টানা দুই দিনের বৃষ্টি, তুফান ও বজ্রপাতে কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চলে পাকা বোরো ধান তলিয়ে গেছে। এতে ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছেন কৃষকেরা। পানি বৃদ্ধি ও বজ্রপাতের ভয়ে অনেক কৃষক মাঠে নামতে পারছেন না, ফলে ধান কাটা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
গত রোববার বিকেল থেকে সোমবার বিকেল পর্যন্ত অষ্টগ্রাম, ইটনা ও মিঠামইনসহ হাওরাঞ্চলে বৃষ্টি ও ঝড় অব্যাহত ছিল। দুই দিন আগেও যে ধান বাতাসে দুলছিল, এখন তার বড় অংশই পানির নিচে চলে গেছে।
কৃষকদের তথ্যমতে, গত দুই দিনে অষ্টগ্রামের খয়েরপুর–আব্দুল্লাহপুর ও আদমপুর এলাকা এবং ইটনা ও মিঠামইনের কিছু অংশে প্রায় দুই থেকে আড়াই হাজার হেক্টর জমির পাকা বোরো ধান তলিয়ে গেছে।
অষ্টগ্রামের খয়েরপুর–আব্দুল্লাহপুর হাওরে গিয়ে দেখা যায়, কৃষকেরা নৌকা দিয়ে পানিতে ডুবে থাকা ধান কেটে ‘গলাডোবা’ অবস্থায় সংগ্রহ করছেন। কেউ কেউ অতিরিক্ত খরচে শ্রমিক দিয়ে ধান তুলছেন, আবার কেউ শেষ চেষ্টা হিসেবে কোমরপানিতে নেমে ধান কেটে ভেলায় তুলে আনছেন। তবে অনেক জমির ধান সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেছে।
কলিমপুর গ্রামের কৃষক রতন মিয়া এবার ১০ একর জমিতে বোরো আবাদ করেছিলেন। তাঁর পরিবারের ১১ সদস্যের জীবিকা এই ধানের ওপর নির্ভরশীল ছিল। কিন্তু পানিতে ধান তলিয়ে যাওয়ায় তিনি এক ছটাক ধানও ঘরে তুলতে পারেননি।
তিনি বলেন, ‘ভাই, সংবাদ কইরা কী আর অইব, আমার সর্বনাশ অয়া গেছে। সোনার ধানগুলা পাইক্কা গেছিল। আর চার-পাঁচটা দিন গেলেই কাটতে পারতাম। এহন পরিবার নিয়া কেমনে চলাম?’
একই গ্রামের কৃষক কাবিল মিয়া বলেন, ‘দুই-এক দিন গেলেই কাটতাম। পানির নিচের ধান এহন কেমনে কাটাম? চোখের সামনে সোনার ধান নষ্ট অইয়া যাইতাছে।’
কৃষক হযরত আলী জানান, উজানের পানি নামার কারণে প্রতি বছরই এ অঞ্চলে জলাবদ্ধতা তৈরি হয়। খোয়াই নদী ভরাট হয়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরো জটিল হয়েছে বলে তিনি মনে করেন। আরেক কৃষক নজরুল ইসলাম জানান, তাঁর ৯ একর জমির মধ্যে ৭ একর ইতিমধ্যেই তলিয়ে গেছে।
রমজান আলী নামের আরেক কৃষক জানান, তিনি দেড় লাখ টাকা ঋণ নিয়ে বোরো আবাদ করেছিলেন। ধান বিক্রি করে ঋণ শোধের পরিকল্পনা থাকলেও এখন সব অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, কিশোরগঞ্জে এ বছর ১ লাখ ৬৮ হাজার ২৬২ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে হাওরাঞ্চলে ১ লাখ ৪ হাজার ৫৩৫ হেক্টর জমি রয়েছে। উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১২ লাখ ৯৫ হাজার ২৯ মেট্রিক টন ধান।
উপপরিচালক সাদিকুর রহমান বলেন, পলি জমে নদীর পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় অষ্টগ্রামের হাওরে জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে। ধান ৫ থেকে ৬ দিন পানির নিচে থাকলে ক্ষতি আরো বাড়তে পারে। তিনি জানান, এখন পর্যন্ত প্রায় ৪৮ শতাংশ ধান কাটা সম্পন্ন হয়েছে।
সানা/আপ্র/২৮/৪/২০২৬