টানা বর্ষণ ও দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতায় সাতক্ষীরা পৌরসভার বিস্তীর্ণ নিম্নাঞ্চলে জনজীবন কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। অনেক এলাকায় চলাচলের একমাত্র মাধ্যম হয়ে উঠেছে ভেলা। বাজার করা, গবাদিপশুর খাবার আনা, শিশুদের স্কুলে নেওয়াসহ দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় কাজও করতে হচ্ছে ভেলায় চড়ে। বছরের পর বছর ধরে একই দুর্ভোগে দিন কাটাচ্ছে শত শত পরিবার।
টানা ১৮ দিনের বৃষ্টিতে পৌরসভার বাড়িঘর, রান্নাঘর, আঙিনা, রাস্তাঘাট ও নলকূপ পানিতে তলিয়ে গেছে। এতে সুপেয় পানির সংকট দেখা দেওয়ার পাশাপাশি স্যানিটেশন ব্যবস্থাও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে পৌরসভার ৬, ৭ ও ৯ নম্বর ওয়ার্ডের ইটাগাছা, কামালনগর, বাঁকাল, বারুইপাড়া, পলাশপোল ও মধুমোল্লার ডাঙিসহ বিভিন্ন এলাকা। পানি নিষ্কাশনের কার্যকর ব্যবস্থা না থাকায় এসব এলাকার স্বাভাবিক জীবনযাত্রা প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে ইটাগাছা এলাকায় বহু পরিবার এখন ভেলা ছাড়া চলাচল করতে পারছে না।
সাতক্ষীরা আবহাওয়া অধিদপ্তরের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জুলফিকার আলী জানান, ১ থেকে ১৮ জুলাই সকাল ৬টা পর্যন্ত জেলায় ৪৭৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।
ইটাগাছার বাসিন্দা মফিজুল ইসলাম বলেন, প্রতি বর্ষায় বাড়ির চারপাশ পানিতে তলিয়ে যায়। বাজার করা থেকে শুরু করে সংসারের প্রায় সব কাজই ভেলায় করতে হয়। বছরের পর বছর একই দুর্ভোগ সহ্য করতে হচ্ছে।
কামালনগরের বাসিন্দা ছবিরুনেছা জানান, দীর্ঘদিন পানিতে চলাচল করতে গিয়ে অনেকের পায়ে ঘা হয়েছে। শিশুদের স্কুলে যাওয়া বন্ধ হয়ে গেছে। প্রতিদিন বাজারে যাওয়া সম্ভব না হওয়ায় একসঙ্গে কয়েক দিনের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনে আনতে হয়। প্রতিবছর প্রায় ছয় থেকে সাত মাস তারা পানিবন্দি অবস্থায় থাকেন।
সাতক্ষীরা জেলা নাগরিক কমিটির নেতা ওবায়দুস সুলতান বাবলু বলেন, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, খাল ও ড্রেন দখল এবং পরিকল্পনাহীন মৎস্যঘের নির্মাণের কারণে প্রতিবছর জলাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে। ইটাগাছা এলাকায় প্রায় দেড়শ পরিবারের মধ্যে শতাধিক পরিবারের শৌচাগার পানির নিচে তলিয়ে গেছে। এতে নারী, শিশু ও শিক্ষার্থীরাই সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, কিছু ঘের মালিক পানি আটকে রাখায় এবং বাইপাসের স্লুইস গেট দিয়ে পানি নিষ্কাশন না হওয়ায় পরিস্থিতি আরো জটিল হয়েছে। অপরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থাও জলাবদ্ধতা বাড়িয়ে দিয়েছে।
জেলা প্রশাসক কাউসার আজিজ বলেন, চিংড়ি চাষের স্বার্থে খালে নেট-পাটা বসিয়ে যারা পানি প্রবাহে বাধা সৃষ্টি করছেন, তাদের স্বেচ্ছায় তা অপসারণ করতে হবে। অন্যথায় প্রশাসন আইনগত ব্যবস্থা নেবে।
তবে স্থানীয়দের দাবি, সাময়িক উদ্যোগে এ সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। খাল ও ড্রেন পুনঃখনন, পরিকল্পিত পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা এবং দীর্ঘমেয়াদি কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে প্রতিবছরই একই দুর্ভোগ পোহাতে হবে সাতক্ষীরার বাসিন্দাদের।
এসি/আপ্র/১৯/০৭/২০২৬