গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬

মেনু

বাতাসে ছড়িয়ে পড়ছে মৃত্যু, সমন্বিত পদক্ষেপ জরুরি

সুখদেব কুমার সানা

সুখদেব কুমার সানা

প্রকাশিত: ১৬:০৫ পিএম, ১৮ জুলাই ২০২৬ | আপডেট: ০৮:৩৩ এএম ২০২৬
বাতাসে ছড়িয়ে পড়ছে মৃত্যু, সমন্বিত পদক্ষেপ জরুরি
ছবি

ফাইল ছবি

বাতাস মানুষের জীবনের প্রথম এবং সবচেয়ে অপরিহার্য অনুষঙ্গ। সেই বাতাসই যখন মৃত্যুর কারণ হয়ে ওঠে, তখন তা শুধু পরিবেশগত সংকট নয়, রাষ্ট্রের জনস্বাস্থ্য, অর্থনীতি ও উন্নয়ন ব্যবস্থার জন্য গভীর সতর্কবার্তা। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক গবেষণা সেই সতর্কবার্তাকেই নির্মম বাস্তবতায় সামনে এনেছে। গবেষণায় বলা হয়েছে, সূক্ষ্ম ধূলিকণা দূষণের কারণে দেশের ছয়টি প্রধান শহরে বছরে প্রায় ৮৮ হাজার ২৪০ জন মানুষের অকালমৃত্যু হচ্ছে। অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে ২৪২ জন মানুষ এমন এক নীরব ঘাতকের শিকার হচ্ছেন, যার অস্তিত্ব চোখে দেখা যায় না, কিন্তু যার আঘাত সবচেয়ে নির্মম। একই সঙ্গে বছরে প্রায় দুই লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকার অর্থনৈতিক ক্ষতি হচ্ছে, যা দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় পাঁচ শতাংশের সমান। এই পরিসংখ্যান কোনো সাধারণ গবেষণার তথ্য নয়; এটি রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণে অবিলম্বে গুরুত্ব পাওয়ার মতো এক বিপজ্জনক সংকেত।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, বায়ুদূষণের ক্ষতি কেবল শ্বাসতন্ত্রেই সীমাবদ্ধ নয়। সূক্ষ্ম ধূলিকণা মানুষের ফুসফুস ভেদ করে রক্তপ্রবাহে প্রবেশ করে হৃদযন্ত্র, মস্তিষ্ক, কিডনি ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। হৃদরোগ, স্ট্রোক, দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসকষ্ট, হাঁপানি, ফুসফুসের ক্যানসার, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিসের জটিলতা, এমনকি গর্ভস্থ শিশুর স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও নবজাতকের স্বাস্থ্যও এর মারাত্মক প্রভাবে আক্রান্ত হয়। শিশু, প্রবীণ, গর্ভবতী নারী এবং দীর্ঘমেয়াদি রোগে ভোগা মানুষ সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকেন। অর্থাৎ বায়ুদূষণ আজ একটি প্রজন্মের সুস্বাস্থ্য, কর্মক্ষমতা এবং গড় আয়ুকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।

রাজধানী ঢাকায় দূষণজনিত মৃত্যুর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি হওয়া কাকতালীয় নয়। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, অবাধ নির্মাণকাজ, ধুলাবালি নিয়ন্ত্রণে অবহেলা, নিম্নমানের জ্বালানিনির্ভর ইটভাটা, পুরোনো ও ধোঁয়া নির্গমনকারী যানবাহন, শিল্পকারখানার অপরিশোধিত নির্গমন, খোলা জায়গায় বর্জ্য পোড়ানো এবং পরিবেশ আইন বাস্তবায়নে দুর্বলতা-সব মিলিয়ে আমরা নিজেরাই একটি বিষাক্ত পরিবেশ সৃষ্টি করেছি। সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো, এই দূষণের অধিকাংশ উৎস মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে নয়; বরং কার্যকর নীতি, কঠোর আইন প্রয়োগ এবং সমন্বিত প্রশাসনিক উদ্যোগের মাধ্যমে এগুলো অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।

এখন প্রয়োজন বিচ্ছিন্ন প্রকল্প নয়, একটি সমন্বিত জাতীয় কর্মপরিকল্পনা। পরিবেশ অধিদপ্তর, স্থানীয় সরকার, সড়ক পরিবহন, শিল্প, স্বাস্থ্য, গৃহায়ণ, জ্বালানি এবং স্থানীয় প্রশাসনকে একই কাঠামোর অধীনে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। অবৈধ ও দূষণকারী ইটভাটার বিরুদ্ধে আপসহীন ব্যবস্থা গ্রহণ, নির্মাণস্থলে ধুলা নিয়ন্ত্রণ বাধ্যতামূলক করা, শিল্পকারখানায় আধুনিক দূষণ নিয়ন্ত্রণ প্রযুক্তি স্থাপন, পুরোনো যানবাহন পর্যায়ক্রমে অপসারণ, গণপরিবহন উন্নয়ন, পরিবেশবান্ধব জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধি এবং নগরজুড়ে ব্যাপক বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি বাস্তবায়ন এখন সময়ের দাবি। একই সঙ্গে বায়ুমানের তথ্য নিয়মিত প্রকাশ, গবেষণায় বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং জনসচেতনতা গড়ে তুলতেও বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে।

সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারি খাতের দায়িত্বও কম নয়। শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে পরিবেশবান্ধব উৎপাদনব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে, নির্মাণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে দূষণ নিয়ন্ত্রণের বিধি মানতে হবে এবং গণমাধ্যম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও নাগরিক সমাজকে পরিবেশ সচেতনতা বৃদ্ধিতে আরো সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে। সাধারণ নাগরিকও অপ্রয়োজনীয় ব্যক্তিগত যানবাহনের ব্যবহার কমানো, খোলা জায়গায় বর্জ্য না পোড়ানো, বেশি বেশি গাছ লাগানো এবং পরিবেশ সংরক্ষণে দায়িত্বশীল আচরণের মাধ্যমে এই জাতীয় প্রয়াসের অংশ হতে পারেন।

একটি উন্নত, সুস্থ ও বাসযোগ্য বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন বিষাক্ত বাতাসের মধ্যে কখনো বাস্তবায়িত হতে পারে না। প্রতিদিন যদি দুই শতাধিক মানুষ নীরবে প্রাণ হারান, তবে সেটিকে আর পরিবেশগত সমস্যা বলে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। এটি জাতীয় নিরাপত্তা, জনস্বাস্থ্য এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার প্রশ্ন। তাই বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণকে সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকার দিয়ে কঠোর আইন প্রয়োগ, বিজ্ঞানভিত্তিক পরিকল্পনা এবং জবাবদিহিমূলক বাস্তবায়নের মাধ্যমে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। কারণ পরিচ্ছন্ন বাতাস কোনো বিশেষ সুবিধা নয়; এটি প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার, আর সেই অধিকার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ও নৈতিক দায়িত্ব। 
সানা/আপ্র/১৮/৭/২০২৬

 

 

সংশ্লিষ্ট খবর

শিশুদের খাদ্যনিরাপত্তায় নজরদারিহীনতা সুশাসন ও উন্নয়নের বড় অন্তরায়
১৭ অক্টোবর ২০২৬

শিশুদের খাদ্যনিরাপত্তায় নজরদারিহীনতা সুশাসন ও উন্নয়নের বড় অন্তরায়

যে বয়সে শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশের ভিত্তি গড়ে ওঠে, যে সময়ে ভবিষ্যতের সুস্থ, কর্মক্ষম ও মেধাবী না...

ফুটওভার ব্রিজ ব্যবহার বাধ্যে আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত জরুরি
১৫ অক্টোবর ২০২৬

ফুটওভার ব্রিজ ব্যবহার বাধ্যে আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত জরুরি

ফুট ওভারব্রিজ বা আন্ডারপাস থাকা সত্ত্বেও সামান্য শারীরিক পরিশ্রম বা অলসতার অজুহাতে চলন্ত গাড়ির সামনে...

দারিদ্র্য বিমোচনের ঋণ যখন দারিদ্র্যেরই নতুন ফাঁদ
১৫ অক্টোবর ২০২৬

দারিদ্র্য বিমোচনের ঋণ যখন দারিদ্র্যেরই নতুন ফাঁদ

ক্ষুদ্রঋণের মূল দর্শন ছিল দরিদ্র মানুষের হাতে পুঁজি তুলে দিয়ে আয়বর্ধক কর্মকাণ্ডের সুযোগ সৃষ্টি, আত্ম...

নির্ধারিত দামে এলপিজি নিশ্চিত করুন, ভোক্তাকে জিম্মি করা বন্ধ হোক
১৪ অক্টোবর ২০২৬

নির্ধারিত দামে এলপিজি নিশ্চিত করুন, ভোক্তাকে জিম্মি করা বন্ধ হোক

জ্বালানি মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অপরিহার্য উপকরণ। অথচ সরকার নির্ধারিত দামেও যদি রান্নার গ্যাস না মেল...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

পরিচয় যা-ই হোক, চাঁদাবাজ-দখলদারদের ছাড় নয়: ডিএমপি কমিশনার

চাঁদাবাজ, ভূমি দখলবাজ ও মাদক কারবারে জড়িত ব্যক্তিদের পরিচয় বা অবস্থান বিবেচনা না করে তাঁদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার মোসলেহ্ উদ্দীন আহমদ। এসব অপরাধে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণে কোনো ধরনের শিথিলতা দেখানো যাবে না বলেও নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) সকালে ডিএমপি সদর দপ্তরের সম্মেলনকক্ষে সেপ্টেম্বর মাসের মাসিক অপরাধ পর্যালোচনা সভায় উপস্থিত ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাদের উদ্দেশে এসব নির্দেশনা দেন কমিশনার। প্রিয় পাঠক, আপনি কি মনে করেন- কমিশনার যে নির্দেশনা দিয়েছেন, পুলিশ সদস্যরা তা বাস্তবে তা করতে পারবেন?

মোট ভোট: ১ | শেষ আপডেট: 3 দিন আগে