গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
বুধবার, ০৩ জুন ২০২৬

মেনু

কিশোর গ্যাংয়ের আধিপত্যে রক্তাক্ত মোহাম্মদপুর

রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের কঠিন পরীক্ষা

সুখদেব কুমার সানা

সুখদেব কুমার সানা

প্রকাশিত: ১৬:৫৯ পিএম, ১৮ এপ্রিল ২০২৬ | আপডেট: ০৩:৩২ এএম ২০২৬
রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের কঠিন পরীক্ষা
ছবি

মোহাম্মদপুরে কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার এখন একটি সুসংগঠিত অপরাধ কাঠামো -ফাইল ছবি

রাজধানীর মোহাম্মদপুর আজ এক গভীর অস্বস্তিকর বাস্তবতার প্রতীক-যেখানে সহিংসতা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং প্রতিদিনের জীবনের অনিবার্য অংশে পরিণত হয়েছে। ধারাবাহিক হত্যাকাণ্ড, প্রকাশ্য অস্ত্রের মহড়া, কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য এবং মাদকনির্ভর অপরাধ অর্থনীতির বিস্তার এই অঞ্চলকে কার্যত এক অঘোষিত সন্ত্রাস-নিয়ন্ত্রিত জনপদে রূপান্তর করেছে। এই পরিস্থিতি কেবল আইনশৃঙ্খলার অবনতিই নয়; এটি রাষ্ট্রের কার্যকারিতা, সামাজিক কাঠামো এবং নৈতিক ভিত্তির ওপর এক কঠিন প্রশ্ন।

মোহাম্মদপুরে কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার এখন একটি সুসংগঠিত অপরাধ কাঠামো। এসব গোষ্ঠী আর বিচ্ছিন্ন বা স্বতঃস্ফূর্ত নয়; তারা নেতৃত্ব, নিয়ন্ত্রণ ও অর্থনৈতিক স্বার্থের ভিত্তিতে পরিচালিত। আধিপত্য বিস্তারের নামে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডগুলো দেখিয়ে দেয়-সহিংসতা এখানে ক্ষমতা প্রতিষ্ঠার ভাষায় পরিণত হয়েছে। এক গ্যাং দুর্বল হলে আরেকটি নতুন নামে আবির্ভূত হয়, ফলে অপরাধের এই চক্র ভাঙা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।

এই সহিংসতার কেন্দ্রে রয়েছে মাদকভিত্তিক অর্থনীতি, যা কিশোরদের অপরাধে টেনে আনার প্রধান হাতিয়ার। সহজ অর্থ, দ্রুত প্রভাব এবং সামাজিক পরিচিতির মোহে তারা জড়িয়ে পড়ছে অন্ধকার জগতে, যেখানে মানবজীবনের মূল্য ক্রমেই অবজ্ঞাত। প্রকাশ্য রাস্তায় মাদক বেচাকেনা, এর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সংঘর্ষ এবং প্রতিশোধপরায়ণতার ধারাবাহিকতা পুরো এলাকাকে চরম অনিরাপদ পরিবেশে ঠেলে দিয়েছে।

তবে এই সংকটের ব্যাখ্যা কেবল অপরাধীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। প্রশ্ন উঠছে-কেন ধারাবাহিক অভিযান, হাজারো গ্রেফতার এবং নিয়মিত টহল সত্ত্বেও পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি ঘটছে না? এর উত্তর নিহিত রয়েছে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতায়। বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা, সহজে জামিনে মুক্তি এবং পুনর্বাসনের কার্যকর উদ্যোগের অভাব অপরাধীদের মধ্যে দায়মুক্তির সংস্কৃতি তৈরি করছে। ফলে তারা বারবার একই অপরাধে ফিরে আসছে।

ভৌগোলিক বাস্তবতাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, বস্তি ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ঘন উপস্থিতি এবং নদীপথসহ সহজ পালানোর সুযোগ অপরাধীদের জন্য এক সুবিধাজনক পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। কিছু এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে অপরাধীদের অঘোষিত নিয়ন্ত্রণ রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বকে দুর্বল করে তুলেছে, যা পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলছে।

