বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত আজ এমন এক সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে, যেখানে অর্থনীতির প্রচলিত যুক্তি কার্যত ভেঙে পড়েছে। বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবৃদ্ধি চার দশমিক চার সাত শতাংশে নেমে এসেছে, যা তিন দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে সর্বনিম্ন। সাধারণত এমন পরিস্থিতিতে ব্যাংকগুলোর হাতে উদ্বৃত্ত তারল্য থাকার কথা। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, কিছু ব্যাংক আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দিতেও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জরুরি সহায়তার ওপর নির্ভর করছে। এ বৈপরীত্য কেবল অর্থের ঘাটতির নয়; এটি ব্যাংকিং ব্যবস্থার গভীরে প্রোথিত আস্থাহীনতা, সুশাসনের ব্যর্থতা এবং দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতাপ্রাপ্ত অনিয়মের নির্মম প্রতিফলন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় পাঁচ লাখ ঊননব্বই হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে। একই সঙ্গে প্রভিশন ঘাটতি দুই লাখ পাঁচ হাজার কোটির বেশি। আরো উদ্বেগজনক হলো, সমস্যাগ্রস্ত ও দুর্দশাগ্রস্ত ঋণের পরিমাণ মোট ঋণের প্রায় ষাট শতাংশের কাছাকাছি পৌঁছেছে বলে বিভিন্ন বিশ্লেষণে উঠে এসেছে। অর্থাৎ ব্যাংকের হিসাবের খাতায় বিপুল সম্পদ দেখানো হলেও তার বড় অংশ কার্যত অচল। এই অচল সম্পদই আজ তারল্য সংকটের প্রধান উৎস।
বিশেষ করে পূর্ণাঙ্গ ইসলামী ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের হার যে মাত্রায় পৌঁছেছে, তা আর বিচ্ছিন্ন কোনো ব্যবস্থাপনা দুর্বলতার বিষয় নয়; এটি পুরো খাতের ঝুঁকির ইঙ্গিত। একই গ্রুপকে একাধিক ব্যাংক থেকে ঋণ দেওয়া, দুর্বল জামানতের বিপরীতে বিপুল অর্থ ছাড়, রাজনৈতিক বিবেচনায় ঋণ অনুমোদন এবং কার্যকর তদারকির অভাব-এসব অনিয়ম বহু বছর ধরে জমতে জমতে আজ বিস্ফোরিত হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, ঋণের একটি অংশ বিদেশে পাচার হয়েছে অথবা এমন প্রকল্পে গেছে, যেখান থেকে অর্থ আর ব্যাংকে ফিরে আসেনি।
এ সংকটের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বিনিয়োগ স্থবিরতা। উদ্যোক্তারা এখন ঋণের অভাবে নয়, বরং অনিশ্চয়তার কারণে বিনিয়োগে পিছিয়ে যাচ্ছেন। উচ্চ সুদের হার, গ্যাস ও বিদ্যুতের ঘাটতি, উৎপাদন ব্যয়ের ঊর্ধ্বগতি, ডলারের অস্থিরতা এবং রপ্তানি বাজারের চাপ শিল্পখাতকে সতর্ক অবস্থানে ঠেলে দিয়েছে। পোশাকসহ উৎপাদনমুখী শিল্পের বহু উদ্যোক্তা নতুন বিনিয়োগের পরিবর্তে বিদ্যমান কারখানা টিকিয়ে রাখাকেই অগ্রাধিকার দিচ্ছেন। ফলে ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা ও শিল্পখাতের স্থবিরতা একে অপরকে আরো তীব্র করছে।
তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা উপেক্ষা করা যাবে না। দেশে মোট আমানত প্রবৃদ্ধি এখনো ইতিবাচক, রেমিট্যান্স প্রবাহও শক্তিশালী। অর্থাৎ অর্থনীতি পুরোপুরি অর্থশূন্য নয়। সমস্যা হলো, আমানত এখন সব ব্যাংকে সমানভাবে যাচ্ছে না। গ্রাহকেরা তুলনামূলকভাবে সুশাসনসম্পন্ন ও শক্তিশালী ব্যাংকের দিকে ঝুঁকছেন, আর দুর্বল ব্যাংক থেকে অর্থ সরিয়ে নিচ্ছেন। এটি প্রমাণ করে, বর্তমান সংকটের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে আস্থার প্রশ্ন।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর ব্যাংক খাতে সংস্কারের যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে-দুর্বল ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন, একীভূতকরণ, ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি এবং আইন সংশোধনের প্রচেষ্টা-তা ইতিবাচক সূচনা হতে পারে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, কেবল কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তারল্য সহায়তা দিয়ে অসুস্থ ব্যাংককে কৃত্রিমভাবে বাঁচিয়ে রাখা যাবে না। প্রয়োজন দৃশ্যমান জবাবদিহি।
এখন সময় এসেছে বড় খেলাপিদের বিরুদ্ধে দ্রুত বিচারিক ব্যবস্থা নেওয়ার, বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধারে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার করার এবং ব্যাংক পরিচালনা থেকে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ সম্পূর্ণভাবে অপসারণের। একই সঙ্গে উৎপাদনমুখী শিল্পের জন্য নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ, নীতিগত স্থিতিশীলতা এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।
ব্যাংকিং খাত কোনো দেশের অর্থনীতির হৃদস্পন্দন। সেই হৃদস্পন্দনে যদি আস্থার সংকট দেখা দেয়, তবে তার অভিঘাত শিল্প, কর্মসংস্থান, রপ্তানি এবং সামগ্রিক অর্থনীতিকে অচল করে দিতে পারে। ঋণ কমলেও ব্যাংকে টাকা নেই-এই বাস্তবতা আমাদের সতর্ক করছে যে সংকটের শিকড় অনেক গভীরে। এখনই কঠোর, স্বচ্ছ ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত সংস্কার না হলে আগামী দিনের মূল্য আরো ভয়াবহ হতে পারে।
সানা/আপ্র/৯/৮/২০২৬