স্বাধীনতার সাড়ে পাঁচ দশক পেরিয়ে এসেও আমাদের একটি নির্ভুল, সর্বজনগ্রাহ্য ও চূড়ান্ত মুক্তিযোদ্ধার তালিকা তৈরি করতে না পারাটা জাতীয়ভাবে অত্যন্ত গ্লানিকর। বাংলাদেশে ক্ষমতা বা সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা পুনর্মূল্যায়ন ও নতুন তালিকা তৈরির যে সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, তা কেবল এ মহান বীরদের মর্যাদাকেই ক্ষুণ্ন করে না; বরং পুরো প্রক্রিয়াটিকে একটি রাজনৈতিক হাতিয়ারে পরিণত করে। এ অবস্থায় সাধারণ মানুষের মনে অত্যন্ত যৌক্তিক একটি প্রশ্ন বারবার উঁকি দিচ্ছে- ‘সঠিক তালিকা কি আদৌ কখনো শেষ হবে?’ দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, স্বাধীনতার পর থেকে আজ পর্যন্ত প্রায় প্রতিটি রাজনৈতিক সরকারের আমলেই মুক্তিযোদ্ধার তালিকা কমবেশি কাটাছেঁড়া হয়েছে। কোনো সরকার এসে আগের সরকারের তৈরি তালিকায় নতুন নাম যুক্ত করেছে আবার সরকার পরিবর্তনের পর ওই নামগুলো বাদ দিয়ে নিজস্ব ঘরানার ব্যক্তিদের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ফলে মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা ও তালিকা ক্রমান্বয়ে বিতর্কিত হয়েছে।
বলার অপেক্ষা রাখে না, যারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ঘরবাড়ি ছেড়ে মাতৃভূমির স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করেছিলেন; তাদের আজ প্রবীণ বয়সে এসে বারবার ‘প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা’ হিসেবে নিজের প্রমাণপত্র হাতে নিয়ে সরকারি দপ্তরে ঘুরতে হচ্ছে- যা অত্যন্ত বেদনাদায়ক। একটি সঠিক ও স্থায়ী তালিকা তৈরি করতে না পারার মূল কারণ- এ প্রক্রিয়াটিকে শতভাগ পেশাদারি ও দলনিরপেক্ষ দৃষ্টিকোণ থেকে না দেখে রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং বিভিন্ন বৈষয়িক সুযোগ-সুবিধার (ভাতা, কোটা ইত্যাদি) সঙ্গে জড়িয়ে ফেলা। যখনই রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও সুবিধার অপব্যবহারের সুযোগ তৈরি হয়, তখনই ভুয়া ও অনুপ্রবেশকারীদের তৎপরতা বেড়ে যায়। আর এর দায় চাপানো হয় রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের ওপর- যা সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে নতুন করে তালিকা সংশোধনের অন্তহীন চক্রের জন্ম দেয়। এই জাতীয় বিতর্কের স্থায়ী অবসান হওয়া প্রয়োজন। বর্তমান প্রেক্ষাপটে সরকারের উচিত হবে একটি স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও সম্পূর্ণ নির্দলীয় ‘জাতীয় টাস্কফোর্স’ বা উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কমিশন গঠন করা- যেখানে থাকবেন প্রত্যক্ষদর্শী যুদ্ধকালীন কমান্ডার, প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ, গবেষক এবং এমন সব ব্যক্তি; যাদের সততা ও নিরপেক্ষতা প্রশ্নাতীত।
বলা বাহুল্য, দলীয় রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে ১৯৭১ সালের প্রকৃত যুদ্ধকালীন নথিপত্র এবং বিশ্বস্ত প্রমাণাদির ওপর ভিত্তি করে একটি স্বচ্ছ ও অকাট্য ‘চূড়ান্ত তালিকা’ তৈরি করতে হবে- যা পরবর্তীকালে আর কোনো সরকারই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে পরিবর্তন করতে পারবে না। একটি জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের পরিচয় নিয়ে বারবার ছিনিমিনি খেলার এই অপসংস্কৃতি বন্ধ হোক। একটি স্বাধীন রাষ্ট্রে প্রকৃত বীর সন্তানদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও সম্মান দেওয়া রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের অংশ। আমরা আশা করি, বর্তমান সরকার ক্ষমতার রাজনীতির বাইরে গিয়ে এমন একটি স্থায়ী এবং নিখুঁত তালিকা প্রণয়নে সচেষ্ট হবে- যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে আমাদের গৌরবময় মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে বিতর্কহীন ও নিষ্কলঙ্কভাবে তুলে ধরবে। তাই আর কোনো সরকার পরিবর্তনের ঢেউ যেন এই বীরদের আত্মত্যাগকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করাতে না পারে- এটিই আমাদের প্রত্যাশা।
কেএমএএ/আপ্র/১৬.০৭.২০২৬