বর্ষা এলেই বাংলাদেশে ডেঙ্গুর আশঙ্কা নতুন করে ঘনীভূত হয়। এ বছর পরিস্থিতি এখনো গত বছরের একই সময়ের তুলনায় তুলনামূলক নিয়ন্ত্রিত-৮ আগস্ট পর্যন্ত হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১৮ হাজার ৬৭৩ জন, মৃত্যু হয়েছে ৫৯ জনের। গত বছর একই সময়ে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ২৩ হাজার ৪১০ এবং মৃত্যু ৯৫। কিন্তু এই পরিসংখ্যান স্বস্তির কারণ হতে পারে না। কারণ ডেঙ্গু একটি মৌসুমি রোগ হলেও এর বিস্তার, বিশেষত শিশুদের মধ্যে সংক্রমণ, আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থা ও নাগরিক সচেতনতার দুর্বলতাগুলোকে বারবার সামনে নিয়ে আসে।
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা এক থেকে দুই দিনের জ্বর হলেই ডেঙ্গু পরীক্ষা করানোর পরামর্শ দিয়েছেন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরও একই আহ্বান জানিয়েছে। এই পরামর্শকে নিছক চিকিৎসাবিষয়ক নির্দেশনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; এটি এখন জনস্বাস্থ্য রক্ষার জরুরি কর্মসূচির অংশ হওয়া উচিত। কারণ ডেঙ্গুতে প্রাথমিক পর্যায়ে যথাযথ শনাক্তকরণ ও চিকিৎসা শুরু করা গেলে গুরুতর জটিলতা এবং মৃত্যুঝুঁকি অনেকাংশে কমানো সম্ভব।
বিশেষ উদ্বেগের বিষয়, এ বছর আক্রান্তদের উল্লেখযোগ্য অংশ শিশু। শূন্য থেকে ৩০ বছর বয়সী আক্রান্তের সংখ্যা ১০ হাজার ৮২৭। স্কুলগামী শিশুদের আক্রান্ত হওয়ার প্রবণতা তাই পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং স্থানীয় প্রশাসনের জন্য বিশেষ সতর্কসংকেত। শিশুদের জ্বরকে সাধারণ ভাইরাসজনিত জ্বর ভেবে ঘরে বসে থাকা কিংবা নিজের মতো করে ওষুধ খাওয়ানোর প্রবণতা বিপজ্জনক। প্রয়োজন দ্রুত পরীক্ষা, চিকিৎসকের পরামর্শ এবং নিবিড় পর্যবেক্ষণ।
সরকারের বিনামূল্যে এনএস-১ পরীক্ষা এবং সিএম পরীক্ষার মূল্য ৩০০ টাকা থেকে কমিয়ে ৫০ টাকা নির্ধারণ নিঃসন্দেহে ইতিবাচক উদ্যোগ। কিন্তু পরীক্ষার খরচ কমালেই দায়িত্ব শেষ হয় না। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষ যাতে সহজে পরীক্ষা করাতে পারেন, পরীক্ষার ফল দ্রুত পান এবং শনাক্ত রোগী যেন যথাসময়ে চিকিৎসা পান-সেই ব্যবস্থাও নিশ্চিত করতে হবে। হাসপাতালগুলোতে প্রয়োজনীয় ওষুধ, শয্যা, চিকিৎসা সরঞ্জাম ও প্রশিক্ষিত জনবল প্রস্তুত রাখার পাশাপাশি পরিস্থিতি অবনতির আগেই বিকল্প শয্যা ও পৃথক ডেঙ্গু ওয়ার্ড চালুর পরিকল্পনা থাকা প্রয়োজন।
তবে ডেঙ্গু মোকাবিলার সবচেয়ে কার্যকর পথ হাসপাতালের শয্যা বাড়ানো নয়; এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা। ফুলের টব, ড্রাম, বালতি, পরিত্যক্ত পাত্র, শীতাতপ নিয়ন্ত্রণযন্ত্র ও ফ্রিজের নিচে জমে থাকা সামান্য পানিও এডিস মশার প্রজননক্ষেত্র হতে পারে। ফলে এটি শুধু সিটি করপোরেশন বা স্বাস্থ্য বিভাগের দায়িত্ব-এমন ধারণা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। বাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, নির্মাণাধীন ভবন-সবখানে নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা ও জমে থাকা পানি অপসারণ নিশ্চিত করতে হবে।
ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে তাই বিচ্ছিন্ন অভিযান নয়, প্রয়োজন সমন্বিত, নিয়মিত ও জবাবদিহিমূলক জাতীয় কর্মপরিকল্পনা। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানকে নিয়মিত মশার প্রজননস্থল শনাক্ত ও ধ্বংসের পাশাপাশি তার কার্যকারিতার প্রকাশ্য হিসাব দিতে হবে। স্বাস্থ্য বিভাগকে রোগের প্রবণতা নিয়মিত বিশ্লেষণ করে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে শিশুদের সচেতনতার পাশাপাশি নিজস্ব প্রাঙ্গণকে এডিসমুক্ত রাখতে হবে।
আজকের তুলনামূলক কম আক্রান্তের সংখ্যা আগামীকালের নিশ্চয়তা নয়। ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে সাফল্য পরিমাপ হবে কতজন হাসপাতালে ভর্তি হলেন তা দিয়ে নয়, কতজনকে হাসপাতালে যাওয়ার প্রয়োজন থেকে রক্ষা করা গেল-তা দিয়ে। তাই জ্বরকে অবহেলা নয়, আগাম পরীক্ষা; আতঙ্ক নয়, সচেতনতা; অভিযান নয়, ধারাবাহিক প্রতিরোধ-এই তিন নীতিই হোক ডেঙ্গু মোকাবিলায় বাংলাদেশের অগ্রাধিকার।
সানা/আপ্র/১১/৮/২০২৬