চট্টগ্রাম ব্যুরো: বিএনপি সরকারের আমলে পরিচয়, প্রভাব বা পৃষ্ঠপোষকতার ভিত্তিতে কাউকে ব্যবসার সুযোগ দেওয়া হবে না বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেছেন, মন্ত্রী কিংবা যতই প্রভাবশালী ব্যক্তি হোন না কেন, পৃষ্ঠপোষকতার কোনো ব্যবসা এই সরকারের অধীনে চলবে না।
মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) বিকেলে চট্টগ্রাম বন্দরের সম্মেলন কক্ষে বন্দর ও কাস্টমস কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
চট্টগ্রাম কাস্টমসে অবৈধ পণ্য খালাসে একটি চক্র গড়ে ওঠার অভিযোগ এবং কাস্টমসের আটক করা কয়েকটি কনটেইনার দুই মাস ধরে বন্দরে পড়ে থাকার বিষয়ে এক সাংবাদিক প্রশ্ন করেন। ওই সাংবাদিক বলেন, কায়িক পরীক্ষা করতে না পারায় এসব পণ্য খালাস হচ্ছে না এবং অভিযোগ রয়েছে, অর্থমন্ত্রীর পরিচিত কয়েকজন ব্যবসায়ী এসব পণ্য আমদানি করেছেন। এ পরিস্থিতিতে কাস্টমস কর্মকর্তাদের ভয়মুক্তভাবে কাজ করার বিষয়ে তাঁর আশ্বাস জানতে চান তিনি।
জবাবে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, কে কার সঙ্গে পরিচিত বা কার সঙ্গে জড়িত-এসব বিষয় এই সরকারের অধীনে চলবে না। পরিচয় বা পৃষ্ঠপোষকতার ভিত্তিতে কোনো ব্যবসার সুযোগ দেওয়া হবে না। যত বড় মন্ত্রী বা যত প্রভাবশালী ব্যক্তিই হোন, এ ক্ষেত্রে তাঁর কোনো সুযোগ নেই।
চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনায় সরকারের সিদ্ধান্ত কী-এমন প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, বন্দর যে-ই পরিচালনা করুক, তাকে জনগণ, ব্যবসা, শিল্প এবং বাংলাদেশের অর্থনীতির স্বার্থকে গুরুত্ব দিয়ে কাজ করতে হবে। বন্দর দেশি না বিদেশি প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করবে, সেটি সরকারের মূল বিষয় নয়; বরং যার হাতে বন্দর থাকবে, তাকে এসব বিষয় নিশ্চিত করতে হবে।
গত তিন বছরে প্রায় ৪০০ কলকারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার বিষয়ে ব্যবসায়ীদের সংগঠনের হিসাব উল্লেখ করে এক সাংবাদিক শিল্প রক্ষায় সরকারের উদ্যোগ জানতে চাইলে অর্থমন্ত্রী বলেন, শিল্পকারখানাগুলো যাতে নির্বিঘ্নে পরিচালিত হতে পারে, ব্যবসায়িক খরচ কমে এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারে, সেজন্য সরকার ইতোমধ্যে বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে।
তিনি বলেন, অর্থনীতিকে সরলীকরণ, নিয়ন্ত্রণ শিথিলকরণ এবং করের বোঝা কমানোর মতো পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, যাতে শিল্প খাত ঘুরে দাঁড়াতে পারে। এরই মধ্যে দেশে বিদেশি বিনিয়োগও বড় আকারে আসছে বলে দাবি করেন তিনি।
চট্টগ্রামে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের ভাইস প্রেসিডেন্ট ইংমিং ইয়াংয়ের সফর ও বৈঠকের প্রসঙ্গ তুলে অর্থমন্ত্রী বলেন, চট্টগ্রাম নিয়ে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের বড় পরিকল্পনা রয়েছে। শুধু লজিস্টিক কেন্দ্র হিসেবে নয়, আগামী দিনে চট্টগ্রামকে উন্নয়নের অগ্রপথিক হিসেবে তারা দেখতে চায়। এ অঞ্চলের সার্বিক উন্নয়নে ব্যাংকটির পরিকল্পনা বাস্তবায়ন নিয়েই ওই বৈঠকে অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা হবে।
এর আগে মঙ্গলবার দুপুরে বন্দর ও কাস্টমস কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকের প্রসঙ্গ তুলে অর্থমন্ত্রী জানান, বন্দর ও কাস্টমসের মধ্যে একটি যৌথ কমিটি গঠন করা হবে। কমিটি দুই প্রতিষ্ঠানের সমস্যাগুলো সমন্বিতভাবে সমাধান করবে।
তিনি বলেন, বন্দর ও কাস্টমসের কার্যক্রমে অতিরিক্ত খরচ হলে শেষ পর্যন্ত সেই বোঝা জনগণের ওপর পড়ে। তাই ভবিষ্যতে ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের ওপর এ ধরনের অতিরিক্ত ব্যয় চাপানো যাবে না। আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে বন্দর ও কাস্টমসের কার্যক্রম আরো দক্ষ ও দ্রুত করতে হবে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, বন্দর ও কাস্টমসের মধ্যে নতুন ধারার সমন্বিত কার্যক্রমের মাধ্যমে ব্যবসায়ী, সরকার ও জনগণ-সব পক্ষই লাভবান হবে। এর মধ্য দিয়ে ২০৩৪ সালে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পৌঁছানোর পথও সুগম হবে।
নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ভঙ্গুর অর্থনীতি স্থিতিশীল করার জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলেও জানান অর্থমন্ত্রী। তাঁর ভাষ্য, অর্থনীতিকে চাঙা করা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, রপ্তানি ও শিল্পায়ন বাড়ানো এবং ব্যবসার জন্য বাধাহীন পরিবেশ তৈরি করা সরকারের অন্যতম লক্ষ্য।
তিনি বলেন, সাধারণ মানুষের উচ্চ দ্রব্যমূল্যের পেছনে বন্দরে অতিরিক্ত খরচ এবং কাস্টমসের দীর্ঘসূত্রতাও অন্যতম কারণ। বন্দর ও কাস্টমসের কার্যক্রমে কোথায় কোথায় সমস্যা রয়েছে, সেগুলো চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রতিটি সমস্যার সমাধান কী হবে এবং কত সময়ের মধ্যে তা বাস্তবায়ন করা হবে, সে বিষয়েও সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, সিদ্ধান্তগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন হলে চট্টগ্রাম বন্দর ও কাস্টমসের কার্যক্রম আরো দক্ষ হবে। কম সময়ে পণ্য খালাস এবং রপ্তানি কার্যক্রম সম্পন্ন করা সম্ভব হবে। এতে ব্যবসার খরচ কমবে এবং দেশের অর্থনীতি আরো প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠবে।
সানা/আপ্র/১১/৮/২০২৬