জাতীয় প্রেস ক্লাবে আয়োজিত ‘ভূমিকম্প ঝুঁকিতে দেশ, আমাদের করণীয়’ শীর্ষক আলোচনা সভায় রাজউকের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. রিয়াজুল ইসলাম যে বক্তব্য দিয়েছেন, তা শুধু একটি প্রশাসনিক পর্যবেক্ষণ নয়; এটি রাষ্ট্রীয় নগর ব্যবস্থাপনার গভীর অসুস্থতার এক বিরল আত্মস্বীকৃতি। তাঁর ভাষায়, রিহ্যাব, ভবন মালিক ও রাজউকের পরিদর্শকদের “যৌথ প্রযোজনায়” ভবন নির্মাণে অনিয়ম ঘটে। তিনি আরো বলেছেন, অনুমোদিত নকশার বাইরে অতিরিক্ত তলা নির্মাণ করে পরে শুধু জরিমানা দিয়ে বৈধ করার সুযোগ থাকা উচিত নয়। রাজধানীর নির্মাণ খাত নিয়ে দীর্ঘদিনের অভিযোগের প্রেক্ষাপটে এই বক্তব্য বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।
ঢাকার আকাশরেখা যত উঁচু হচ্ছে, ততই বাড়ছে নাগরিক উদ্বেগ। বহুতল ভবনের জঙ্গল ঘিরে আমরা বহুদিন ধরে ভূমিকম্পঝুঁকির কথা শুনে আসছি। কিন্তু সেই ঝুঁকির কেন্দ্রে থাকা রাষ্ট্রীয় সংস্থার প্রধান যখন প্রকাশ্যে অনিয়মের উৎস হিসেবে বহুপক্ষীয় যোগসাজশের কথা বলেন, তখন বিষয়টি আর বিচ্ছিন্ন দুর্নীতির অভিযোগ থাকে না; এটি নগর পরিচালনা ব্যবস্থার কাঠামোগত ব্যর্থতার ইঙ্গিত হয়ে ওঠে।
ভূমিকম্পপ্রবণ একটি দেশের জন্য এই বাস্তবতা ভয়াবহ। অনুমোদিত নকশা ছয় তলার, কিন্তু নির্মিত হচ্ছে দশ তলা-এ ধরনের অভিযোগ নতুন নয়। নতুন হলো, রাজউকের সর্বোচ্চ দায়িত্বশীল ব্যক্তিও স্বীকার করছেন যে অনিয়মের সুযোগ বাস্তবেই তৈরি হচ্ছে। অর্থাৎ সমস্যাটি কেবল কিছু অসাধু ব্যক্তির নয়; এটি তদারকি, অনুমোদন ও জবাবদিহির পুরো ব্যবস্থার দুর্বলতার প্রতিফলন।
ঢাকার প্রায় ছয় লাখ ভবনের মধ্যে কতগুলো ভবন প্রকৃতপক্ষে ভূমিকম্প-সহনশীল, তার নির্ভরযোগ্য তালিকা আজও নেই। জলাভূমি ভরাট করে গড়ে ওঠা আবাসন প্রকল্প, দুর্বল মাটির ওপর অপরিকল্পিত বহুতল নির্মাণ, নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী এবং নকশা পরিবর্তনের প্রবণতা-সব মিলিয়ে রাজধানী একটি সুপ্ত বিপর্যয়ের দিকে এগোচ্ছে। ফায়ার সার্ভিসের উপপরিচালক যথার্থই বলেছেন, ভূমিকম্পে মানুষ সরাসরি মারা যায় না; ভবন ধসে প্রাণহানি ঘটে। অর্থাৎ প্রকৃত বিপদ ভূমিকম্প নয়, অনিয়মিত ভবন।
এ অবস্থায় কেবল কিছু কর্মকর্তা সাময়িক বরখাস্ত করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। প্রয়োজন কাঠামোগত সংস্কার। প্রথমত, ভবন অনুমোদন, নির্মাণ তদারকি ও ব্যবহার-অনুমতির প্রতিটি ধাপ সম্পূর্ণ ডিজিটাল এবং জনসমক্ষে উন্মুক্ত করতে হবে। কোন ভবনের কত তলার অনুমোদন, কোন প্রকৌশলী নকশা করেছেন, কোন পরিদর্শক ছাড়পত্র দিয়েছেন-এসব তথ্য নাগরিকের জানার অধিকার হওয়া উচিত।
দ্বিতীয়ত, অনুমোদিত নকশা লঙ্ঘনকে কেবল আর্থিক অপরাধ হিসেবে নয়, জননিরাপত্তাবিরোধী দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। অতিরিক্ত তলা অপসারণে রাজনৈতিক বা প্রভাবশালী মহলের হস্তক্ষেপ বন্ধ না হলে কোনো অভিযানই টেকসই হবে না।
তৃতীয়ত, নকশা প্রণয়নকারী প্রকৌশলী ও স্থপতিদের দায়বদ্ধতা আইনি কাঠামোর মধ্যে স্পষ্ট করতে হবে। শুধু নকশা জমা দিলেই দায়িত্ব শেষ হতে পারে না; নির্মাণ বাস্তবায়নের সঙ্গে তাঁদের প্রত্যক্ষ পেশাগত জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
রাজউকের চেয়ারম্যান বলেছেন, “এই কাজ একদিনে শেষ হবে না।” কথাটি সত্য। কিন্তু কাজটি শুরু হতে হবে দৃশ্যমান কঠোরতা দিয়ে। কারণ প্রতিটি অবৈধ তলা, প্রতিটি ভুয়া ছাড়পত্র এবং প্রতিটি দায়িত্বহীন নির্মাণ ভবিষ্যতের সম্ভাব্য ধ্বংসস্তূপের ইট হয়ে উঠছে। ভূমিকম্প কখন আঘাত হানবে, তা আমাদের নিয়ন্ত্রণে নেই; কিন্তু সেই ভূমিকম্পকে প্রাণঘাতী বিপর্যয়ে পরিণত করবে কি না, তা সম্পূর্ণ আমাদের হাতেই নির্ভর করছে। এখনই যদি ভবন-দুর্নীতির এই সংস্কৃতি রোধ করা না যায়, তবে আগামী দিনের কোনো ধ্বংসস্তূপের সামনে দাঁড়িয়ে অনুতাপ ছাড়া আমাদের আর কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না।
সানা/আপ্র/১০/৮/২০২৬