এখানে রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয় ও সামাজিক নীরবতার প্রশ্নও উপেক্ষা করা যায় না। যখন অপরাধীরা প্রভাবশালী গোষ্ঠীর ছত্রচ্ছায়ায় থাকে, তখন আইন প্রয়োগ বাধাগ্রস্ত হয়। আর ভুক্তভোগীরা ভয়ের কারণে মুখ না খুললে অপরাধের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ ভেঙে পড়ে। এই নীরবতা শেষ পর্যন্ত সহিংসতাকে বৈধতার এক বিপজ্জনক আবরণ দেয়।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বাস্তবতা হলো-এই সহিংসতার কেন্দ্রে রয়েছে একটি প্রজন্ম। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং সামাজিক নেতৃত্বের ব্যর্থতায় কিশোররা যখন অপরাধে জড়িয়ে পড়ে, তখন তা কেবল বর্তমান নয়, ভবিষ্যতের জন্যও এক গভীর হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। তাই এই সংকটকে কেবল আইনশৃঙ্খলার সমস্যা হিসেবে দেখলে চলবে না; এটি একটি সামগ্রিক সামাজিক বিপর্যয়।

এই প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্রের করণীয় স্পষ্ট এবং জরুরি। দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা, মাদক চক্রের শিকড় নির্মূল করা, কিশোরদের পুনর্বাসন ও কর্মমুখী সুযোগ সৃষ্টি এবং সমন্বিত নগর পরিকল্পনা বাস্তবায়ন-এসব পদক্ষেপ একযোগে কার্যকর করতে হবে। একই সঙ্গে পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং স্থানীয় সমাজকে সক্রিয় অংশীদার হিসেবে সম্পৃক্ত করতে হবে।

পরিশেষে বলতে হয়-মোহাম্মদপুর আজ যে বার্তা দিচ্ছে, তা উপেক্ষা করা মানে একটি বৃহত্তর বিপর্যয়কে আমন্ত্রণ জানানো। এই সংকট নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা কেবল একটি এলাকার নয়, বরং পুরো নগরসভ্যতার নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতাকে ঝুঁকির মুখে ফেলবে। 
অতএব, কালক্ষেপণ না করে এখনই সময়-দৃঢ়, সমন্বিত এবং নৈতিকভাবে শক্ত অবস্থান নেওয়ার। 
সানা/আপ্র/১৮/৪/২০২৬
 

সংশ্লিষ্ট খবর

মবের পুনরুত্থান: কোথায় রাষ্ট্রের শূন্য সহনশীলতা?
০২ জুন ২০২৬

মবের পুনরুত্থান: কোথায় রাষ্ট্রের শূন্য সহনশীলতা?

আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রে বিচার হয় আদালতে, শাস্তি দেয় রাষ্ট্র, আর নাগরিকের নিরাপত্তার দায়িত্ব ব...

পবিত্র ঈদুল আজহা ও কোরবানি, আনুষ্ঠানিকতার ঊর্ধ্বে এক নৈতিক অঙ্গীকার
২৭ মে ২০২৬

পবিত্র ঈদুল আজহা ও কোরবানি, আনুষ্ঠানিকতার ঊর্ধ্বে এক নৈতিক অঙ্গীকার

পবিত্র ঈদুল আজহা মুসলিম উম্মাহর জীবনে শুধু একটি ধর্মীয় উৎসব নয়; এটি আত্মত্যাগ, আত্মশুদ্ধি, আনুগত্য,...

শিশুর নিরাপত্তা প্রশ্নে রাষ্ট্রকে হতে হবে আপসহীন
২৫ মে ২০২৬

শিশুর নিরাপত্তা প্রশ্নে রাষ্ট্রকে হতে হবে আপসহীন

একটি সভ্য রাষ্ট্রের মানদণ্ড নির্ধারিত হয় তার সবচেয়ে দুর্বল ও অসহায় নাগরিকদের নিরাপত্তা দিয়ে। সেই বিব...

হৃদয় বিদীর্ণ দেশে প্রয়োজন সৌহার্দ্যের রাজনীতি, সংযমের নেতৃত্ব ও সভ্য গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি
২৪ মে ২০২৬

হৃদয় বিদীর্ণ দেশে প্রয়োজন সৌহার্দ্যের রাজনীতি, সংযমের নেতৃত্ব ও সভ্য গণতান্ত্রিক...

রাষ্ট্র কেবল একটি ভূখণ্ডের নাম নয়; রাষ্ট্র মানে মানুষের স্বপ্ন, বিশ্বাস, স্মৃতি, অনুভূতি এবং ভবিষ্যত...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

পদত্যাগ করলেন পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রী দীপেন দেওয়ান

বর্তমান সরকারের চারমাস পূর্ণ না হতেই হঠাৎ মন্ত্রিসভা থেকে সরে দাঁড়ালেন পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রী দীপেন দেওয়ান। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে তিনি তার পদত্যাগপত্র জমা দেন। দীপেন দেওয়ানের আকস্মিক এই পদত্যাগের পেছনে শারীরিক অসুস্থতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। আপনি কি মনে করেন তিনি সত্যিই অসুস্থতার কারণে সরে গেলেন?

মোট ভোট: ১ | শেষ আপডেট: 1 দিন আগে