ঈদের টানা ছুটি শেষ হয়ে মঙ্গলবার (২৪ মার্চ) সরকারি অফিস খুললেও রাজধানীর মিরপুরের জাতীয় চিড়িয়াখানায় কমেনি মানুষের টান। ঈদের চতুর্থ দিনেও সকাল গড়াতেই সেখানে ভিড় করেছেন রাজধানী ও আশপাশের জেলার হাজারো দর্শনার্থী। বেলা ১১টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত সরেজমিনে দেখা গেছে, পরিবারের সদস্য, আত্মীয়স্বজন ও শিশুসন্তানদের নিয়ে আনন্দভ্রমণে আসা মানুষের উপস্থিতিতে মুখর হয়ে উঠেছে পুরো চিড়িয়াখানা এলাকা।
প্রবেশফটকে ছিল দর্শনার্থীদের চাপ। ভিড় সামাল দিয়ে টিকিট কেটে অনেকেই ঢুকেছেন প্রাণিজগতের বিস্ময় দেখতে। তবে ঈদের দ্বিতীয় ও তৃতীয় দিনের তুলনায় আজ মানুষের চাপ কিছুটা কম। এর একটি বড় কারণ, পবিত্র ঈদুল ফিতরের ছুটি শেষে আজ থেকে সরকারি অফিস-আদালত, ব্যাংক-বিমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান খুলেছে। তবু ছুটির আবহ এখনো কাটেনি; বিনোদনকেন্দ্রগুলোতে রয়ে গেছে ঈদের রেশ।
ময়মনসিংহের গফরগাঁও থেকে মঙ্গলবার ভোরে ঢাকায় আসেন সাব্বির আহমেদ ও মো. আলফাজ। তাদের আরেক বন্ধু রমজান আলী আগে থেকেই ঈদের ছুটিতে ঢাকায় ছিলেন। মাদ্রাসায় পড়ুয়া এই তিন বন্ধু একসঙ্গে জাতীয় চিড়িয়াখানায় ঘুরতে আসেন। জিরাফের খাঁচার সামনে দাঁড়িয়ে সাব্বির আহমেদ বলেন, এর আগে তিনি গাজীপুরের সাফারি পার্ক ও জাতীয় চিড়িয়াখানায় এসেছেন। তাঁর ভাষ্য, সাফারি পার্কে ইচ্ছেমতো ঘোরাঘুরি করা যায় না, কিন্তু জাতীয় চিড়িয়াখানায় নিজের মতো করে ঘোরা যায় বলেই এখানে আসার আগ্রহ বেশি।
অন্যদিকে আলফাজ ও রমজানের জন্য এটি ছিল জাতীয় চিড়িয়াখানায় প্রথম আসা। আলফাজ বলেন, দেশের সবচেয়ে বড় চিড়িয়াখানা হওয়ায় এখানে ঘুরতে আসার আগ্রহ ছিল অনেক দিনের।
ঈদের ছুটি শেষে কর্মব্যস্ততা শুরু হলেও বহু পরিবার এখনো সময় কাটাচ্ছে স্বজনদের সঙ্গে। গাজীপুরের ছোট ব্যবসায়ী জহিরুল ইসলাম জানান, ঈদের পরও তিনি এখনো পুরোপুরি ব্যবসার কাজে ফেরেননি; পরিবারের সদস্যদের সময় দিচ্ছেন। ঈদের দ্বিতীয় দিন পরিবার নিয়ে গাজীপুরের একটি পার্কে ঘুরতে যাওয়ার পর আজ স্ত্রী-সন্তানকে নিয়ে এসেছেন জাতীয় চিড়িয়াখানায়। তাঁর ভাষায়, ছেলের আগ্রহের কারণেই গাজীপুর থেকে আজ মিরপুরে আসা।
স্ত্রী-সন্তান ও আত্মীয়স্বজন মিলিয়ে ছয়জনকে নিয়ে চিড়িয়াখানায় এসেছেন সৈয়দ মিয়া। তিনি বলেন, তারা গাজীপুরে থাকেন। সেখান থেকে গতকাল সোমবার (২৩ মার্চ) রাজধানীর মিরপুরে আত্মীয়ের বাসায় আসেন। এবারের ঈদে অন্য কোনো বিনোদনকেন্দ্রে ঘোরা হয়নি। তাই আজ (মঙ্গলবার) সবাইকে নিয়ে চিড়িয়াখানায় এসেছেন। প্রথমবার জাতীয় চিড়িয়াখানায় এসে তাঁর পাঁচ বছর বয়সী ছেলে আরিফুল ইসলাম সবচেয়ে বেশি পছন্দ করেছে জিরাফ। শিশুটির সহজ ব্যাখ্যা, জিরাফ অনেক বড় বলেই সেটি তার সবচেয়ে ভালো লেগেছে।
সৈয়দ মিয়ার সঙ্গে থাকা সেলিনা আক্তার বলেন, মূলত শিশুদের আনন্দ দেওয়া এবং পশুপাখির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতেই তাঁদের এই ভ্রমণ। আর জহিরুল ইসলামের নয় বছর বয়সী ছেলে তাজরিয়ান ইসলাম জানায়, সে ইতিমধ্যে হরিণ, বাঘ, সিংহসহ অনেক প্রাণী দেখেছে; এখনো আরো অনেক কিছু দেখা বাকি। সব ঘুরে ঘুরে দেখতে চায় সে।
জাতীয় চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষের তথ্য বলছে, ঈদের প্রথম তিন দিনেই সেখানে সাড়ে ৪ লাখের বেশি দর্শনার্থীর আগমন ঘটে। এবার ঈদের দিন প্রায় ৮০ হাজার, দ্বিতীয় দিনে ১ লাখ ৯০ হাজারের বেশি এবং তৃতীয় দিনে প্রায় ১ লাখ ৭০ হাজার দর্শনার্থী চিড়িয়াখানায় আসেন। সেই ধারাবাহিকতাতেই ঈদের চতুর্থ দিনেও সেখানে ছিল উৎসবমুখর জনসমাগম, যদিও অফিস খোলার প্রভাবে চাপ কিছুটা কমেছে।
বর্তমানে জাতীয় চিড়িয়াখানায় বেঙ্গল টাইগার, কালো ভালুক, হায়েনা, হাতি, জলহস্তী, ক্যাঙারু, অজগর, ঘড়িয়াল ও উটপাখিসহ ১৩৭ প্রজাতির ৩ হাজার ৫২৩টি প্রাণী রয়েছে। ফলে ঈদের ছুটির অবসান ঘটলেও শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে বড়দের কাছেও এটি রয়ে গেছে বিনোদন, কৌতূহল ও পারিবারিক সময় কাটানোর অন্যতম প্রধান গন্তব্য।
সানা/আপ্র/২৪/৩/২০২৬