গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
মঙ্গলবার, ০৯ জুন ২০২৬

মেনু

দ্রুত বিচার থেকে প্রাতিষ্ঠানিক ন্যায়বিচারের পথে শুরু হোক নবযাত্রা

সুখদেব কুমার সানা

সুখদেব কুমার সানা

প্রকাশিত: ০৩:১৬ পিএম, ০৯ জুন ২০২৬ | আপডেট: ০৪:২১ এএম ২০২৬
দ্রুত বিচার থেকে প্রাতিষ্ঠানিক ন্যায়বিচারের পথে শুরু হোক নবযাত্রা
ছবি

মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত দম্পতি সোহেল রানা ও স্বপ্না আক্তার -ফাইল ছবি

রাজধানীর পল্লবীতে আট বছরের শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণ ও নির্মম হত্যার ঘটনায় আদালতের রায় জাতিকে যেমন স্বস্তি দিয়েছে, তেমনি রাষ্ট্রীয় বিচারব্যবস্থার সক্ষমতা সম্পর্কেও এক গুরুত্বপূর্ণ বার্তা পৌঁছে দিয়েছে। মাত্র বিশ দিনের মধ্যে তদন্ত, অভিযোগপত্র, সাক্ষ্যগ্রহণ, যুক্তিতর্ক এবং রায়-সমগ্র বিচারিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়া দেশের ইতিহাসে একটি বিরল ঘটনা। এ রায় নিঃসন্দেহে প্রমাণ করেছে, রাষ্ট্র চাইলে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় দ্রুত, সমন্বিত ও কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা সম্ভব। তবে এই অর্জনের প্রকৃত তাৎপর্য কেবল একটি মামলার দ্রুত নিষ্পত্তিতে নয়; বরং এটি বিচারব্যবস্থার ভবিষ্যৎ রূপান্তরের একটি সম্ভাব্য সূচনা কি না, সেই প্রশ্নেই এর মূল্যায়ন নিহিত।
রামিসার ওপর সংঘটিত অপরাধ ছিল শুধু একটি শিশুর বিরুদ্ধে নৃশংস সহিংসতা নয়; এটি ছিল মানবতা, বিবেক ও সামাজিক নিরাপত্তাবোধের ওপর এক ভয়াবহ আঘাত। এমন একটি ঘটনায় দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তি জনমনের ন্যায়বোধকে কিছুটা হলেও প্রশমিত করেছে। কিন্তু একটি সভ্য রাষ্ট্রে বিচারব্যবস্থার সাফল্য কখনোই কেবল শাস্তির মাত্রা দিয়ে পরিমাপ করা হয় না; বরং বিচার কতটা দ্রুত, নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ, প্রমাণনির্ভর এবং সবার জন্য সমানভাবে প্রাপ্য, সেটিই প্রকৃত মানদণ্ড।
এই মামলায় আদালত, তদন্তকারী সংস্থা, প্রসিকিউশন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বিত তৎপরতা প্রশংসার দাবিদার। একই সঙ্গে এটি এমন একটি বাস্তবতাও সামনে নিয়ে এসেছে, যা আমাদের গভীরভাবে ভাবতে বাধ্য করে। যদি একটি জঘন্য অপরাধের বিচার এত অল্প সময়ে সম্পন্ন করা সম্ভব হয়, তবে বছরের পর বছর ধরে ঝুলে থাকা হাজারো নারী ও শিশু নির্যাতন, হত্যা, ধর্ষণ কিংবা অন্যান্য গুরুতর অপরাধের মামলার ক্ষেত্রে একই ধরনের দক্ষতা, অগ্রাধিকার এবং সমন্বয় কেন নিশ্চিত করা যাবে না?
আদালতের পর্যবেক্ষণেই উঠে এসেছে যে-শিশু ও নারী নির্যাতন-সংক্রান্ত বিপুলসংখ্যক মামলা এখনো বিচারাধীন। প্রতিটি মামলার পেছনে রয়েছে কোনো না কোনো রামিসার কান্না, কোনো পরিবারের দীর্ঘ প্রতীক্ষা এবং ন্যায়বিচারের জন্য অনিশ্চিত অপেক্ষা। ফলে রামিসা হত্যা মামলার দ্রুত বিচার যদি কেবল জনমতের চাপ কিংবা বিশেষ গুরুত্ব পাওয়া কয়েকটি ঘটনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে এর প্রাতিষ্ঠানিক মূল্য অনেকাংশেই হারিয়ে যাবে। রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো এই অভিজ্ঞতাকে একটি টেকসই বিচারিক সংস্কারে রূপ দেওয়া।
এখানেই নীতিনির্ধারণের প্রশ্নটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। বিচারব্যবস্থার গতি বাড়াতে তদন্ত সক্ষমতা উন্নয়ন, প্রসিকিউশন কাঠামোর আধুনিকায়ন, বিচারকসংখ্যা বৃদ্ধি, প্রযুক্তিনির্ভর মামলা ব্যবস্থাপনা এবং সাক্ষী সুরক্ষাব্যবস্থাকে আরো কার্যকর করতে হবে। একই সঙ্গে নিশ্চিত করতে হবে যে-দ্রুততার নামে কোনোভাবেই ন্যায়বিচারের মৌলিক নীতি যেন ক্ষুণ্ন না হয়। কারণ বিচার দ্রুত হওয়া যেমন প্রয়োজন, তেমনি তা হতে হবে নির্ভুল, নিরপেক্ষ এবং আইনি প্রক্রিয়ার প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধাশীল।
আরো একটি বিষয় বিশেষভাবে মনে রাখা জরুরি। অপরাধ সংঘটনের পর বিচার রাষ্ট্রের দায়িত্বের একটি অংশ মাত্র; এর চেয়ে বড় দায়িত্ব হলো অপরাধ প্রতিরোধ। শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্থানীয় সম্প্রদায়, প্রশাসন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মধ্যে সমন্বিত সুরক্ষা বলয় গড়ে তুলতে হবে। যৌন সহিংসতা ও শিশু নির্যাতনের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ এবং নৈতিক সচেতনতা ছাড়া কেবল দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিয়ে কাক্সিক্ষত পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়।
রামিসা আর ফিরে আসবে না। তার শূন্যতা কোনো রায় পূরণ করতে পারবে না। কিন্তু এই বিচার যদি বিচারব্যবস্থার গতি, দক্ষতা ও জবাবদিহির ক্ষেত্রে একটি নতুন মানদণ্ড প্রতিষ্ঠা করে; যদি এটি বিচারপ্রার্থীদের দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটানোর রাষ্ট্রীয় অঙ্গীকারে পরিণত হয়; যদি এটি প্রতিটি ভুক্তভোগীর জন্য সমান ও সময়োপযোগী ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার সংস্কারযাত্রার সূচনা করে-তবেই রামিসার জন্য পাওয়া ন্যায়বিচার সত্যিকার অর্থে জাতির জন্য এক ঐতিহাসিক অর্জন হয়ে উঠবে। দ্রুত বিচার থেকে প্রাতিষ্ঠানিক ন্যায়বিচারের পথে সেই নবযাত্রাই আজ সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। 
সানা/আপ্র/৯/৬/২০২৬

