গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
শুক্রবার, ১৯ জুন ২০২৬

মেনু

অপরাধের ছায়ারাজ্য মোহাম্মদপুর, রাজধানীর হৃদয়ে আইনের শাসনের চ্যালেঞ্জ

সুখদেব কুমার সানা

সুখদেব কুমার সানা

প্রকাশিত: ১৭:০৩ পিএম, ১৯ জুন ২০২৬ | আপডেট: ১৭:৫৪ এএম ২০২৬
অপরাধের ছায়ারাজ্য মোহাম্মদপুর, রাজধানীর হৃদয়ে আইনের শাসনের চ্যালেঞ্জ
ছবি

ফাইল ছবি

রাজধানী ঢাকা একটি রাষ্ট্রের প্রশাসনিক সক্ষমতা, নিরাপত্তা কাঠামো এবং আইন প্রয়োগ ব্যবস্থার প্রতিচ্ছবি। সেই ঢাকার একটি এলাকার নাম আজ বারবার জাতীয় আলোচনায় উঠে আসছে-মোহাম্মদপুর। একসময় পরিকল্পিত আবাসিক এলাকা হিসেবে পরিচিত এই জনপদ এখন প্রায় প্রতিদিনই ছিনতাই, চাঁদাবাজি, মাদক বাণিজ্য, সশস্ত্র সন্ত্রাস, হত্যাকাণ্ড, কিশোর গ্যাং এবং সংঘবদ্ধ অপরাধের খবরের কারণে সংবাদ শিরোনাম হচ্ছে। সর্বশেষ আদাবরে এক বিকাশ এজেন্টকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে সাড়ে তিন লাখ টাকা ছিনতাই এবং পরে অভিযানে গিয়ে পুলিশের ওপর হামলার ঘটনা আবারো স্মরণ করিয়ে দিলো, রাজধানীর এই অংশে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি কতটা নাজুক অবস্থায় পৌঁছেছে।

বিশেষ উদ্বেগের বিষয় হলো, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। গত দেড় বছরে মোহাম্মদপুর, জেনেভা ক্যাম্প, চাঁদ উদ্যান, বছিলা ও সংলগ্ন এলাকায় পুলিশ, সেনাবাহিনী ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে অসংখ্য বিশেষ অভিযান পরিচালনা করতে হয়েছে। একাধিক অভিযানে বিপুলসংখ্যক অস্ত্রধারী অপরাধী, মাদক ব্যবসায়ী, ছিনতাইকারী ও চাঁদাবাজ গ্রেফতার হয়েছে; উদ্ধার হয়েছে অস্ত্র, বোমা, গুলি, মাদক এবং বিপুল পরিমাণ অবৈধ অর্থ। শুধু একটি বিশেষ অভিযানে পুলিশ ৪৮ জনকে গ্রেফতার করেছে; অন্য এক অভিযানে যৌথবাহিনী ৫৩ জনকে আটক করে বিপুল মাদক ও দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার করেছে। আবার জেনেভা ক্যাম্পকেন্দ্রিক অভিযানে বোমা, বিস্ফোরক, মাদক ও কোটি টাকার বেশি নগদ অর্থ উদ্ধারের ঘটনাও ঘটেছে।

প্রশ্ন হলো, এত অভিযান, এত গ্রেফতার এবং এত নিরাপত্তা তৎপরতার পরও কেন মোহাম্মদপুরে অপরাধের পুনরুত্থান ঘটছে? কেন এমন ধারণা তৈরি হচ্ছে যে, রাজধানীর এই অংশে রাষ্ট্রের চেয়ে সংঘবদ্ধ অপরাধচক্রের উপস্থিতি বেশি দৃশ্যমান?

এর উত্তর খুঁজতে হলে কেবল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দিকে তাকালে চলবে না। সমস্যার শিকড় আরো গভীরে। দীর্ঘদিন ধরে অপরাধী গোষ্ঠীগুলোর অর্থনৈতিক ভিত্তি, মাদক বাণিজ্যের নেটওয়ার্ক, অবৈধ অস্ত্রের সরবরাহ, স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের ছত্রচ্ছায়া এবং বিচার প্রক্রিয়ার দুর্বলতা মিলিয়ে এক ধরনের অপরাধ-বাস্তুতন্ত্র গড়ে উঠেছে। ফলে একজন সন্ত্রাসী গ্রেফতার হলেও তার জায়গা নিতে আরেকজন প্রস্তুত থাকে। কোনো চক্র ভেঙে দেওয়া হলেও কিছুদিনের মধ্যে নতুন নামে আরেকটি চক্র সক্রিয় হয়ে ওঠে।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হচ্ছে, আইন প্রয়োগের ধারাবাহিকতা ও বিচারের নিশ্চয়তা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন রয়েছে। বহু ক্ষেত্রে দেখা যায়, গ্রেফতারের পর প্রভাব, অর্থ কিংবা প্রক্রিয়াগত দুর্বলতার সুযোগে অপরাধীরা আবারো সমাজে ফিরে আসে। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে আস্থাহীনতা জন্ম নেয় এবং অপরাধীদের মধ্যে তৈরি হয় দায়মুক্তির সংস্কৃতি। বাস্তবতা হলো, আইনের শাসনের সবচেয়ে বড় শক্তি অভিযান নয়; নিশ্চিত বিচার।

