খুলনার পাইকগাছায় সম্প্রতি পিকনিকের জন্য রান্না করা গরুর মাংস হঠাৎ সবুজাভ রং ধারণ করার ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে। ঘটনাটি নিয়ে নানা ধরনের গুজবও ছড়িয়ে পড়ে। কেউ রাসায়নিক মেশানোর অভিযোগ তুলেছেন, আবার কেউ একে বিষাক্ত বা নষ্ট মাংসের লক্ষণ বলে দাবি করেছেন। তবে খাদ্যবিজ্ঞানীরা বলছেন, শুধু রং পরিবর্তন দেখেই কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো বৈজ্ঞানিকভাবে সঠিক নয়। অনেক ক্ষেত্রেই এটি স্বাভাবিক রাসায়নিক বা ভৌত পরিবর্তনের ফল হতে পারে, আবার কখনও এটি খাদ্য নষ্ট হওয়ারও ইঙ্গিত হতে পারে। প্রকৃত কারণ জানতে পরীক্ষাগারের বিশ্লেষণই একমাত্র নির্ভরযোগ্য উপায়।
মাংসের রং বদলায় কেন?
বিশেষজ্ঞদের মতে, মাংসের রং মূলত নির্ভর করে মায়োগ্লোবিন নামের একটি প্রোটিনের ওপর। প্রাণীর পেশিতে অক্সিজেন সঞ্চয়কারী এই রঞ্জকই কাঁচা মাংসকে লালচে রং দেয়।
রান্নার সময় তাপ, অক্সিজেন, আর্দ্রতা, ধাতব পাত্রের সংস্পর্শ কিংবা বিভিন্ন রাসায়নিক বিক্রিয়ার কারণে মায়োগ্লোবিনের গঠন পরিবর্তিত হতে পারে। তখন লাল মাংস বাদামি, ধূসর কিংবা বিশেষ পরিস্থিতিতে সবুজাভ আভা ধারণ করতে পারে।
খাদ্যবিজ্ঞানীদের ভাষায়, এটি অনেক সময় স্বাভাবিক রঙের পরিবর্তন, যা সব সময় স্বাস্থ্যঝুঁকির নির্দেশক নয়।
ইরিডেসেন্স: রংধনুর মতো ঝিলমিল কেন?
যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগ, সেন্টার ফর ফুড সেফটি এবং বিভিন্ন খাদ্য গবেষণা প্রতিষ্ঠানের তথ্য অনুযায়ী, অনেক সময় রোস্ট বিফ, হ্যাম বা পাতলা করে কাটা গরুর মাংসে সবুজ, নীলচে কিংবা বেগুনি ঝিলমিল রং দেখা যায়। একে বলা হয় ইরিডেসেন্স।
এটি মূলত আলোর প্রতিফলনের একটি ভৌত ঘটনা। মাংসের পেশির সূক্ষ্ম তন্তু নির্দিষ্ট কোণে আলো প্রতিফলিত করলে এমন বর্ণচ্ছটা তৈরি হয়। এটি কোনো কৃত্রিম রং বা রাসায়নিক মেশানোর প্রমাণ নয়।
সবুজ মানেই কি মাংস নষ্ট?
বিশেষজ্ঞদের মতে, না।
শুধু সবুজ রং দেখেই মাংসকে নষ্ট বা বিষাক্ত বলা যায় না।
যদি—
* মাংসের স্বাভাবিক গন্ধ থাকে,
* পিচ্ছিল বা চটচটে না হয়,
* সঠিক তাপমাত্রায় সংরক্ষণ করা হয়ে থাকে,
* মেয়াদোত্তীর্ণ না হয়,
তাহলে কেবল রং পরিবর্তনের কারণে সেটিকে অনিরাপদ বলা ঠিক হবে না।
কখন সতর্ক হবেন?
