আর মাত্র একটি ম্যাচ। এরপরই পর্দা নামবে ইতিহাসের সবচেয়ে বর্ণিল বিশ্বকাপের। কিন্তু এই ফাইনাল কেবল একটি শিরোপা নির্ধারণের লড়াই নয়; এটি দুই ভিন্ন ফুটবল দর্শনের সংঘর্ষ, দুই প্রজন্মের প্রতীকী দ্বন্দ্ব এবং কোটি কোটি মানুষের আবেগের চূড়ান্ত পরীক্ষা। নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে রোববার বিশ্বকাপের শেষ মহারণে মুখোমুখি হচ্ছে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা ও ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়ন স্পেন।
ফুটবলবিশ্বের অসংখ্য সমর্থকের কাছে এটি হতে পারে লিওনেল মেসির শেষ বিশ্বকাপের শেষ ম্যাচ। ৩৯ বছর বয়সী এই মহাতারকা আরেকটি বিশ্বকাপ শিরোপা জিতে বিদায়কে মহিমান্বিত করতে চান। অন্যদিকে টানা ৩৭ ম্যাচ অপরাজিত স্পেন তাদের নিখুঁত পাসিং, বলের নিয়ন্ত্রণ এবং আধুনিক কৌশলগত ফুটবল দিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বসেরা হওয়ার স্বপ্নে বিভোর।
দুই অঞ্চলের চ্যাম্পিয়নদের বহুল আলোচিত ‘ফাইনালিসিমা’ রাজনৈতিক কারণে মাঠে গড়ায়নি। ভাগ্যের পরিহাসে সেই অসমাপ্ত হিসাব এবার মিটবে বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় মঞ্চেই।
এই ফাইনালকে ঘিরে সবচেয়ে আলোচিত দ্বৈরথ মেসি ও লামিনে ইয়ামালের। বার্সেলোনার কিংবদন্তি একাডেমি ‘লা মাসিয়া’র দুই প্রজন্মের দুই বিস্ময় এবার মুখোমুখি। ফুটবলপ্রেমীদের মনে এখনও ভাসে সেই ভাইরাল ছবি-শিশু ইয়ামালকে কোলে নিয়ে গোসল করাচ্ছেন তরুণ মেসি। আজ সেই শিশুই বিশ্বের অন্যতম সেরা তরুণ ফুটবলার হয়ে কিংবদন্তির বিপরীতে দাঁড়িয়ে ইতিহাস গড়ার অপেক্ষায়।
স্পেনের কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তের দল পুরো আসরেই ছিল দুর্দান্ত। নিখুঁত পাসিং, বলের দখল ও কৌশলগত আধিপত্যে প্রতিপক্ষকে প্রায় প্রতিটি ম্যাচেই অসহায় করে তুলেছে তারা। অধিনায়ক রদ্রির বিশ্বাস, আর্জেন্টিনার বিপক্ষে ফাইনাল হবে অত্যন্ত শারীরিক লড়াইয়ের। তবে যেকোনো পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার সামর্থ্যই তাদের সবচেয়ে বড় শক্তি।
অন্যদিকে আর্জেন্টিনার পথ মোটেও মসৃণ ছিল না। কেপ ভার্দে, মিসর, সুইজারল্যান্ড এবং সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডের মতো কঠিন প্রতিপক্ষকে টপকে এসেছে লিওনেল স্কালোনির দল। প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচেই মেসি গোল, সহায়তা এবং নেতৃত্বে দলকে টেনে তুলেছেন। ২০২২ সালের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন দলের ১৭ সদস্যকে নিয়ে গড়া এই আর্জেন্টিনা আবারো দেখিয়েছে-তারা শেষ বাঁশি বাজার আগ পর্যন্ত কখনও হার মানে না।
ডাগআউটেও রয়েছে এক ভিন্ন গল্প। আর্জেন্টিনার সফল কোচ স্কালোনি একসময় স্পেনের বর্তমান কোচ দে লা ফুয়েন্তের অধীনেই কোচিং প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন। এবার বিশ্বসেরার লড়াইয়ে শিক্ষক ও ছাত্র দাঁড়াচ্ছেন বিপরীত দুই শিবিরে।
ফাইনালের ফল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে মেটলাইফ স্টেডিয়ামের মাঠও। পুরো টুর্নামেন্টজুড়েই পিচের মান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অনেক খেলোয়াড় ও কোচ। তুলনামূলক ধীরগতির এই মাঠ স্পেনের স্বাভাবিক পাসিং ছন্দে প্রভাব ফেলতে পারে, যা আর্জেন্টিনার লড়াকু ও সরাসরি আক্রমণভিত্তিক ফুটবলের জন্য বাড়তি সুবিধা হয়ে উঠতে পারে।
আবহাওয়াও হতে পারে বড় পরীক্ষা। প্রায় ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা, উচ্চ আর্দ্রতা এবং কানাডার দাবানলের ধোঁয়ার প্রভাব নিয়ে আয়োজকরা নিবিড় নজর রাখছেন। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে ফিফা ও সংশ্লিষ্ট আবহাওয়া কর্তৃপক্ষ সার্বক্ষণিক কাজ করছে।
মেটলাইফ স্টেডিয়ামে ৮০ হাজারের বেশি দর্শক উপস্থিত থাকার কথা। গ্যালারিতে থাকবেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট ক্লডিয়া শেইনবাউম এবং বিশ্ব ফুটবলের শীর্ষ কর্মকর্তারাও।
আর্জেন্টিনা জিতলে ১৯৬২ সালের পর প্রথম দল হিসেবে টানা দুটি বিশ্বকাপ জয়ের কীর্তি গড়বে। আর স্পেনের জয় মানে হবে দ্বিতীয় বিশ্বকাপ শিরোপা, সঙ্গে আন্তর্জাতিক ফুটবলে নতুন এক আধিপত্যের ঘোষণা।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন একটাই-শেষ নাচের মঞ্চে কী মেসির হাতে উঠবে আরেকটি সোনালি ট্রফি, নাকি নিখুঁত ফুটবলের জাদুতে নতুন ইতিহাস লিখবে স্পেন? উত্তর মিলবে নিউ জার্সির আলোঝলমলে সেই রাতেই।