গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
মঙ্গলবার, ০৪ আগস্ট ২০২৬

মেনু

রাজধানী যখন আতঙ্কের প্রতীক, নিরাপত্তা সংস্কারে আর বিলম্ব নয়

সুখদেব কুমার সানা

সুখদেব কুমার সানা

প্রকাশিত: ১৩:৩৯ পিএম, ০৪ আগস্ট ২০২৬ | আপডেট: ১৫:০০ এএম ২০২৬
রাজধানী যখন আতঙ্কের প্রতীক, নিরাপত্তা সংস্কারে আর বিলম্ব নয়
ছবি

ফাইল ছবি

ঢাকা বাংলাদেশের প্রশাসনিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কেন্দ্র। এই শহরের নিরাপত্তা পরিস্থিতি শুধু রাজধানীবাসীর জীবনযাত্রাকেই প্রভাবিত করে না, বরং রাষ্ট্রের সামগ্রিক সুশাসন, বিনিয়োগ পরিবেশ এবং আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তির ওপরও সরাসরি প্রভাব ফেলে। সাম্প্রতিক সময়ে বৈশ্বিক তথ্যভিত্তিক প্রতিষ্ঠান নাম্বিওর অপরাধ ও নিরাপত্তা সূচকে দক্ষিণ এশিয়ার প্রধান শহরগুলোর মধ্যে ঢাকাকে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ শহর হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। অপরাধ সূচক ৬২ দশমিক ২ এবং নিরাপত্তা সূচক মাত্র ৩৭ দশমিক ৮-এই পরিসংখ্যান নিছক আন্তর্জাতিক র‌্যাংকিং নয়; এটি নাগরিক আস্থার গভীর সংকটের প্রতিফলন।

বাস্তব পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ছিনতাই, চুরি, মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেওয়া, কিশোর গ্যাংয়ের সহিংসতা, মাদকসংক্রান্ত অপরাধ এবং সড়কে নারীদের হয়রানির ঘটনা নিয়মিত সংবাদ শিরোনাম হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে বিপুলসংখ্যক অপরাধী গ্রেফতারের তথ্য প্রকাশ পেলেও নাগরিকের নিরাপত্তাবোধে কাঙিক্ষত পরিবর্তন দৃশ্যমান নয়। এর অর্থ, সমস্যাটি কেবল অপরাধী শনাক্তকরণে সীমাবদ্ধ নয়; বরং অপরাধ প্রতিরোধ, নজরদারি, বিচার এবং নগর ব্যবস্থাপনার সামগ্রিক দুর্বলতার সঙ্গে সম্পর্কিত।

ঢাকার অপরাধপ্রবণতা বৃদ্ধির পেছনে কয়েকটি কাঠামোগত কারণ স্পষ্ট। প্রথমত, অপরিকল্পিত নগরায়ণ। বিপুল জনসংখ্যার চাপ, বস্তি ও অনানুষ্ঠানিক আবাসনের বিস্তার এবং পর্যাপ্ত জনপরিসরের অভাব অপরাধের অনুকূল পরিবেশ তৈরি করেছে। দ্বিতীয়ত, বেকারত্ব ও সামাজিক বৈষম্য। তরুণ জনগোষ্ঠীর একটি অংশ কর্মসংস্থান ও সামাজিক অন্তর্ভুক্তির সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়ে অপরাধচক্রের সহজ শিকারে পরিণত হচ্ছে। তৃতীয়ত, মাদক অর্থনীতি ও স্থানীয় সন্ত্রাসী নেটওয়ার্কের প্রভাব। এসব চক্র অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা, দুর্বল স্থানীয় প্রশাসন বা তদন্তের সীমাবদ্ধতার সুযোগ নেয়।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা। অপরাধ সংঘটনের পর দ্রুত তদন্ত ও বিচার না হলে অপরাধীদের মধ্যে দায়মুক্তির সংস্কৃতি গড়ে ওঠে। নাগরিক যখন দেখে অভিযোগ করেও কার্যকর প্রতিকার মিলছে না, তখন আইন ও রাষ্ট্রের প্রতি তার আস্থা ক্ষয় হতে থাকে। নিরাপত্তাহীনতার সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক এখানেই-এটি ধীরে ধীরে সামাজিক আস্থার ভিত্তিকে দুর্বল করে দেয়।

