রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগ নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে জল্পনা-কল্পনা তীব্র হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে এখন সবার নজর বঙ্গভবনের দিকে। এদিকে চিকিৎসার জন্য থাইল্যান্ডে থাকা জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ নির্ধারিত সময়ের আগেই দেশে ফিরছেন। তবে রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের বিষয়ে এখনো পর্যন্ত বঙ্গভবন বা সরকারের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হয়নি।
বঙ্গভবন-সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের বরাতে জানা গেছে, রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন পদত্যাগের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তবে সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে স্পিকারের কাছে পদত্যাগপত্র দেওয়ার বিষয়টি তাঁর দেশে ফেরার সঙ্গে সমন্বয় করে এগোনো হতে পারে।
রাষ্ট্রপতির প্রেস সচিব মো. সরওয়ার আলম জানিয়েছেন, রাষ্ট্রপতি এখনো পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর করেননি। তিনি বলেন, পদত্যাগ করলে বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হবে।
এদিকে সংসদ সচিবালয় সূত্র জানিয়েছে, চিকিৎসার জন্য গত ১৯ জুলাই থাইল্যান্ডের ব্যাংককে গিয়েছিলেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ। পূর্বনির্ধারিত সূচি অনুযায়ী তাঁর ২৬ জুলাই দেশে ফেরার কথা ছিল। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে সফর সংক্ষিপ্ত করে শুক্রবার (২৪ জুলাই) দুপুরে দেশে ফেরার কথা রয়েছে তাঁর।
সংসদ সচিবালয়ের একটি সূত্র জানিয়েছে, দ্রুত দেশে ফেরার অনুরোধ পাওয়ার পর স্পিকার সফর সংক্ষিপ্ত করার সিদ্ধান্ত নেন। তবে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো কারণ জানানো হয়নি।
সংবিধান অনুযায়ী যা হবে
বাংলাদেশের সংবিধানের ৫০(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি স্পিকারের উদ্দেশে স্বাক্ষরযুক্ত পত্র পাঠিয়ে পদত্যাগ করতে পারেন। রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে সংবিধানের ৫৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত স্পিকার রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন।
এ ছাড়া সংবিধানের ১২৩(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, মৃত্যু, পদত্যাগ বা অপসারণের কারণে রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে ৯০ দিনের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করতে হবে। সংবিধানের ৪৮(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সংসদ সদস্যদের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন।
পদত্যাগের আলোচনা কেন
রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল পাঁচ বছরের জন্য রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতেও তিনি রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্ব পালন করে আসছেন।
ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর সংসদ বিলুপ্তির আদেশ দেওয়া, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসসহ উপদেষ্টাদের শপথ পড়ানো এবং পরবর্তী সাংবিধানিক কার্যক্রম সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতি গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক ভূমিকা পালন করেন।
তবে পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় তাঁর অবস্থান নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনা তৈরি হয়। গত বছরের অক্টোবরে কয়েকটি সংগঠন তাঁর পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলনও করেছিল। তখন রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক সংকটের আশঙ্কায় বিষয়টি আর এগোয়নি।
এর আগে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন দায়িত্ব ছাড়ার আগ্রহের কথা জানিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, নতুন সরকার এলে অনুরোধ করা হলে তিনি সরে যেতে পারেন।
স্বাস্থ্যগত বিষয়ও আলোচনায়
রাষ্ট্রপতির শারীরিক অবস্থার বিষয়টিও বিভিন্ন সময়ে আলোচনায় এসেছে। গত মে মাসে স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও চিকিৎসার জন্য তিনি যুক্তরাজ্যে যান। সেখানে হৃদযন্ত্রের চিকিৎসা শেষে দেশে ফেরেন তিনি। বঙ্গভবনের পক্ষ থেকে তখন তাঁর শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল ও সন্তোষজনক বলে জানানো হয়েছিল।
সরকারের বক্তব্য
রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সাংবাদিকদের বলেছেন, রাষ্ট্রপতি সাংবিধানিকভাবে পদত্যাগ করতে চাইলে সে সুযোগ রয়েছে। তবে এ বিষয়ে সরকারের কোনো উদ্যোগ নেই।
স্বাস্থ্যগত কারণেই রাষ্ট্রপতি পদত্যাগ করছেন কি না—এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বিষয়টি রাষ্ট্রপতির কাছ থেকেই জানা যাবে।
সব মিলিয়ে রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের আলোচনা এখনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণায় রূপ নেয়নি। তবে স্পিকারের দেশে ফেরার পর বিষয়টি কোন দিকে যায়, তা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে গভীর আগ্রহ তৈরি হয়েছে।
সানা/আপ্র/২৩/৭/২০২৬