রাজধানীর কাকরাইলে সম্মিলিত সনাতন পরিষদ আয়োজিত ‘সংখ্যালঘুদের সুরক্ষা ও নিরাপত্তা বিধান’ শীর্ষক মতবিনিময় সভা ও প্রতিনিধি সম্মেলনে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর যে বক্তব্য দিয়েছেন, তা নিছক একটি রাজনৈতিক ভাষণ নয়; এটি বাংলাদেশের রাষ্ট্রচিন্তা, গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও সামাজিক সহাবস্থানের প্রশ্নে একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত বার্তা। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের ‘নিজেকে ছোট ভাববেন না’ এবং ‘এটা আমার অধিকার’ বলে দৃঢ়ভাবে দাঁড়ানোর আহ্বান আমাদের জাতীয় বাস্তবতায় গভীর তাৎপর্য বহন করে।
বাংলাদেশের সংবিধান কোনো নাগরিককে করুণার ভিত্তিতে অধিকার দেয় না; দেয় জন্মগত সমমর্যাদা। হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান, আদিবাসী-সবাই এই রাষ্ট্রের সমান অংশীদার। তাই কোনো সম্প্রদায়কে নিরাপত্তা, সম্পত্তি, ধর্মীয় স্বাধীনতা বা মর্যাদা রক্ষার প্রশ্নে ‘বিশেষ সুবিধাভোগী’ হিসেবে নয়, পূর্ণ অধিকারসম্পন্ন নাগরিক হিসেবে দেখতে হবে। রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো এই অধিকার বাস্তবে নিশ্চিত করা।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর তাঁর বক্তব্যে বাংলাদেশকে সব ধর্মের মানুষের সম্মিলিত আবাসভূমি হিসেবে উল্লেখ করেছেন এবং ধর্মের নামে বিভাজনের বিরুদ্ধে সতর্ক করেছেন। এই অবস্থান সময়োপযোগী। কারণ সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ কখনো কোনো জাতিকে শক্তিশালী করেনি; বরং রাষ্ট্রের ভেতরে অবিশ্বাস, ভয় ও সামাজিক দূরত্ব তৈরি করেছে। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস আমাদের শেখায়-ধর্মীয় পরিচয় নয়, মানুষের স্বাধীনতার আকাঙক্ষই ছিল জাতীয় ঐক্যের ভিত্তি।
তবে বাস্তবতা হলো, সময় সময় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা, মন্দির ভাঙচুর, সম্পত্তি দখল, সামাজিক ভয়ভীতি এবং ধর্মীয় উসকানির ঘটনা আমাদের বিবেককে নাড়া দেয়। এই প্রেক্ষাপটে শুধু শুভেচ্ছা বিনিময়, উৎসবে উপস্থিতি বা প্রতীকী সংহতি যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন দ্রুত বিচার, নিরপেক্ষ তদন্ত, ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন এবং প্রশাসনিক জবাবদিহি নিশ্চিত করা। আইনের শাসন দৃশ্যমান না হলে নিরাপত্তার অনুভূতিও স্থায়ী হয় না।
মন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে গণতন্ত্র দুর্বল হলে মানুষের পারস্পরিক ও ধর্মীয় অধিকারও দুর্বল হয়ে পড়ে বলে যে আক্ষেপ প্রকাশ করেছেন, সেটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রকৃতপক্ষে শক্তিশালী গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান, স্বাধীন বিচারব্যবস্থা, জবাবদিহিমূলক প্রশাসন এবং রাজনৈতিক সহনশীলতা ছাড়া কোনো বহুত্ববাদী রাষ্ট্র দীর্ঘস্থায়ী স্থিতি অর্জন করতে পারে না। ধর্মীয় সম্প্রীতির প্রশ্নকে তাই গণতান্ত্রিক সংস্কার থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখার সুযোগ নেই।
তিনি যে ‘রঙধনু রাষ্ট্র’-এর কথা বলেছেন-অর্থাৎ সব ধর্ম, মত ও সম্প্রদায়ের সমমর্যাদার বাংলাদেশ-সেটি কেবল একটি রাজনৈতিক স্লোগান হয়ে থাকলে চলবে না। এর বাস্তব রূপ হতে হবে শিক্ষা, প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা, স্থানীয় সরকার ও জাতীয় প্রতিনিধিত্বে। সংরক্ষিত নারী আসনে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদের মনোনয়ন দেওয়ার বিষয়টি ইতিবাচক পদক্ষেপ হলেও তা হতে হবে আরো বিস্তৃত ও কার্যকর অংশগ্রহণের সূচনা।
আজকের বাংলাদেশে সবচেয়ে জরুরি বার্তা হলো-কোনো নাগরিক যেন নিজের ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে ভয়, সংকোচ বা অনিশ্চয়তায় না ভোগেন। রাষ্ট্রের শক্তি সংখ্যাগরিষ্ঠতার অহংকারে নয়; দুর্বলতম নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সক্ষমতায়। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের কাকরাইলের বক্তব্য সেই মৌলিক সত্যটিকেই নতুন করে সামনে এনেছে।
আমরা এমন বাংলাদেশ চাই, যেখানে অধিকার চাইতে কাউকে মাথা নত করতে হবে না; যেখানে সনাতন ধর্মাবলম্বী হোক বা অন্য যে কোনো সম্প্রদায়ের মানুষ নির্ভয়ে বলতে পারবেন-এই দেশ আমার, এই রাষ্ট্র আমার, এই অধিকারও আমার। কারণ বাংলাদেশ কারও দয়া নয়; এটি সবার সমঅধিকার, সমমর্যাদা ও সমান নিরাপত্তার মানবিক অঙ্গীকার।
সানা/আপ্র/০২/৮/২০২৬