এখন প্রয়োজন প্রতিক্রিয়াশীল নয়, প্রতিরোধমূলক নিরাপত্তা সংস্কার। রাজধানীর প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, বাসস্ট্যান্ড, বাজার, পার্ক ও আবাসিক এলাকায় সমন্বিত প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। থানা পুলিশের সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি তথ্য বিশ্লেষণভিত্তিক টহল ব্যবস্থা চালু করা জরুরি। গণপরিবহন নিরাপত্তাকে আলাদা নীতিগত অগ্রাধিকার দিতে হবে। একই সঙ্গে স্থানীয় সরকার, কমিউনিটি প্রতিনিধি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও নাগরিক সমাজকে সম্পৃক্ত করে অংশগ্রহণমূলক নগর নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে তোলা প্রয়োজন।

তবে প্রযুক্তি বা অভিযানই শেষ কথা নয়। রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রশাসনিক জবাবদিহি এবং আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ ছাড়া কোনো নিরাপত্তা সংস্কার টেকসই হবে না। রাজধানীকে নিরাপদ করা বিলাসিতা নয়; এটি সাংবিধানিক দায়িত্ব এবং জাতীয় উন্নয়নের পূর্বশর্ত।

ঢাকাকে যদি আমরা সত্যিই একটি আধুনিক, মানবিক ও বিনিয়োগবান্ধব মহানগর হিসেবে দেখতে চাই, তবে এখনই সমন্বিত নিরাপত্তা সংস্কার শুরু করতে হবে। কারণ যে রাজধানী নাগরিককে ভয়মুক্ত চলাচলের নিশ্চয়তা দিতে পারে না, সে রাজধানী উন্নয়নের উজ্জ্বল প্রতীক হতে পারে না। এখন আর বিলম্বের সুযোগ নেই; প্রয়োজন দৃঢ় রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত, কার্যকর বাস্তবায়ন এবং নাগরিক আস্থা পুনর্গঠনের সাহসী উদ্যোগ।
সানা/আপ্র/৪/৮/২০২৬

 

সংশ্লিষ্ট খবর

জ্বালানি নিরাপত্তাহীনতার বিপজ্জনক অশনিসংকেত
০৩ আগস্ট ২০২৬

জ্বালানি নিরাপত্তাহীনতার বিপজ্জনক অশনিসংকেত

রাজধানীর রান্নাঘরে চুলা জ্বলছে না, শিল্পাঞ্চলে উৎপাদন ব্যাহত, সিএনজি স্টেশনে রাতভর অপেক্ষা, আর বিদ্য...

বাংলাদেশ কারও দয়া নয়, সবার সমঅধিকার
০২ আগস্ট ২০২৬

বাংলাদেশ কারও দয়া নয়, সবার সমঅধিকার

রাজধানীর কাকরাইলে সম্মিলিত সনাতন পরিষদ আয়োজিত ‘সংখ্যালঘুদের সুরক্ষা ও নিরাপত্তা বিধান’ শীর্ষক মতবিনি...

আস্থার সংকট কাটাতে কওমি শিক্ষায় স্বচ্ছতার বিকল্প নেই
০১ আগস্ট ২০২৬

আস্থার সংকট কাটাতে কওমি শিক্ষায় স্বচ্ছতার বিকল্প নেই

শিক্ষা কোনো জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণের প্রধান ভিত্তি। আর যে শিক্ষা মানুষের নৈতিকতা, মূল্যবোধ ও মানবিকতা...

মানবপাচার রোধে আইন প্রয়োগ দ্রুত নিশ্চিত প্রয়োজন
৩০ জুলাই ২০২৬

মানবপাচার রোধে আইন প্রয়োগ দ্রুত নিশ্চিত প্রয়োজন

একবিংশ শতাব্দীতেও মানবপাচারের মতো ঘৃণ্য অপরাধ মানবসভ্যতার কপালে এক কলঙ্কের তিলক হয়ে বিঁধে আছে। এটি ক...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

বেনজীরকে ফেরাতে দুবাইয়ে আইনি লড়াই শুরু সরকারের

দুবাইয়ে শর্তসাপেক্ষে জামিনে মুক্ত সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদকে দেশে ফিরিয়ে আনতে আইনি প্রক্রিয়া জোরদার করেছে সরকার। তার জামিন আদেশ বাতিলের উদ্যোগ হিসেবে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে একটি আইনজীবী প্রতিষ্ঠান নিয়োগ করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। প্রিয় পাঠক, আপনি কি মনে করেন- বেনজীর আহমেদকে দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে?

মোট ভোট: ১ | শেষ আপডেট: 1 দিন আগে