একটি জাতির বিবেককে নাড়িয়ে দেওয়ার জন্য সব সময় যুদ্ধের প্রয়োজন হয় না; কখনো একটি দুর্ঘটনাই রাষ্ট্র, সমাজ ও প্রশাসনের সক্ষমতাকে কঠিন প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দেয়। উত্তরার মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে প্রশিক্ষণ বিমান বিধ্বস্তের মর্মান্তিক ঘটনা তেমনই এক জাতীয় ট্র্যাজেডি। এক বছরে ক্যালেন্ডারের পাতা বদলেছে, কিন্তু বদলায়নি অসংখ্য স্বজনহারা পরিবারের অপেক্ষা, আহতদের দীর্ঘ চিকিৎসাযন্ত্রণা কিংবা জাতির উত্তরহীন প্রশ্ন। যেসব শিশুর প্রাণহীন দেহ বইখাতা আর শ্রেণিকক্ষের স্মৃতির সঙ্গে মিশে গেছে, তাদের হারানোর বেদনা কোনো পরিসংখ্যান দিয়ে মাপা যায় না। এই শোক কেবল কয়েকটি পরিবারের নয়; এটি পুরো রাষ্ট্রের নৈতিক দায়ের প্রতীক।
এক বছর পরও যখন তদন্ত প্রতিবেদন জনসমক্ষে প্রকাশিত হয় না, তখন প্রশ্ন জাগে-রাষ্ট্র কী সত্য উদ্ঘাটনে যথেষ্ট আন্তরিক? একটি দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ, দায় কার, কোথায় ত্রুটি ছিল এবং ভবিষ্যতে তা ঠেকাতে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে-এসব জানার অধিকার শুধু ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের নয়, প্রতিটি নাগরিকের। কারণ একটি দুর্ঘটনা গোপনীয়তার বিষয় হতে পারে, কিন্তু জননিরাপত্তা কখনোই গোপন রাখার বিষয় নয়। সত্য আড়াল করলে দায় মুছে যায় না; বরং অবিশ্বাস আরো গভীর হয়।
এই ঘটনার পর ক্ষতিপূরণের ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু অনেক পরিবার তা গ্রহণ করেননি। এর মধ্যেই লুকিয়ে আছে গভীর এক বার্তা। তারা অর্থের বিনিময়ে সন্তানের জীবনকে মূল্যায়ন করতে চাননি; তারা চেয়েছেন রাষ্ট্র তাদের বেদনার প্রতি সম্মান দেখাক, দায় স্বীকার করুক এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করুক। গুরুতর আহত শিশুদের দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা, পুনর্বাসন, মানসিক পরিচর্যা ও শিক্ষাজীবন পুনর্গঠনের দায়িত্বও রাষ্ট্র এড়িয়ে যেতে পারে না। একটি মানবিক রাষ্ট্রের দায়িত্ব দুর্ঘটনার দিনেই শেষ হয়ে যায় না; বরং সেদিন থেকেই প্রকৃত দায়িত্বের শুরু।
এই দুর্ঘটনা আমাদের নিরাপত্তা-ব্যবস্থার মৌলিক দুর্বলতাও সামনে এনেছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল এবং ঘনবসতিপূর্ণ এলাকার আকাশপথে ঝুঁকিপূর্ণ কার্যক্রম পরিচালনা নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় বহু আগেই এসেছে। দুর্ঘটনার পর প্রশিক্ষণ উড্ডয়ন অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত ইতিবাচক হলেও সেটি যেন সাময়িক প্রশাসনিক ব্যবস্থা হয়ে না থাকে। প্রয়োজন সুস্পষ্ট রাষ্ট্রীয় নীতি, কঠোর নিরাপত্তা মানদণ্ড এবং এমন একটি কাঠামো, যেখানে মানুষের জীবন সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পাবে। কোনো প্রশিক্ষণ, কোনো প্রাতিষ্ঠানিক প্রয়োজন কিংবা কোনো প্রশাসনিক সুবিধাই শিশুদের জীবনের চেয়ে বড় হতে পারে না।
মাইলস্টোনের এই ট্র্যাজেডি আমাদের আরেকটি শিক্ষা দেয়-দুর্ঘটনার পর আবেগঘন প্রতিশ্রুতি দেওয়া সহজ, কিন্তু সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নই রাষ্ট্রের প্রকৃত পরীক্ষা। তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ, দায় নির্ধারণ, প্রয়োজনীয় আইন ও নীতির সংস্কার, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর ন্যায়সংগত পুনর্বাসন এবং দীর্ঘমেয়াদি সহায়তা-এসবই হতে হবে রাষ্ট্রের অবিলম্বে বাস্তবায়নযোগ্য অঙ্গীকার। একই সঙ্গে এই ঘটনার স্মৃতি এমনভাবে সংরক্ষণ করা প্রয়োজন, যাতে ভবিষ্যতের নীতিনির্ধারকেরা প্রতিনিয়ত স্মরণ করেন-একটি অবহেলা কত শত স্বপ্নকে মুহূর্তেই ধ্বংস করে দিতে পারে।
মাইলস্টোনের শ্রেণিকক্ষে যে জীবনগুলো নিভে গেছে, তারা আর ফিরে আসবে না। কিন্তু রাষ্ট্র চাইলে তাদের অকালপ্রয়াণকে অর্থবহ করতে পারে। সেটি সম্ভব হবে কেবল সত্য প্রকাশের সাহস দেখিয়ে, জবাবদিহি নিশ্চিত করে, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর প্রতি ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করে এবং এমন এক নিরাপত্তা-ব্যবস্থা গড়ে তুলে, যেখানে ভবিষ্যতে আর কোনো শিশু বিদ্যালয়ে গিয়ে মৃত্যুর মুখে পতিত হবে না।
এই ট্র্যাজেডি ইতিহাসের একটি বেদনাময় অধ্যায় হয়ে থাকবে। কিন্তু রাষ্ট্রের দায়িত্ব এটিকে কেবল শোকের স্মৃতি হিসেবে রেখে দেওয়া নয়; বরং এটিকে নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ার এক কঠিন শিক্ষা হিসেবে গ্রহণ করা। কারণ একটি সভ্য রাষ্ট্রের প্রকৃত পরিচয় প্রকাশ পায় তার শোকপালনে নয়, বরং সেই শোকের পুনরাবৃত্তি রোধে তার দৃঢ়, স্বচ্ছ ও দায়িত্বশীল পদক্ষেপে।
সানা/আপ্র/২২/৭/২০২৬