ছয় দশকের বেশি সময় ধরে সংগীতাঙ্গনে রাজত্ব করা কিংবদন্তি কণ্ঠশিল্পী রুনা লায়লা বলেছেন, দীর্ঘ ক্যারিয়ারে তাকে একাধিক কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছে। এমনকি তিনবার তাকে বয়কটের মুখেও পড়তে হয়েছে। তবে আত্মবিশ্বাস, নিজের যোগ্যতা এবং শ্রোতাদের ভালোবাসার শক্তিতে তিনি সব বাধা অতিক্রম করেছেন।
সম্প্রতি বাংলা ট্রিবিউনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে নিজের দীর্ঘ সংগীতজীবন, বর্তমান সময়ের গান, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং ক্যারিয়ারের নানা অজানা অধ্যায় নিয়ে খোলামেলা কথা বলেছেন উপমহাদেশের অন্যতম জনপ্রিয় এই শিল্পী।
বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতে আয়োজিত একক সংগীতানুষ্ঠানকে ঘিরে রুনা লায়লা নিজের অনুভূতি প্রকাশ করেছেন। ছয় দশকের সংগীতজীবনে এই প্রথম শিল্পকলার মঞ্চে একক পরিবেশনায় অংশ নেওয়ার বিষয়টিকে তিনি বিশেষ অভিজ্ঞতা হিসেবে উল্লেখ করেন।
সাক্ষাৎকারে নিজের সংগ্রামের দিনগুলোর কথা স্মরণ করে রুনা লায়লা বলেন, “আমাকে বিভিন্ন সময়ে তিনবার বয়কট করা হয়েছে। সেই সময়গুলো আমার জন্য কঠিন ছিল। কিন্তু আমার আত্মবিশ্বাস, যোগ্যতা এবং শ্রোতাদের ভালোবাসায় সবকিছু পেরিয়ে এসেছি।”
তিনি মনে করেন, একজন শিল্পীর সবচেয়ে বড় শক্তি হলো নিজের প্রতিভার ওপর বিশ্বাস রাখা এবং মানুষের ভালোবাসা অর্জন করা।
প্রযুক্তি নয়, গানে আবেগই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ
বর্তমান সংগীতে প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়ে নিজের অবস্থানও স্পষ্ট করেছেন রুনা লায়লা। তার মতে, প্রযুক্তি গানকে সমৃদ্ধ করতে পারে, কিন্তু আবেগ তৈরি করতে পারে না।
তিনি বলেন, বর্তমানে অনেক শিল্পী অটো-টিউনের ওপর নির্ভর করেন। তবে তিনি নিজে এ ধরনের প্রযুক্তিগত সংশোধনের ব্যবহার করেন না। তার মতে, গান শুধু সুর ও শব্দের সমন্বয় নয়, এর সঙ্গে শিল্পীর অনুভূতি ও আত্মার সম্পর্ক রয়েছে।
রুনা লায়লা স্মৃতিচারণ করে বলেন, তাদের সময়ে সরাসরি যন্ত্রশিল্পীদের সঙ্গে লাইভ রেকর্ডিংয়ের মাধ্যমে গান তৈরি হতো। এখন অনেক ক্ষেত্রে এক লাইন, দুই লাইন করে গান রেকর্ড করার প্রবণতা দেখা যায়, এতে গানের মূল আবেগ অনেক সময় হারিয়ে যায়।
নতুনদের জন্য চর্চার পরামর্শ
নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের উদ্দেশে এই বরেণ্য শিল্পী বলেছেন, সংগীতে টিকে থাকার জন্য চর্চার কোনো বিকল্প নেই। নিয়মিত অনুশীলন ও সাধনার মাধ্যমেই একজন শিল্পী নিজের অবস্থান তৈরি করতে পারেন।
প্লেব্যাক সংগীতের বর্তমান ধারা নিয়েও তিনি বলেন, আগের সময়ে শিল্পীরা সিনেমার গল্প, দৃশ্য এবং চরিত্র সম্পর্কে ধারণা নিয়েই গান করতেন। ফলে গানের সঙ্গে পর্দার আবেগের একটি গভীর সম্পর্ক তৈরি হতো। এখন অনেক ক্ষেত্রে সেই সমন্বয়ের ঘাটতি দেখা যায়।
‘মাস্ত কালান্দার’ নিয়ে আলাদা আবেগ
নিজের প্রায় ১০ হাজার গানের ভাণ্ডারের মধ্য থেকে ‘মাস্ত কালান্দার’ গানটির প্রতি বিশেষ ভালো লাগার কথা জানিয়েছেন রুনা লায়লা। তার ভাষায়, গানটি গাওয়ার সময় তিনি নিজেই অন্যরকম এক অনুভূতির মধ্যে চলে যান।
দেশ-বিদেশের শ্রোতাদের এই গানের প্রতি ভালোবাসার স্মৃতিও তুলে ধরেন তিনি। তার মতে, একজন শিল্পীর জন্য শ্রোতাদের ভালোবাসাই সবচেয়ে বড় অর্জন।
দেশের মানুষের ভালোবাসাই শক্তি
বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তান—তিন দেশের শ্রোতাদের ভালোবাসা প্রসঙ্গে রুনা লায়লা বলেন, ভালোবাসার কোনো আলাদা ভাগ নেই। একজন শিল্পীর কাছে সব শ্রোতাই সমান গুরুত্বপূর্ণ।
দীর্ঘ ৬২ বছরের সংগীতযাত্রায় এখনো নতুনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার চেষ্টা করছেন জানিয়ে তিনি বলেন, সময়ের পরিবর্তনকে গ্রহণ করতে হয়। সম্প্রতি নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের সঙ্গেও কাজ করেছেন তিনি।
সংগীতের কিংবদন্তি এই শিল্পীর ভাষ্য, পরিবর্তনের সঙ্গে এগিয়ে যেতে হবে, তবে গানের প্রাণ—আবেগ, সাধনা ও ভালোবাসা—কখনো হারানো যাবে না। সূত্র: বাংলা ট্রিবিউনের সাক্ষাৎকার অবলম্বনে
সানা/আপ্র/২৪/৭/২০২৬