিল্লা মডার্ন হাই স্কুলের সভাপতি নিজাম উদ্দিন কায়সার এবং দৈনিক কুমিল্লার কাগজের সম্পাদক আবুল কাশেম হৃদয় উপস্থিত ছিলেন।
সানা/আপ্র/৩/৫/২০২৬