মোহাম্মদপুরের বর্তমান পরিস্থিতি তাই কেবল একটি থানার বা একটি এলাকার সমস্যা নয়; এটি রাষ্ট্রীয় সক্ষমতার পরীক্ষা। রাজধানীর কেন্দ্রস্থলে যদি সাধারণ মানুষ নিরাপদে ব্যবসা করতে না পারেন, রাতে চলাচল করতে ভয় পান, কিংবা প্রতিদিন ছিনতাই ও সহিংসতার আশঙ্কায় থাকেন, তবে তার অভিঘাত গোটা নগরজীবনের ওপর পড়ে।

এ অবস্থায় প্রয়োজন নিয়মিত অভিযানের পাশাপাশি আরো সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা কৌশল। অপরাধপ্রবণ এলাকাগুলোতে গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করতে হবে, অবৈধ অস্ত্র ও মাদকের উৎস ধ্বংস করতে হবে, সংঘবদ্ধ অপরাধচক্রের অর্থনৈতিক ভিত্তি ভেঙে দিতে হবে এবং রাজনৈতিক বা সামাজিক পরিচয় নির্বিশেষে অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে গ্রেফতার থেকে বিচার পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়ায় জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।

রাষ্ট্রের প্রতি নাগরিকের মৌলিক প্রত্যাশা নিরাপত্তা। মোহাম্মদপুরের মানুষ আজ সেই নিরাপত্তার নিশ্চয়তা চাইছে। তাদের এই দাবি অযৌক্তিক নয়, বিলাসিতাও নয়; এটি সাংবিধানিক অধিকার। রাজধানীর হৃদয়ে আইনের শাসন সুপ্রতিষ্ঠিত করতে না পারলে কোনো অভিযানই স্থায়ী ফল দেবে না। সময় এসেছে অপরাধের বিরুদ্ধে আপসহীন রাষ্ট্রীয় অবস্থান গ্রহণের-যেখানে অপরাধী জানবে, গ্রেফতার এড়ানো যেমন অসম্ভব, তেমনি বিচার থেকেও রেহাই নেই।

সানা/আপ্র/১৯/৬/২০২৬
 

সংশ্লিষ্ট খবর

ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে লোকদেখানো উদ্যোগ নয়, চাই বিজ্ঞানভিত্তিক নগর ব্যবস্থাপনা
১৭ জুন ২০২৬

ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে লোকদেখানো উদ্যোগ নয়, চাই বিজ্ঞানভিত্তিক নগর ব্যবস্থাপনা

বর্ষার মেঘ এখনও পুরোপুরি আকাশ দখল করেনি, অথচ ডেঙ্গুর অশনি সংকেত ইতোমধ্যেই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। চলতি বছর...

আষাঢ়ের স্নিগ্ধ আহ্বান-প্রকৃতি, সংস্কৃতি ও জীবনরক্ষার প্রত্যয়
১৬ জুন ২০২৬

আষাঢ়ের স্নিগ্ধ আহ্বান-প্রকৃতি, সংস্কৃতি ও জীবনরক্ষার প্রত্যয়

আষাঢ় আসে কোনো হুঙ্কার নিয়ে নয়-সে আসে নীরব স্নিগ্ধতায়, মেঘের বুক চিরে ঝরে পড়া আশ্বাসের মতো। দীর্ঘ খরত...

জবাবদিহির নতুন দিগন্ত উন্মোচন
১৫ জুন ২০২৬

জবাবদিহির নতুন দিগন্ত উন্মোচন

স্বাস্থ্যখাতে দুর্নীতির বিরুদ্ধে সাহসী বার্তা স্বাস্থ্যমন্ত্রীর

মানুষের জীবনে কতটা স্বস্তি আনবে বাজেট
১৪ জুন ২০২৬

মানুষের জীবনে কতটা স্বস্তি আনবে বাজেট

বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্ববৃহৎ ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার জাতীয় বাজেট ঘোষিত হয়েছে এমন এক সময়ে, যখন দেশের...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

মেসিই সর্বকালের সেরা, বললেন রোনালদো

আর কোনো বিতর্ক নয়, কোনো লুকোছাপাও নয়—লিওনেল মেসিকেই সর্বকালের সেরা ফুটবলার হিসেবে মেনে নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন ব্রাজিলের কিংবদন্তি স্ট্রাইকার রোনালদো নাজারিও। আপনি কি রোনালদোর কথায় একমত?

মোট ভোট: ১ | শেষ আপডেট: 1 দিন আগে