বিশ্ব আজ এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যেখানে মারণাস্ত্রের বিস্তার শান্তির নিশ্চয়তা না দিয়ে বরং সংঘাতের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। যুদ্ধের মূল্য শুধু ধ্বংস হওয়া নগরী বা সামরিক ব্যয়ের হিসাব নয়; এর মূল্য অনাথ শিশু, উদ্বাস্তু মানুষ, বিপর্যস্ত অর্থনীতি এবং হারিয়ে যাওয়া ভবিষ্যৎ। এই বাস্তবতায় জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের মঞ্চে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মারণাস্ত্রের পরিবর্তে যুক্তিতর্ক, কূটনীতি, শিক্ষা ও মানবতাকে পরিবর্তনের হাতিয়ার করার আহ্বান জানিয়েছেন। এ আহ্বানের গুরুত্ব এখানেই যে, এটি যুদ্ধের প্রতিক্রিয়া নয়, যুদ্ধের কারণ ও সংস্কৃতি বদলের প্রয়োজনীয়তার কথা বলে। এখন সেই বক্তব্যকে বাস্তব বৈশ্বিক পদক্ষেপে রূপ দেওয়াই মূল চ্যালেঞ্জ।
রোহিঙ্গা সংকট সেই চ্যালেঞ্জের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। নয় বছরেরও বেশি সময় ধরে ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশ মানবিক দায়িত্ব পালন করছে। কিন্তু মানবিক সহায়তা কোনো সংকটের স্থায়ী সমাধান নয়। সংকটের উৎপত্তি যেখানে, সমাধানের দায়ও মূলত সেখানেই। মিয়ানমারে সহিংসতা বন্ধ, রোহিঙ্গাদের মৌলিক অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত এবং নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের পরিবেশ সৃষ্টি না হলে শিবিরে প্রজন্মের পর প্রজন্ম বেড়ে উঠবে। তাই প্রধানমন্ত্রীর পাঁচ দফা প্রস্তাবের কেন্দ্রীয় দাবি হওয়া উচিত-ত্রাণনির্ভর ব্যবস্থাপনা থেকে প্রত্যাবাসননির্ভর সমাধানে যাওয়া।
এই সংকট দীর্ঘায়িত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আরেকটি বিপদ স্পষ্ট হচ্ছে। মানবিক সহায়তার প্রয়োজন বাড়লেও সহায়তার পরিমাণ কমছে। ২০২৬ সালের জন্য প্রায় ৭১০ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলারের প্রয়োজনের কথা বলা হয়েছে। অর্থের ঘাটতি হলে খাদ্য ও চিকিৎসা সংকটের পাশাপাশি মানবপাচার, মাদকপাচার, অবৈধ অভিবাসন ও আন্তসীমান্ত অপরাধ বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। কক্সবাজারের স্থানীয় জনগোষ্ঠীকেও এর সামাজিক, অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত মূল্য দিতে হচ্ছে। অতএব রোহিঙ্গাদের সহায়তা বাংলাদেশের প্রতি দয়া নয়; এটি আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার স্বার্থেই জরুরি। তবে সহায়তার পাশাপাশি প্রত্যাবাসনের জন্য কার্যকর আন্তর্জাতিক চাপ না থাকলে সেই সহায়তাই দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থাকে টিকিয়ে রাখবে।
জলবায়ু সংকটেও একই ধরনের বৈশ্বিক বৈষম্য দেখা যায়। বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণে বাংলাদেশের অবদান সামান্য হলেও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, লবণাক্ততা, উপকূলীয় ঝুঁকি ও বাস্তুচ্যুতির বড় বোঝা বহন করতে হচ্ছে দেশটিকে। তাই জলবায়ু অর্থায়ন, প্রযুক্তি হস্তান্তর, আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা এবং ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাংলাদেশের ন্যায্য দাবি। জলবায়ু ঝুঁকির দায় যার যত বেশি, দায়িত্বও তার তত বেশি-বৈশ্বিক জলবায়ু নীতির ভিত্তি হওয়া উচিত এই ন্যায়বোধ।
তবে আন্তর্জাতিক দায়ের কথা বললেই বাংলাদেশের নিজের দায় শেষ হয় না। ২৫ কোটি গাছ লাগানো, প্রায় ২০ হাজার কিলোমিটার নদী ও খাল খনন, পানি সংরক্ষণ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি বাড়ানো এবং তিস্তা ও পদ্মা ঘিরে বৃহৎ উদ্যোগ-এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়নে চাই বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনা, পরিবেশগত মূল্যায়ন, স্বচ্ছতা ও কঠোর জবাবদিহি। বড় প্রকল্পের বড় ঘোষণা নয়, প্রকৃত ফলাফলই হতে হবে সাফল্যের মাপকাঠি।
একই কথা প্রযোজ্য শিক্ষা, নারী ও তরুণের ক্ষমতায়ন, কর্মসংস্থান, প্রযুক্তির ন্যায্য প্রবেশাধিকার এবং অর্থনীতির গণতন্ত্রায়নের ক্ষেত্রেও। নীতির সাফল্য বক্তৃতায় নয়, সাধারণ মানুষের জীবনে তার দৃশ্যমান সুফলে।
জাতিসংঘে বাংলাদেশের বক্তব্য তাই শুধু কূটনৈতিক বার্তা নয়; এটি বিশ্ব ও বাংলাদেশের জন্যই একটি দায়িত্বের অঙ্গীকার। বিশ্বকে যুদ্ধের পেছনে সম্পদ ব্যয়ের বদলে মানুষের নিরাপত্তা ও ভবিষ্যতে বিনিয়োগ করতে হবে। বাংলাদেশকেও দেখাতে হবে, বিশ্বমঞ্চে উচ্চারিত প্রতিশ্রুতি দেশের মাটিতে বাস্তব কর্মসূচি ও জবাবদিহিতে রূপান্তরিত হচ্ছে।
শান্তির ভাষণ তখনই শক্তিশালী, যখন তা যুদ্ধ থামানোর উদ্যোগ সৃষ্টি করে; মানবিকতার কথা তখনই অর্থবহ, যখন তা মানুষের দুর্ভোগ কমায়। এখন তাই ভাষণের পরের অধ্যায় শুরু করার সময়-কথায় নয়, কার্যকর পদক্ষেপে।
সানা/আপ্র/২৬/৯/২০২৬