প্রাথমিক বিদ্যালয় গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্টের জাতীয় পর্যায়ের চূড়ান্ত খেলা ও পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যে বক্তব্য দিয়েছেন, তা কেবল একটি ক্রীড়া প্রতিযোগিতাকে ঘিরে আনুষ্ঠানিক শুভেচ্ছা নয়; বরং ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ নির্মাণের একটি সুদূরপ্রসারী রাষ্ট্রীয় দর্শনের প্রতিফলন। শক্তিশালী বাংলাদেশ গঠনে নতুন প্রজন্মকে প্রস্তুত করার যে আহ্বান তিনি জানিয়েছেন, তার কেন্দ্রে রয়েছে শিক্ষা, ক্রীড়া ও সংস্কৃতির সমন্বিত বিকাশ।
দেশের ৬৫ হাজারেরও বেশি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রায় ২২ লাখ শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণে আয়োজিত এই প্রতিযোগিতা নিঃসন্দেহে এক বিরল জাতীয় উদ্যোগ। কিন্তু এর তাৎপর্য কেবল মাঠের জয়-পরাজয়ে সীমাবদ্ধ নয়। প্রকৃত অর্থে এটি শিশুদের মধ্যে শৃঙ্খলা, সহমর্মিতা, নেতৃত্ব, আত্মবিশ্বাস এবং দলগত চেতনা গড়ে তোলার একটি বৃহৎ সামাজিক কর্মসূচি। একটি জাতির ভবিষ্যৎ নাগরিকদের চরিত্র গঠনের জন্য এর চেয়ে কার্যকর মাধ্যম খুব কমই আছে।
আজকের বাংলাদেশের একটি বড় সামাজিক বাস্তবতা হলো নতুন প্রজন্মের মধ্যে স্বাভাবিক সামাজিক সম্পর্ক ও মানবিক বন্ধনের ক্রমাবনতি। একসময় শিশুরা বিদ্যালয়ে একসঙ্গে পড়াশোনা করত, মাঠে খেলত, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নিত এবং পারস্পরিক মেলামেশার মধ্য দিয়ে বেড়ে উঠত। শৈশব, কৈশোর ও তারুণ্যের সেই সম্মিলিত অভিজ্ঞতা তাদের মধ্যে সহনশীলতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ এবং সামাজিক দায়িত্ববোধ তৈরি করত। কিন্তু প্রযুক্তিনির্ভর বর্তমান সময়ে সেই স্বাভাবিক সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়া অনেকাংশে দুর্বল হয়ে পড়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অতিমাত্রায় নিমগ্নতা নতুন প্রজন্মের একটি বড় অংশকে বাস্তব জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলছে। এর ফলে শারীরিক সক্ষমতা যেমন কমছে, তেমনি মানসিক বিকাশও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। উদ্বেগের বিষয় হলো, সমাজে কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার, সহিংসতা, অসহিষ্ণুতা এবং গণপিটুনির মতো নৃশংস প্রবণতার পেছনে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতার নেতিবাচক প্রভাব অস্বীকার করার সুযোগ নেই। ক্রীড়া ও সংস্কৃতিচর্চা থেকে দূরে সরে যাওয়া একটি প্রজন্মের মধ্যে মানবিক মূল্যবোধের ঘাটতি তৈরি করে, যা পরবর্তী সময়ে সামাজিক অস্থিরতার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
এ কারণেই খেলাধুলা ও সংস্কৃতিচর্চাকে আর অতিরিক্ত বা ঐচ্ছিক কার্যক্রম হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এগুলোকে শিক্ষাব্যবস্থার অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত করতে হবে। প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকেই ক্রীড়া, সংগীত, চিত্রকলা, আবৃত্তি, বিতর্কসহ বিভিন্ন সৃজনশীল কার্যক্রমকে নিয়মিত ও বাধ্যতামূলক অনুশীলনের আওতায় আনা প্রয়োজন। শিশুদের বইয়ের জ্ঞান যেমন প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন মাঠের শিক্ষা, শিল্প-সংস্কৃতির শিক্ষা এবং সামাজিক সহাবস্থানের শিক্ষা।
প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণায় প্রাথমিকের পাশাপাশি মাধ্যমিক পর্যায়েও এ ধরনের প্রতিযোগিতা সম্প্রসারণের যে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে, তা নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক। এখন প্রয়োজন এই উদ্যোগকে আরো প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া এবং দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় নীতির অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা। ক্রীড়া ও সংস্কৃতির বিকাশ যেন কোনো সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি, গোষ্ঠীগত চাপ বা সাময়িক প্রতিবন্ধকতার কাছে থেমে না যায়। রাষ্ট্রকে এই খাতগুলোকে জাতীয় উন্নয়ন ও সামাজিক স্থিতিশীলতার অন্যতম ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
একটি শক্তিশালী বাংলাদেশ কেবল অবকাঠামো, অর্থনীতি বা প্রযুক্তির ওপর দাঁড়িয়ে গড়ে উঠবে না; এটি গড়ে উঠবে আত্মবিশ্বাসী, মানবিক, সৃজনশীল ও সুস্থ প্রজন্মের হাত ধরে। আর সেই প্রজন্ম তৈরির সবচেয়ে কার্যকর পথ হলো শিক্ষা, ক্রীড়া ও সংস্কৃতির সমন্বিত বিকাশ। আজকের উদ্যোগগুলো তাই ভবিষ্যতের বাংলাদেশের ভিত্তিপ্রস্তর বলেই বিবেচিত হওয়া উচিত।
সানা/আপ্র/২২/৬/২০২৬