সম্প্রতি দেশে হামে আক্রান্ত হয়ে আরো ছয় শিশুর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে এই রোগে মৃত্যুর মোট সংখ্যা আটশ অতিক্রম করেছে। একটি প্রতিরোধযোগ্য রোগে এত প্রাণহানি কোনো সাধারণ পরিসংখ্যান নয়, বরং এক মর্মান্তিক ও উদ্বেগের বার্তা। যেসব রোগ প্রতিষেধক টিকার মাধ্যমে শতভাগ প্রতিরোধযোগ্য, ওই হামের কারণে একটি দেশে এত শিশুর অকালমৃত্যু চরম হতাশাজনক। চিকিৎসা বিজ্ঞানের আধুনিক যুগে এসেও যে শিশুদের আমরা একটি টিকা দিয়ে বাঁচিয়ে রাখতে পারছি না, তা আমাদের স্বাস্থ্য খাতের গুরুতর অব্যবস্থাপনা ও টিকাদান কর্মসূচির চরম সমন্বয়হীনতাকেই নগ্নভাবে প্রকাশ করে। এই ট্র্যাজেডি আর উপেক্ষা করার মতো জায়গায় নেই; এর পেছনের কারণগুলো এখন কঠোরভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। হাম অত্যন্ত সংক্রামক একটি রোগ হলেও সঠিক সময়ে নিয়মিত টিকাদান নিশ্চিত করতে পারলে এর প্রাদুর্ভাব সহজেই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। কিন্তু মৃত্যুর এই ভয়াবহ ঊর্ধ্বগতি নির্দেশ করে যে, দেশের একটি বড় অংশের শিশু নির্ধারিত টিকা গ্রহণ থেকে বঞ্চিত রয়ে গেছে।
বলার অপেক্ষা রাখে না, হাম একটি অত্যন্ত ছোঁয়াচে হলেও শতভাগ প্রতিরোধযোগ্য ভাইরাসজনিত রোগ। প্রান্তিক ও দূরবর্তী অঞ্চলে টিকাদান কর্মসূচির পরিধি পৌঁছাতে না পারা, টিকাদানের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে সচেতনতার অভাব এবং মাঝে মধ্যে টিকার সরবরাহ ঘাটতি সংকটকে আরো ঘনীভূত করেছে। এ ছাড়া কুসংস্কার ও গুজবের কারণে অনেক অভিভাবক সন্তানদের সময়মতো টিকা দিতে অনাগ্রহ দেখাচ্ছেন- যার খেসারত দিতে হচ্ছে নিষ্পাপ শিশুদের প্রাণ দিয়ে। শুধু টিকাদানের অভাবই নয়, শিশুদের অপুষ্টির উচ্চ হার ও চিকিৎসাকেন্দ্রে পৌঁছাতে দেরি হওয়াও এই মৃত্যুমিছিলের অন্যতম কারণ। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকায় অপুষ্টিতে ভোগা শিশুরা হামের জটিলতায় সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে। এই সংকট কাটাতে অবিলম্বে একটি সমন্বিত ও জরুরি কৌশল গ্রহণ করা প্রয়োজন। স্বাস্থ্য বিভাগকে দ্রুত একটি বিশেষ ‘ক্র্যাশ প্রোগ্রাম’ চালু করে বাদ পড়া সব শিশুকে জরুরি ভিত্তিতে টিকাদানের আওতায় আনতে হবে। একইসঙ্গে প্রত্যন্ত অঞ্চলে মোবাইল ক্লিনিক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের তৎপরতা বাড়াতে হবে, যাতে কোনো শিশুই টিকার বাইরে না থাকে।
বলা বাহুল্য, রুটিন টিকাদানের গতি ফেরাতে সময়োপযোগী ও কার্যকর পদক্ষেপের অভাব ছিল স্পষ্ট। টিকাদানের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের মিথ্যা আশ্বাসের আড়ালে যে কত শিশু ঝুঁকির মুখে রয়ে গেছে, প্রতিদিনের ওই মৃত্যুসংবাদই এর প্রত্যক্ষ প্রমাণ। হামে একটি শিশুর মৃত্যুও আমাদের সামগ্রিক জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার জন্য একটি বড় বার্তা। মৃত্যুর সংখ্যা আটশ’ ছাড়িয়ে যাওয়ার পর আর ঢিলেঢালা বা চেনা ছকের পদক্ষেপ মেনে নেওয়ার সুযোগ নেই। প্রচার অভিযান জোরদার করে অভিভাবকদের সচেতন করা এবং টিকাদানকেন্দ্রে পর্যাপ্ত টিকার সরবরাহ নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। রাষ্ট্র ও স্বাস্থ্য প্রশাসনের প্রাথমিক দায়িত্ব হলো দেশের প্রতিটা শিশুর সুস্থভাবে বেঁচে থাকার অধিকার নিশ্চিত করা। ব্যর্থতার এই বৃত্ত ভেঙে এখনই কার্যকর ও কঠোর পদক্ষেপ না নিলে আগামী দিনে এই প্রতিরোধযোগ্য রোগের থাবায় আররা বহু প্রাণ ঝরে যাবে- যা একটি সচেতন সমাজের জন্য অত্যন্ত লজ্জাজনক। তাই আমাদের প্রত্যাশা, হামে শিশুমৃত্যু রোধে দ্রুত ও কার্যকর ব্যবস্থা নেবে সরকার।
কেএমএএ/আপ্র/২৪.০৭.২০২৬