তবে সবুজ রংয়ের আরেকটি কারণ হতে পারে ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাক বা অন্যান্য অণুজীবের সংক্রমণ।
বিশেষ করে পসুডোমোনাস প্রজাতির কিছু ব্যাকটেরিয়া মাংসের ওপর সবুজাভ রঞ্জক তৈরি করতে পারে। এ ধরনের সংক্রমণ হলে সাধারণত আরও কিছু লক্ষণ দেখা যায়—
* তীব্র দুর্গন্ধ,
* পিচ্ছিল বা আঠালো ভাব,
* ধূসর বা কালচে দাগ,
* ছত্রাকের মতো আবরণ,
* দীর্ঘ সময় অনুপযুক্ত তাপমাত্রায় সংরক্ষণের ইতিহাস।
এসব লক্ষণ থাকলে সেই মাংস খাওয়া উচিত নয়।
রান্না হয়েছে কি না বুঝবেন কীভাবে?
অনেকেই মনে করেন, মাংস পুরো বাদামি হলেই তা নিরাপদ। কিন্তু খাদ্যবিজ্ঞানীরা বলছেন, এটি সব সময় সত্য নয়।
কখনো মাংস পুরো সেদ্ধ হওয়ার আগেই বাদামি হয়ে যেতে পারে, আবার নিরাপদ তাপমাত্রায় রান্না হওয়ার পরও কিছুটা গোলাপি আভা থেকে যেতে পারে।
খাদ্য নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, নিরাপদভাবে রান্না হয়েছে কি না তা বোঝার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য উপায় হলো অভ্যন্তরীণ তাপমাত্রা পরিমাপ করা। আন্তর্জাতিক নির্দেশনা অনুযায়ী, কিমা বা গরুর মাংসের অভ্যন্তরীণ তাপমাত্রা কমপক্ষে **৭১ ডিগ্রি সেলসিয়াস** পৌঁছালে সেটি নিরাপদ হিসেবে বিবেচিত হয়।
খুলনার ঘটনায় কী জানা গেছে?
খুলনার পাইকগাছায় রান্নার সময় সবুজ হয়ে যাওয়া গরুর মাংসের ঘটনায় স্থানীয়রা রান্নার কড়াইসহ উপজেলা প্রশাসন ও থানায় যান। ঘটনাটির ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে।
তবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হাতে প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত কোনো পরীক্ষাগারের ফলাফল প্রকাশ হয়নি। ফলে এটি স্বাভাবিক রাসায়নিক পরিবর্তনের কারণে হয়েছে, নাকি সংরক্ষণজনিত ত্রুটি, ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ অথবা অন্য কোনো কারণে হয়েছে—তা নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ
খাদ্য নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত ভিডিও বা ছবি দেখে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো উচিত নয়।
মাংসে অস্বাভাবিক রং দেখা গেলে প্রথমে গন্ধ, স্পর্শ, সংরক্ষণের অবস্থা এবং মেয়াদ যাচাই করতে হবে। সন্দেহ থাকলে সেটি পরীক্ষাগারে পরীক্ষা করানোই সবচেয়ে নিরাপদ ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি।
আতঙ্ক নয়, প্রয়োজন সচেতনতা
মাংসের রং পরিবর্তন সব সময় বিষাক্ত বা ভেজালের প্রমাণ নয়। আবার এটিকে সম্পূর্ণ স্বাভাবিক বলেও উড়িয়ে দেওয়া ঠিক হবে না। কারণ, একই ধরনের বাহ্যিক লক্ষণের পেছনে ভিন্ন ভিন্ন কারণ থাকতে পারে।
তাই অস্বাভাবিক রং দেখা দিলে আতঙ্কিত না হয়ে বৈজ্ঞানিক যাচাইয়ের ওপর নির্ভর করাই সবচেয়ে যুক্তিযুক্ত। খাদ্য নিরাপত্তার ক্ষেত্রে গুজব নয়, পরীক্ষাগারের ফলাফলই হওয়া উচিত চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ভিত্তি।
তথ্যসূত্র: সেন্টার ফর ফুড সেফটি, যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগ (ইউএসডিএ), বিফ রিসার্চ, আমেরিকাস টেস্ট কিচেন, অজি মিট এবং প্রথম আলোর প্রতিবেদন।
সানা/আপ্র/২৪/৭/২০২৬