মাঠের লড়াইয়ের পাশাপাশি রাজনৈতিক বিতর্ক, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা ও নানা সমালোচনার মধ্য দিয়েই শেষ অধ্যায়ে পৌঁছেছে ২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপ। তবে এসব বিতর্ককে ছাপিয়ে টুর্নামেন্টটিকে ‘সর্বকালের অন্যতম সফল বিশ্বকাপ’ হিসেবে অভিহিত করেছেন আন্তর্জাতিক ফুটবল নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফার সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো। একই সঙ্গে এই সাফল্যের কৃতিত্ব দিতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন তিনি।
শুক্রবার (১৭ জুলাই) নিউইয়র্কের ম্যানহাটনে ট্রাম্প টাওয়ারে বিশ্বকাপ উপলক্ষে আয়োজিত এক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে ট্রাম্পের পাশে দাঁড়িয়ে ইনফান্তিনো বলেন, এই আসর শুধু ফুটবলের নয়, বরং বিশ্বের মানুষের মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে।
তার ভাষায়, ‘আমেরিকান স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নিয়েছে, মিস্টার প্রেসিডেন্ট। আমরা পুরো বিশ্বকে একত্র করতে পেরেছি।’
মঞ্চে বিশ্বকাপের সোনালি ট্রফি পাশে রেখে দেওয়া ওই অনুষ্ঠানে সাবেক ও বর্তমান ফুটবল তারকারাও উপস্থিত ছিলেন। ট্রাম্পের উদ্দেশে ইনফান্তিনো আরও বলেন, ‘আপনার প্রশংসা করার প্রয়োজন নেই। তবু বলতে হয়, আপনি না থাকলে এই বিশ্বকাপ এতটা অবিশ্বাস্যরকম সফল হতো না।’
দর্শক উপস্থিতিতে নতুন ইতিহাস
ফিফা সভাপতির দাবি, ৪৮ দল নিয়ে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিশ্বকাপ আয়োজন প্রত্যাশার চেয়েও বেশি সফল হয়েছে। তার বক্তব্যে উঠে আসে একাধিক পরিসংখ্যান। তিনি জানান, এখন পর্যন্ত অনুষ্ঠিত ১০২টি ম্যাচের প্রতিটিতেই স্টেডিয়াম ছিল প্রায় পূর্ণ। কেবল তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচ ও ফাইনাল বাকি রয়েছে।
ফিফার হিসাব অনুযায়ী, টুর্নামেন্ট শেষে মাঠে মোট দর্শকসংখ্যা প্রায় ৬৭ লাখে পৌঁছাবে, যা বিশ্বকাপের ইতিহাসে নতুন রেকর্ড। উচ্চ টিকিটমূল্য ও অভিবাসনসংক্রান্ত বিধিনিষেধ নিয়ে শুরুতে যে শঙ্কা ছিল, শেষ পর্যন্ত তা দর্শক উপস্থিতিতে কোনো প্রভাব ফেলতে পারেনি।
ট্রাম্পও বললেন ‘ইতিহাসের সেরা আয়োজন’
অনুষ্ঠানে ট্রাম্পও বিশ্বকাপকে ‘ইতিহাসের সর্বকালের সেরা ক্রীড়া আয়োজনগুলোর একটি’ বলে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, এই টুর্নামেন্ট শুধু খেলাধুলার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং বিশ্বের মানুষের মধ্যে নতুন উদ্দীপনা ও সংযোগ তৈরি করেছে।
রোববারের ফাইনালকে সামনে রেখে স্পেন ও আর্জেন্টিনার দুই দলকেই শুভকামনা জানিয়ে ট্রাম্প বলেন, ‘সেরা দলই যেন শিরোপা জেতে।’
জাতিসংঘে ফুটবলের ঐক্যের বার্তা
সংবর্ধনার আগে শুক্রবার জাতিসংঘে অনুষ্ঠিত এক বিশেষ অধিবেশনেও বক্তব্য দেন ইনফান্তিনো। সেখানে তিনি খেলাধুলাকে তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্য উন্নয়নের কার্যকর মাধ্যম হিসেবে তুলে ধরেন। ফাইনালে ব্যবহৃত একটি ম্যাচবল প্রদর্শন করে তিনি বলেন, একটি ফুটবলই কোটি কোটি মানুষকে একই আবেগে যুক্ত করতে পারে।
তার ভাষায়, ‘আমরা প্রায়ই শুনি পৃথিবী বিভক্ত, সংঘাতপূর্ণ। কিন্তু এই বিশ্বকাপ আমাদের দেখিয়েছে—যে বিষয়গুলো মানুষকে এক করে, তা বিভেদের কারণগুলোর চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী।’
বিতর্কও ছিল কম নয়
তবে বিশ্বকাপজুড়ে বিতর্কেরও কমতি ছিল না। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের চলমান সংঘাতের কারণে ইরান দলকে কঠোর ভ্রমণ বিধিনিষেধের মুখে পড়তে হয়, যার প্রভাব মাঠের পারফরম্যান্সেও পড়ে। শেষ পর্যন্ত গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নেয় দলটি।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের তারকা ফরোয়ার্ড ফোলারিন বালোগনের লাল কার্ডজনিত নিষেধাজ্ঞা ট্রাম্পের অনুরোধে প্রত্যাহার করা হয়েছে—এমন অভিযোগ সামনে আসার পর ইনফান্তিনোকে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়তে হয়। যদিও ট্রাম্প দাবি করেন, তিনি কেবল একটি ‘সুপারিশ’ করেছিলেন এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে ফিফাই।
আরেক বিতর্কের জন্ম দেয় ইংল্যান্ডকে হারিয়ে ফাইনালে ওঠার পর আর্জেন্টিনা দলের কিছু খেলোয়াড়ের ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে রাজনৈতিক বার্তাসংবলিত ব্যানার হাতে ছবি তোলা। এ ঘটনায় ব্রিটিশ সরকার ফিফার কাছে তদন্তের অনুরোধ জানায়।
‘ফুটবলই বিশ্বের সার্বজনীন ভাষা’
সব বিতর্কের পরও ইনফান্তিনোর বিশ্বাস, এই বিশ্বকাপ ভবিষ্যতের জন্য ঐক্যের নতুন দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।
তিনি বলেন, ‘গত দেড় মাসে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোতে এবং বিশ্বের নানা প্রান্তে আমরা দেখেছি—লাখো মানুষ শান্তিপূর্ণভাবে একত্র হয়েছে, আনন্দ ভাগাভাগি করেছে। এটাই এই বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় অর্জন।’
ফাইনালের আগে তার শেষ বার্তা ছিল, ‘দুই দিনের মধ্যে জানা যাবে স্পেন নাকি আর্জেন্টিনা বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হবে। তবে একটি বিষয় আমরা এখনই নিশ্চিতভাবে জানি—ফুটবল শুধু বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলাই নয়, এটি এমন এক সার্বজনীন ভাষা, যা মানুষকে একত্রিত করতে পারে।’
সানা/আপ্র/১৮/৭/২০২৬