প্রকৃতির রুদ্ররূপ যখন জনপদকে বিপর্যস্ত করে, মানুষের জীবন যখন নিরাপত্তাহীনতার চরম পরীক্ষার মুখোমুখি দাঁড়ায়, তখন কোনো আনুষ্ঠানিকতা, কোনো সূচি কিংবা কোনো প্রথা কি মানুষের জীবনের চেয়ে বড় হতে পারে? বৃষ্টি, বন্যা ও জলাবদ্ধতার মধ্যে কোমরসমান পানি মাড়িয়ে, নৌকা, ভ্যান ও রিকশায় চড়ে পরীক্ষাকেন্দ্রে ছুটে যাওয়া শিক্ষার্থীদের দৃশ্য আমাদের সেই মৌলিক প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়েছে। শিক্ষা জীবনের গুরুত্বপূর্ণ একটি পরীক্ষা দিতে গিয়ে যদি একজন শিক্ষার্থীকে জীবনের ঝুঁকি নিতে হয়, তবে সেই পরীক্ষার আয়োজনের দর্শন নিয়েই নতুন করে ভাবার সময় এসেছে।
পরীক্ষা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। একটি পাবলিক পরীক্ষা শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখে। বছরের পর বছর পরিশ্রম, স্বপ্ন ও প্রত্যাশার সঙ্গে এর গভীর সম্পর্ক রয়েছে। কিন্তু সেই পরীক্ষার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো শিক্ষার্থীর জীবন, নিরাপত্তা ও মানসিক সুস্থতা। জীবন বাঁচলে পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ আবার তৈরি করা যায়, একটি পরীক্ষার তারিখ পরিবর্তন করা যায়; কিন্তু একটি দুর্ঘটনা, একটি অনাকাঙিক্ষত প্রাণহানি কোনোভাবেই ফিরিয়ে আনা যায় না।
কুমিল্লায় জলাবদ্ধতার কারণে পরীক্ষার্থীদের দুর্ভোগের পর একটি কেন্দ্র পরিবর্তন এবং দেরিতে পৌঁছানো শিক্ষার্থীদের অতিরিক্ত সময় দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এটি নিঃসন্দেহে মানবিক পদক্ষেপ। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এমন পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার আগেই কি আরো দ্রুত ও দূরদর্শী সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব ছিল না? কারণ সমস্যা শুধু একটি কেন্দ্রের নয়। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় টানা বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতার মধ্যে শিশু শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার্থীদের ভেজা পোশাকে, দুর্ভোগের পথ পেরিয়ে পরীক্ষায় অংশ নিতে হয়েছে।
একটি শিশুর হাতে পরীক্ষার খাতা দেওয়ার আগে রাষ্ট্রের প্রথম দায়িত্ব তার নিরাপদ পথ নিশ্চিত করা। যে শিশু বৃষ্টির পানিতে ভিজে কাঁপতে কাঁপতে বিদ্যালয়ে যায়, যে শিক্ষার্থী পানিবন্দি ঘর থেকে বের হয়ে পরীক্ষা দিতে বাধ্য হয়, তার মানসিক অবস্থা কি স্বাভাবিক থাকে? তার মনোযোগ, আত্মবিশ্বাস ও পরীক্ষার প্রস্তুতি কি আগের মতো থাকে? এই প্রশ্নগুলো কেবল আবেগের নয়, শিক্ষাবিজ্ঞানেরও।
প্রাকৃতিক দুর্যোগের মধ্যে পরীক্ষা গ্রহণ অনেক ক্ষেত্রেই অমানবিক এবং বৈজ্ঞানিক বাস্তবতার সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ। কারণ শিক্ষা শুধু পরীক্ষা নেওয়ার নাম নয়; শিক্ষা হলো এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে শিক্ষার্থী তার সর্বোচ্চ সক্ষমতা প্রকাশ করতে পারে। ভয়, উদ্বেগ ও নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে নেওয়া পরীক্ষা কখনোই প্রকৃত মূল্যায়নের মানদণ্ড হতে পারে না।
বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি। অতিবৃষ্টি, আকস্মিক বন্যা ও জলাবদ্ধতা এখন আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে একই ধরনের পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। তাই পুরোনো পদ্ধতিতে পরীক্ষা পরিচালনার চিন্তা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়, শিক্ষা বোর্ড, আবহাওয়া অধিদপ্তর ও স্থানীয় প্রশাসনের মধ্যে একটি স্থায়ী সমন্বয় ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
প্রয়োজনে বড় পরীক্ষাগুলোর জন্য দুর্যোগকালীন বিকল্প নীতিমালা তৈরি করতে হবে। আবহাওয়ার পূর্বাভাস ও স্থানীয় পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে দ্রুত পরীক্ষা স্থগিত, তারিখ পরিবর্তন কিংবা অঞ্চলভিত্তিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা থাকতে হবে। একটি পরীক্ষার সময়সূচি অপরিবর্তনীয় কোনো পাথরের লিখন নয়; মানুষের কল্যাণের জন্যই সব ব্যবস্থা।
রাষ্ট্রের শক্তি শুধু দ্রুত উন্নয়ন কিংবা বড় আয়োজনের মধ্যে নয়, বরং সংকটের মুহূর্তে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর সক্ষমতার মধ্যেও প্রকাশ পায়। আজকের শিক্ষার্থীরাই আগামী দিনের নাগরিক। তাদের মনে যদি রাষ্ট্রের প্রতি আস্থা, নিরাপত্তা ও মানবিকতার অনুভূতি তৈরি করতে হয়, তবে তাদের জীবনের প্রতি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।
দুর্যোগের দিনে পরীক্ষার খাতা নয়, সবার আগে প্রয়োজন নিরাপদ আশ্রয়, নিরাপদ পথ ও নিরাপদ জীবন। কারণ একটি জাতির ভবিষ্যৎ নম্বরপত্রে নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপদ বিকাশের মধ্যেই নিহিত।
সানা/আপ্র/১৫/৭/২০২৬