বাংলাদেশে হামের সাম্প্রতিক ভয়াবহ বিস্তার এখন শুধু একটি সংক্রামক রোগের সংকট নয়; এটি রাষ্ট্রীয় জবাবদিহি, জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং নাগরিক অধিকারের প্রশ্নকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে। বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি ও আন্তর্জাতিক রেড ক্রস ও রেড ক্রিসেন্ট ফেডারেশনের যৌথ জরিপে উঠে এসেছে এক নির্মম বাস্তবতা-হামের চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে গিয়ে ৮৯ শতাংশ পরিবার ঋণগ্রস্ত হয়েছে, ৬১ শতাংশ পরিবার নিজেদের সঞ্চয় ভেঙে ফেলেছে, কেউ কেউ সম্পদ বিক্রি করতেও বাধ্য হয়েছে। অর্থাৎ এই মহামারি শুধু শিশুর প্রাণ কেড়ে নিচ্ছে না; হাজার হাজার পরিবারকে অর্থনৈতিকভাবে নিঃস্ব করে দিচ্ছে। এমন এক প্রেক্ষাপটে প্রশ্নটি আরো তীব্র হয়ে ওঠে-যে রোগ বহু বছর নিয়ন্ত্রণে ছিল, সেটি আবার এত ভয়াবহভাবে কেন ছড়িয়ে পড়ল?
দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশে হাম নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি আন্তর্জাতিকভাবে সফল উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে জনপরিসরে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে যে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে টিকা ক্রয় ও টিকাদান কার্যক্রমে স্থবিরতা বা ব্যাঘাত ঘটেছিল, যার ফলেই হামের সংক্রমণ ভয়াবহ আকার ধারণ করে। এই অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণের দায়িত্ব অবশ্যই আদালতের নয়; সেটি নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রমাণনির্ভর অনুসন্ধানের বিষয়। কিন্তু যখন এই অভিযোগকে কেন্দ্র করে সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয় এবং আদালত তা গ্রহণ না করে খারিজ করে দেয়, তখন একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই সামনে আসে-জনস্বাস্থ্য ও নাগরিক জীবনের এমন গুরুতর প্রশ্নে বিচারিক অনুসন্ধানের পথ কেন রুদ্ধ হলো?
এখানে মূল প্রশ্ন কোনো ব্যক্তি বা সরকারের রাজনৈতিক দায় নির্ধারণ নয়; মূল প্রশ্ন হলো জবাবদিহির সুযোগ সৃষ্টি করা। যদি সত্যিই কোনো সরকারের সিদ্ধান্ত, অবহেলা বা নীতিগত ব্যর্থতার কারণে টিকাদান কর্মসূচি ব্যাহত হয়ে থাকে এবং তার ফলস্বরূপ সংক্রামক রোগের বিস্তার ও ব্যাপক প্রাণহানি ঘটে থাকে, তবে তা নিছক প্রশাসনিক ত্রুটি নয়; এটি মানবজীবনের নিরাপত্তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এক ভয়াবহ রাষ্ট্রিক ব্যর্থতা। এমন অভিযোগকে গুরুত্বের সঙ্গে পরীক্ষা করার প্রয়োজন আছে কি না-এই প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়া যায় না।
বাংলাদেশের সংবিধান নাগরিকের জীবন ও স্বাস্থ্য সুরক্ষার দায়িত্ব রাষ্ট্রের ওপর অর্পণ করেছে। চিকিৎসা কোনো দয়া বা অনুগ্রহ নয়; এটি মানুষের মৌলিক অধিকার। সেই অধিকার নিশ্চিত করার দায়িত্ব সরকারের, আর সেই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার অভিযোগ উঠলে নাগরিকের আইনের আশ্রয় নেওয়ার অধিকারও সমানভাবে মৌলিক। কাজেই আদালতে মামলা গ্রহণ না করার সিদ্ধান্ত নিয়ে জনমনে যে প্রশ্ন ও বেদনা তৈরি হয়েছে, তাকে অবজ্ঞা করা রাষ্ট্রের জন্য শুভ সংকেত নয়।
তবে এই সংবেদনশীল বিষয়ে আমাদের সতর্কও থাকতে হবে। অভিযোগকে প্রমাণ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা যেমন অনুচিত, তেমনি অভিযোগের নিরপেক্ষ অনুসন্ধানের প্রয়োজনীয়তাকে অস্বীকার করাও সমান বিপজ্জনক। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে জবাবদিহির সবচেয়ে শক্তিশালী পথ হলো স্বচ্ছ তদন্ত, তথ্য প্রকাশ এবং স্বাধীন বিশেষজ্ঞদের মূল্যায়ন। আদালত মামলা গ্রহণ না করলেও সরকার চাইলে একটি উচ্চপর্যায়ের স্বাধীন তদন্ত কমিশন গঠন করে টিকা সরবরাহ, ক্রয়, বিতরণ ও কর্মসূচির ধারাবাহিকতা নিয়ে পূর্ণাঙ্গ সত্য উদ্ঘাটনের উদ্যোগ নিতে পারে। সেটিই জনআস্থা পুনর্গঠনের সর্বোত্তম পথ।
আজ সবচেয়ে জরুরি হলো ভবিষ্যতের জন্য শিক্ষা গ্রহণ করা। টিকাদান কর্মসূচি কখনোই রাজনৈতিক পরিবর্তন, প্রশাসনিক অস্থিরতা বা নীতিগত দ্বিধার শিকার হতে পারে না। একটি শিশুর জীবন রাষ্ট্রের সব রাজনৈতিক বিবেচনার ঊর্ধ্বে। যে সমাজ তার শিশুদের প্রতিরোধযোগ্য রোগে হারায়, সে সমাজের উন্নয়ন ও অগ্রগতির সব দাবি প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে।
হামের এই ভয়াবহতা আমাদের মনে করিয়ে দিক-রাষ্ট্রের প্রথম দায়িত্ব মানুষের জীবন রক্ষা, দ্বিতীয় দায়িত্ব সেই জীবন রক্ষায় ব্যর্থতার প্রতিটি অভিযোগের জবাব দেওয়া। আদালতের সিদ্ধান্ত হয়তো চূড়ান্ত আইনি অবস্থান নির্ধারণ করেছে, কিন্তু জনস্বাস্থ্য ও জনজীবনের প্রশ্নে যে নৈতিক প্রশ্নগুলো উঠে এসেছে, সেগুলোর উত্তর ইতিহাস একদিন অবশ্যই চাইবে। সরকার ও নীতিনির্ধারকদের সেই উত্তরের জন্য এখন থেকেই প্রস্তুত থাকতে হবে।
সানা/আপ্র/৬/৮/২০২৬