গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

মেনু

রাষ্ট্রীয় মর্যাদার মঞ্চে শৃঙ্খলা ও সংযমের অনিবার্য পাঠ

সুখদেব কুমার সানা

সুখদেব কুমার সানা

প্রকাশিত: ১৬:২২ পিএম, ০৮ আগস্ট ২০২৬ | আপডেট: ১১:১০ এএম ২০২৬
রাষ্ট্রীয় মর্যাদার মঞ্চে শৃঙ্খলা ও সংযমের অনিবার্য পাঠ
ছবি

ফাইল ছবি

রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা দলের আবেগ প্রকাশের সাধারণ মঞ্চ নয়; এটি একটি জাতির ভাবমূর্তি, পরিপক্বতা ও রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রতিচ্ছবি। রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলনকেন্দ্রে জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস উপলক্ষে আয়োজিত শহীদ পরিবার ও জুলাই যোদ্ধাদের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে যে অনভিপ্রেত বিশৃঙ্খলার ঘটনা ঘটেছে, তা কেবল একটি অনুষ্ঠানের শৃঙ্খলাভঙ্গ নয়; এটি নতুন বাংলাদেশের রাজনৈতিক আচরণ ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নও তুলে দিয়েছে।

জুলাই গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি গভীর তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায়। এই আন্দোলনে যারা জীবন দিয়েছেন, যারা আহত হয়েছেন, যারা অঙ্গহানি ও সীমাহীন ত্যাগ স্বীকার করেছেন, তাদের প্রতি রাষ্ট্রের দায়িত্ব নিঃসন্দেহে সর্বোচ্চ। তাদের স্মৃতি সংরক্ষণ, যথাযথ মূল্যায়ন এবং প্রজন্মের কাছে সঠিক ইতিহাস তুলে ধরা রাষ্ট্রের পবিত্র কর্তব্য। তাই এই অভ্যুত্থান নিয়ে নির্মিত প্রামাণ্যচিত্রে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব বা ঘটনার যথাযথ প্রতিফলন না থাকলে প্রশ্ন উঠবে, সংশোধনের দাবি উঠবে-এটাই স্বাভাবিক। সমালোচনা গণতন্ত্রের শক্তি, প্রতিবাদ নাগরিক অধিকারের অংশ।

কিন্তু প্রতিবাদেরও একটি শালীন ভাষা আছে, একটি গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি আছে। জাতীয় অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে চিৎকার, হট্টগোল, অসৌজন্যমূলক আচরণ এবং বিদেশি অতিথিদের সামনে বিব্রতকর পরিস্থিতি সৃষ্টি কোনোভাবেই কাঙিক্ষত নয়। মতভিন্নতা গণতন্ত্রের সৌন্দর্য, কিন্তু বিশৃঙ্খলা কখনো গণতান্ত্রিক চেতনার প্রতীক হতে পারে না।

ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হাফিজ উদ্দিন আহমদের বক্তব্যে যে বেদনা ও হতাশা প্রকাশ পেয়েছে, তা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। তিনি যথার্থভাবেই বলেছেন, ভুল মানুষের হয়, ভুল সংশোধনের সুযোগও থাকতে হবে। প্রামাণ্যচিত্রে ত্রুটি থাকলে তা আলোচনার মাধ্যমে সংশোধন করা যেত। একটি জাতীয় আয়োজনকে উত্তেজনা ও বিভক্তির প্রতীকে পরিণত না করে ঐক্যের বার্তা দেওয়াই সবার লক্ষ্য হওয়া উচিৎ ছিল।

এই ঘটনার সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো-নতুন বাংলাদেশ নির্মাণে শুধু রাজনৈতিক পরিবর্তন যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন আচরণগত ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তন। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অসহিষ্ণুতা, প্রতিপক্ষকে সহ্য না করার প্রবণতা এবং আবেগের বশবর্তী হয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। গণতন্ত্র কেবল ভোটের অধিকার নয়; গণতন্ত্র মানে ভিন্নমতকে সম্মান করা, যুক্তির মাধ্যমে নিজের অবস্থান তুলে ধরা এবং জাতীয় স্বার্থে সংযম প্রদর্শন করা।

