গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

মেনু

জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধিতে বাসের ভাড়া বাড়লো, নৈরাজ্য যেন না বাড়ে

সুখদেব কুমার সানা

সুখদেব কুমার সানা

প্রকাশিত: ১৬:০২ পিএম, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | আপডেট: ১৬:৪২ এএম ২০২৬
জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধিতে বাসের ভাড়া বাড়লো, নৈরাজ্য যেন না বাড়ে
ছবি

ফাইল ছবি

জ্বালানি তেলের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা বাড়ানো হয়েছে। সরকারের যুক্তি, আন্তর্জাতিক বাজারে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি এবং পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির কারণে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনকে বিপুল লোকসান গুনতে হয়েছে। মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত লোকসানের পরিমাণ প্রায় ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা বাস্তব, রাষ্ট্রীয় সংস্থার লোকসানও বাস্তব। কিন্তু সেই বাস্তবতার সুযোগ নিয়ে পরিবহন খাতে ইচ্ছেমতো ভাড়া বাড়ানোর নৈরাজ্য কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

এখানে প্রথমেই একটি বিষয় স্পষ্ট করা জরুরি-জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়েছে বলে সব বাসের ভাড়া বাড়ানোর সুযোগ নেই। সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বাড়তি ভাড়া শুধু ডিজেলচালিত সাধারণ বাসের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। গ্যাসচালিত বাসের ভাড়া বাড়ানো হয়নি। অথচ ঢাকার গণপরিবহনের বড় একটি অংশ গ্যাসচালিত। ফলে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির অজুহাতে ঢাকার গ্যাসচালিত বাসেও বাড়তি ভাড়া আদায় শুরু হলে সেটি হবে সরাসরি অনিয়ম। সরকারকে এ বিষয়টি আগেই পরিষ্কার করে দিতে হবে এবং মাঠপর্যায়ে কঠোরভাবে তা নিশ্চিত করতে হবে।

ডিজেলচালিত বাসের ক্ষেত্রেও বাড়তি ভাড়া যতটুকু নির্ধারিত হয়েছে, তার বেশি আদায়ের কোনো সুযোগ নেই। কিলোমিটারপ্রতি ভাড়া ১৭ পয়সা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। ঢাকার বড় বাসের ভাড়া ২ টাকা ৫৩ পয়সা থেকে ২ টাকা ৭০ পয়সা এবং মিনিবাসের ভাড়া ২ টাকা ৪২ পয়সা থেকে ২ টাকা ৫৯ পয়সা হবে। দূরপাল্লার বাসে ২ টাকা ২৩ পয়সা থেকে ২ টাকা ৪০ পয়সা হবে। অর্থাৎ ২৫০ কিলোমিটারের একটি দূরপাল্লার পথে বাড়তি ভাড়া প্রায় ৪২ টাকা ৫০ পয়সা। ৬০০ টাকার ভাড়া হলে তা আনুমানিক ৬৪৩ টাকার কাছাকাছি হওয়ার কথা, টোলের হিসাব আলাদা। সেখানে কোনো বাস যদি ৬৫০, ৭০০ কিংবা তারও বেশি দাবি করে, তার যৌক্তিকতা অবশ্যই যাচাই করতে হবে।

রাজধানীর স্বল্পদূরত্বের যাত্রায় নৈরাজ্যের আশঙ্কা আরো বেশি। কিলোমিটারপ্রতি ১৭ পয়সা বৃদ্ধির অর্থ চার কিলোমিটারে বাড়তি মাত্র ৬৮ পয়সা। কোনো তিন-চার কিলোমিটারের যাত্রার ভাড়া যদি ১০ টাকা হয়ে থাকে, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির অজুহাতে সেটি ১৫ টাকা করে দেওয়ার কোনো যৌক্তিকতা নেই। অথচ বাস্তবে নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে বেশি আদায়ের অভিযোগ নতুন নয়। এই জায়গাতেই সরকারকে সবচেয়ে কঠোর হতে হবে।


প্রতিটি রুটের পুরোনো ও নতুন ভাড়া, দূরত্ব এবং প্রযোজ্য টোলের পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশ করতে হবে। প্রতিটি বাসে তা দৃশ্যমানভাবে প্রদর্শন বাধ্যতামূলক করতে হবে। কোন বাস ডিজেলচালিত এবং কোনটি গ্যাসচালিত, সেটিও যাত্রীর কাছে স্পষ্ট থাকতে হবে। গ্যাসচালিত বাসে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির অজুহাতে বাড়তি ভাড়া আদায়ের সুযোগ কোনোভাবেই রাখা যাবে না।

শুধু প্রজ্ঞাপন জারি করে দায়িত্ব শেষ করলে চলবে না। নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে এক টাকা বেশি আদায়ও যেন শাস্তিযোগ্য অনিয়ম হিসেবে বিবেচিত হয়। অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা, পুনরাবৃত্তিতে রুট পারমিট স্থগিত এবং গুরুতর অনিয়মে অনুমোদন বাতিলের মতো কার্যকর বিধান প্রয়োগ করতে হবে। যাত্রীদের সহজে অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা এবং অভিযোগের দ্রুত নিষ্পত্তিও নিশ্চিত করতে হবে।

কারণ পরিবহন খাতে সবচেয়ে বড় সমস্যা শুধু ভাড়া বৃদ্ধি নয়; ভাড়া নির্ধারণের পর সেটি কার্যকর না হওয়া। জ্বালানির দাম বাড়লে ভাড়া বাড়ে, কিন্তু জ্বালানির দাম কমলে ভাড়া কমে না-এমন একতরফা ব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরে জনভোগান্তি বাড়িয়েছে। এবার একটি স্বচ্ছ ও বাধ্যতামূলক সমন্বয় পদ্ধতি প্রয়োজন।

জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির অভিঘাত শুধু বাসযাত্রায় সীমাবদ্ধ থাকবে না। পণ্য পরিবহন, কৃষির সেচ, শিল্প উৎপাদন ও বাজারদরে এর প্রভাব পড়বে। ফলে মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে পরিবহন খাতে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের সুযোগ তৈরি হলে সাধারণ মানুষের ওপর একই অভিঘাতের দ্বিতীয় বোঝা চাপবে।

রাষ্ট্র জনগণের কাছ থেকে বাড়তি মূল্য নিতে পারে অর্থনৈতিক প্রয়োজনের কারণে; কিন্তু সেই সুযোগে জনগণকে আরো বাড়তি অর্থ দিতে বাধ্য করার অধিকার কোনো পরিবহন মালিকের নেই। ডিজেলচালিত বাসের যৌক্তিক ভাড়া যতটুকু, শুধু ততটুকুই আদায় করতে হবে। আর গ্যাসচালিত বাসের ক্ষেত্রে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির অজুহাতে কোনো বাড়তি ভাড়া নয়।

এখন সরকারের কাজ শুধু নতুন ভাড়া ঘোষণা করা নয়; কোন বাসে কত ভাড়া নেওয়া যাবে, কেন নেওয়া যাবে এবং নির্ধারিত ভাড়ার বাইরে এক টাকাও কেন নেওয়া যাবে না-তার বাস্তব প্রয়োগ নিশ্চিত করা। রাস্তায় নিয়মিত নজরদারি, তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান শাস্তিই পারে এই নৈরাজ্য ঠেকাতে।

জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি যদি অর্থনৈতিক বাস্তবতার কারণে অনিবার্য হয়, তবে তার অভিঘাতের নামে জনভোগান্তি বাড়ানো কোনোভাবেই অনিবার্য নয়। সরকারের হাতে আইন আছে, নিয়ন্ত্রক সংস্থা আছে, ভাড়া নির্ধারণের ক্ষমতা আছে। এখন প্রয়োজন সেই ক্ষমতার কঠোর, নিরপেক্ষ ও নিয়মিত প্রয়োগ। জনগণ নতুন ভাড়ার বোঝা বহন করবে; কিন্তু ভাড়ার নামে নৈরাজ্যের বোঝা কেন বহন করবে?
সানা/আপ্র/২৩/৯/২০২৬
 

সংশ্লিষ্ট খবর

শিশুরা নিখোঁজ হবে, লাশ হয়ে ফিরবে, রাষ্ট্র কি শুধু সংখ্যা গুনবে?
২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

শিশুরা নিখোঁজ হবে, লাশ হয়ে ফিরবে, রাষ্ট্র কি শুধু সংখ্যা গুনবে?

একটি শিশু নিখোঁজ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে একটি পরিবারের পৃথিবী থমকে যায়। সন্তানের ফেরার আশায় উৎকণ্ঠিত বাবা...

একটি মুঠোফোন, এক প্লেট ভাত আর আমাদের বিবেকের মৃত্যু
২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

একটি মুঠোফোন, এক প্লেট ভাত আর আমাদের বিবেকের মৃত্যু

একটি মুঠোফোনের জন্য তেরো বছরের শিশু অপ্রতিমকে নির্জন জঙ্গলে নিয়ে হত্যা, আর ‘ভাত চুরি’ করার অপবাদে এক...

ঘরে ঘরে সর্দি-কাশি-জ্বর মোকাবিলায় সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন
১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ঘরে ঘরে সর্দি-কাশি-জ্বর মোকাবিলায় সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন

রাজধানী ঢাকায় বর্তমানে ডেঙ্গু, হাম ও সিজনাল ফ্লুর পাশাপাশি ঘরে ঘরে দীর্ঘস্থায়ী সর্দি, কাশি ও জ্বর এক...

সয়াবিন সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদি কার্যকর পদক্ষেপ জরুরি
১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সয়াবিন সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদি কার্যকর পদক্ষেপ জরুরি

রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন খুচরা বাজারে বোতলজাত সয়াবিন তেলের তীব্র সংকট এবং এর আড়ালে চলা কৃত্রিম সংকট ও...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

বাস ভাড়া বাড়লো কিলোমিটারে ১৭ পয়সা, প্রজ্ঞাপনের আগেই বাড়তি আদায়

জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর পর সরকারি প্রজ্ঞাপন জারির আগেই রাজধানীসহ বিভিন্ন রুটে বাসভাড়া বাড়িয়ে দিয়েছেন পরিবহনকর্মীদের কেউ কেউ। কোথাও ১০ টাকার ভাড়া নেওয়া হচ্ছে ১৫ টাকা, কোথাও প্রতি স্টপেজে পাঁচ টাকা করে বেশি নেওয়া হচ্ছে। দূরপাল্লার বাসেও গন্তব্যভেদে ৫০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত বাড়তি ভাড়া নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। অথচ সরকার ও সড়ক পরিবহন মালিকপক্ষ প্রতি কিলোমিটারে ১৭ পয়সা ভাড়া বাড়ানোর বিষয়ে একমত হয়েছে। প্রিয় পাঠক, আপনি কি মনে করেন বাস ভাড়ার এই নৈরাজ্য সরকার নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে?

মোট ভোট: ০ | শেষ আপডেট: 15 ঘন্টা আগে