 

 

সংশ্লিষ্ট খবর

সীমান্তে মানবিকতা ও সার্বভৌমত্বের পরীক্ষা
০৮ জুন ২০২৬

সীমান্তে মানবিকতা ও সার্বভৌমত্বের পরীক্ষা

বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে সাম্প্রতিক সময়ে একের পর এক ‘পুশইন’ প্রচেষ্টা শুধু সীমান্ত ব্যবস্থাপনার প্রশ্ন...

খাদ্য যখন আতঙ্কের নাম, রাষ্ট্র তখন নীরব থাকতে পারে না
০৭ জুন ২০২৬

খাদ্য যখন আতঙ্কের নাম, রাষ্ট্র তখন নীরব থাকতে পারে না

একটি সভ্য রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় পরিচয় তার নাগরিকের নিরাপত্তা। সেই নিরাপত্তা কেবল সীমান্ত, আইনশৃঙ্খলা ব...

বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি ও অর্থনীতির সতর্কবার্তা
০৬ জুন ২০২৬

বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি ও অর্থনীতির সতর্কবার্তা

বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি শুধু একটি সেবার মূল্য সমন্বয়ের ঘটনা নয়; এটি দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি, জনজীবন এব...

স্বাধীন সাংবাদিকতার পথেই গণতন্ত্র ও কল্যাণ রাষ্ট্রের অগ্রযাত্রা
০৪ জুন ২০২৬

স্বাধীন সাংবাদিকতার পথেই গণতন্ত্র ও কল্যাণ রাষ্ট্রের অগ্রযাত্রা

একটি রাষ্ট্র কতটা গণতান্ত্রিক, কতটা জবাবদিহিমূলক এবং কতটা জনকল্যাণমুখী-তার অন্যতম নির্ভরযোগ্য মানদণ্...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

কোনো সক্রিয় জরিপ নেই