বিশেষ করে জুলাই অভ্যুত্থানের চেতনা যদি সত্যিই একটি ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন বহন করে, তবে সেই চেতনার প্রথম শর্ত হতে হবে শৃঙ্খলা, সহনশীলতা ও দায়িত্বশীলতা। শহীদদের আত্মত্যাগকে সম্মান জানাতে হলে তাদের স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়ার উপযোগী রাজনৈতিক সংস্কৃতিও গড়ে তুলতে হবে।

বিদেশি কূটনীতিকদের সামনে একটি রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি দেশের ভাবমূর্তির জন্য সুখকর নয়। আন্তর্জাতিক পরিসরে একটি দেশের গ্রহণযোগ্যতা শুধু অর্থনীতি বা কূটনৈতিক তৎপরতায় তৈরি হয় না; রাষ্ট্রীয় আচরণ, রাজনৈতিক পরিপক্বতা এবং সামাজিক স্থিতিশীলতাও এর গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

এখন দায়ারোপের রাজনীতি নয়, প্রয়োজন আত্মসমালোচনার সাহস। সংশ্লিষ্টদের উচিত ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়া। রাষ্ট্রের দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিশ্চিত করতে হবে, ভবিষ্যতে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানগুলো যেন মতপ্রকাশের সুযোগ ও শৃঙ্খলার ভারসাম্য বজায় রেখে পরিচালিত হয়।

জুলাইয়ের আত্মত্যাগ একটি বিভক্ত বাংলাদেশের জন্য নয়, একটি ঐক্যবদ্ধ ও মর্যাদাপূর্ণ বাংলাদেশের জন্য। সেই বাংলাদেশ নির্মাণে প্রত্যেক রাজনৈতিক কর্মী, নেতা ও নাগরিককে মনে রাখতে হবে-স্বাধীনতার প্রকৃত সৌন্দর্য প্রকাশ পায় দায়িত্বশীল আচরণে, আর গণতন্ত্রের প্রকৃত শক্তি প্রকাশ পায় সংযমে।
সানা/আপ্র/৮/৮/২০২৬
 

সংশ্লিষ্ট খবর

ডাকসু সংগ্রহশালায় জিন্নাহ: ইতিহাস মুছে নতুন ইতিহাস লেখার চেষ্টা কেন
১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ডাকসু সংগ্রহশালায় জিন্নাহ: ইতিহাস মুছে নতুন ইতিহাস লেখার চেষ্টা কেন

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের সংগ্রহশালায় পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর...

বেসরকারি চাকরিজীবীদের অধিকার নিয়ে আর কালক্ষেপণ নয়
১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

বেসরকারি চাকরিজীবীদের অধিকার নিয়ে আর কালক্ষেপণ নয়

দেশের শ্রমবাজারের দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি মানুষ বেসরকারি খাতের সঙ্গে যুক্ত, অথচ তাঁদের বড় একটি অংশ এখনো...

যাত্রীবেশে গাড়িতে অপরাধীচক্র, রুখবে কে?
১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

যাত্রীবেশে গাড়িতে অপরাধীচক্র, রুখবে কে?

মানুষ কি এখন পথে বের হওয়ার আগে শুধু নিজের ভাগ্যকেই দায়ী করবে? দিনে-রাতে গণপরিবহনে উঠবে, মহাসড়কে চলবে...

শুধু হুঁশিয়ারি নয়, হাসপাতালে অনিয়ম বন্ধে চাই দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা
১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

শুধু হুঁশিয়ারি নয়, হাসপাতালে অনিয়ম বন্ধে চাই দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা

সরকারি হাসপাতাল মানুষের শেষ ভরসা। বিশেষ করে ডেঙ্গুর মতো রোগের প্রাদুর্ভাবের সময়ে অসুস্থ মানুষ যখন সর...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

জুয়া ও মাদক অনেক অপরাধের মূল কারণ: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

বর্তমানে সংঘটিত অনেক অপরাধের পেছনে জুয়া ও মাদককে অন্যতম মূল কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, অপরাধের পর শুধু গ্রেফতার, বিচার ও শাস্তি দিলেই এটা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। অপরাধ কেন সংঘটিত হচ্ছে, তার মূল কারণ খুঁজে বের করে তা মোকাবিলা করতে হবে। প্রিয় পাঠক, মন্ত্রীর কথার সঙ্গে আপনি কি একমত?

মোট ভোট: ১ | শেষ আপডেট: 2 ঘন্টা আগে