নন্দিত কথাসাহিত্যিক, নাট্যকার ও চলচ্চিত্র নির্মাতা হুমায়ূন আহমেদের ১৪তম মৃত্যুবার্ষিকী পালিত হয়েছে শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও নানা আয়োজনে। গাজীপুরের নুহাশপল্লী ও নেত্রকোনার কেন্দুয়ায় দিনব্যাপী কর্মসূচির মধ্য দিয়ে স্মরণ করা হয়েছে বাংলা সাহিত্যের এই কিংবদন্তিকে।
রোববার (১৯ জুলাই) দুপুরে গাজীপুরের নুহাশপল্লীর লিচুতলায় হুমায়ূন আহমেদের কবরে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান তাঁর স্ত্রী অভিনেত্রী মেহের আফরোজ শাওন, দুই ছেলে নিনিত ও নিষাদ হুমায়ূন। এ সময় লেখকের ভক্ত, অনুরাগী ও নুহাশপল্লীর কর্মীরা উপস্থিত ছিলেন। তাঁর আত্মার শান্তি কামনায় কোরআনখানি, মিলাদ ও দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হয়।
কবর জিয়ারত শেষে মেহের আফরোজ শাওন বলেন, হুমায়ূন আহমেদের জন্ম ও মৃত্যুবার্ষিকী পালনের জন্য সরকার বা রাষ্ট্রের কাছে তাঁর কোনো প্রত্যাশা নেই।
তিনি বলেন, “সরকার, রাষ্ট্র কারও কাছেই আমার কিছু চাওয়ার নেই। আগেও চাওয়ার ছিল না হুমায়ূন আহমেদের জন্মবার্ষিকী বা মৃত্যুবার্ষিকীতে তাঁকে নিয়ে কিছু পালন করার জন্য।”
শাওন বলেন, গত ১৪ বছর ধরে নুহাশপল্লীর কর্মী ও পরিবারের সদস্যরা নিজেদের উদ্যোগেই নিয়মিত হুমায়ূন আহমেদের জন্মদিন ও মৃত্যুদিন পালন করে আসছেন। ভবিষ্যতেও এই ধারা অব্যাহত থাকবে।
তিনি বলেন, “আমরা তাঁর জন্ম-মৃত্যুদিবস পালন করে যাব, যত দিন আমরা বেঁচে থাকব, যত দিন নুহাশপল্লীর একজন কর্মীও থাকবেন অথবা যত দিন এখানে তাঁর ভক্ত ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা থাকবেন।”
হুমায়ূন আহমেদের বইয়ের সংগ্রহশালা বা সবার জন্য উন্মুক্ত লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠার বিষয়ে শাওন বলেন, নুহাশপল্লীসহ কয়েকটি স্থানে তাঁর বইয়ের সংগ্রহ রয়েছে। তবে সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত লাইব্রেরি করার পরিকল্পনা আপাতত নেই।
তিনি বলেন, “অনেকে বই নিয়ে ফেরত দেন না। হুমায়ূন আহমেদের প্রথম প্রকাশিত বইয়ের কপিও কেউ কেউ নিয়ে চলে গেছেন। বিষয়টি খুব কষ্টের।”
প্রতি বছরের মতো এবারও নুহাশপল্লীতে ভক্তদের ঢল নামে। প্রিয় লেখকের প্রতি ভালোবাসা জানাতে অনেকেই ফুল হাতে উপস্থিত হন। কেউ এসেছেন হুমায়ূনের জনপ্রিয় চরিত্র হিমুর হলুদ পাঞ্জাবি পরে, কেউবা রূপার নীল শাড়ির সাজে।
ভক্তরা বলেন, হুমায়ূন আহমেদের সাহিত্য, নাটক ও চলচ্চিত্র ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে তাঁর সৃষ্টিগুলো সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
হুমায়ূন আহমেদ ভক্ত সংগঠন ‘হিমু পরিবহন’-এর সদস্য দ্বীপ দাস বলেন, তাঁরা নিয়মিত ক্যানসার সচেতনতা কার্যক্রম, ম্যারাথন, হিমু-রূপা উৎসবসহ বিভিন্ন আয়োজনের মাধ্যমে লেখককে স্মরণ করে আসছেন। ভবিষ্যতেও এসব কার্যক্রম আরো বিস্তৃত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
কেন্দুয়ায় নানা আয়োজনে স্মরণ: নেত্রকোনার কেন্দুয়ায় হুমায়ূন আহমেদের প্রয়াণদিবস উপলক্ষে তাঁর নিজ হাতে প্রতিষ্ঠিত শহীদ স্মৃতি বিদ্যাপীঠে নানা কর্মসূচি পালন করা হয়েছে।
কর্মসূচির মধ্যে ছিল কোরআন খতম, কালো পতাকা উত্তোলন, কালো ব্যাজ ধারণ, শোক শোভাযাত্রা, অস্থায়ী প্রতিকৃতিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ, মিলাদ ও দোয়া, বৃক্ষরোপণ, কুইজ প্রতিযোগিতা, উপস্থিত বক্তৃতা, চিত্রাঙ্কন ও দেয়ালিকা প্রদর্শনী।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. আসাদুজ্জামানের সভাপতিত্বে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন সহকারী প্রধান শিক্ষক শরীফ আনিস আহমেদ, শিক্ষক শাহজাহান কবীর, তুহিন সরকার, মাহবুব আলম এবং হুমায়ূন আহমেদের চাচা বখতিয়ার আহমেদ আযম।
শিক্ষক শাহজাহান কবীর বলেন, অবহেলিত এলাকার মানুষের উন্নয়নের জন্য হুমায়ূন আহমেদ নিজ হাতে বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ২০০৬ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ভালো ফলাফল করে আসছে।
হুমায়ূন আহমেদের স্বজন বখতিয়ার আহমেদ আযম বলেন, তিনি সারা জীবন মানবমুক্তির কথা বলেছেন। তাঁর কাছে সব মানুষ সমান ছিল। প্রকৃতি, মানুষ ও জীবনের গভীর অনুভূতি ধারণ করতে পেরেছিলেন বলেই তাঁর লেখা আজও সব বয়সী পাঠকের কাছে সমান জনপ্রিয়।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. আসাদুজ্জামান বলেন, বই পড়ার অভ্যাস তৈরিতে হুমায়ূন আহমেদের ভূমিকা অসামান্য। তিনি শুধু পাঠক তৈরি করেননি, মানুষের চিন্তা ও অনুভূতির জগতকেও সমৃদ্ধ করেছেন।
১৯৪৮ সালের ১৩ নভেম্বর নেত্রকোনার কেন্দুয়া উপজেলার কুতুবপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন হুমায়ূন আহমেদ। দীর্ঘদিন ক্যানসারের সঙ্গে লড়াই শেষে ২০১২ সালের ১৯ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের একটি হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন তিনি।
বাংলা সাহিত্য, নাটক ও চলচ্চিত্রে তাঁর সৃষ্টির প্রভাব আজও অম্লান। তাঁর লেখা ও নির্মাণ নতুন প্রজন্মের কাছেও সমানভাবে জনপ্রিয় হয়ে আছে।
সানা/ডিসি/আপ্র/১৯/৭/২০২৬