গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬

মেনু

জুলাইয়ের বিজয় বিভাজনের হাতিয়ার হতে পারে না

সুখদেব কুমার সানা

সুখদেব কুমার সানা

প্রকাশিত: ১৪:০৩ পিএম, ১৯ জুলাই ২০২৬ | আপডেট: ০০:০১ এএম ২০২৬
জুলাইয়ের বিজয় বিভাজনের হাতিয়ার হতে পারে না
ছবি

ফাইল ছবি

ইতিহাসের কিছু মুহূর্ত জাতির গতিপথ বদলে দেয়। ২০২৪ সালের জুলাই বাংলাদেশের ইতিহাসে তেমনই এক সন্ধিক্ষণ। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন হিসেবে শুরু হওয়া একটি দাবি অল্প সময়ের মধ্যে বৃহত্তর গণআকাঙক্ষার প্রতীকে পরিণত হয়। বিভিন্ন স্তরের সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশাপাশি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সাহসী অংশগ্রহণ আন্দোলনের গতি ও ব্যাপ্তি বাড়িয়ে দেয়। বিশেষ করে ১৮ জুলাইয়ের প্রতিরোধ দেখিয়ে দিয়েছিল-ন্যায্য দাবিতে ঐক্যবদ্ধ হলে তরুণ সমাজ কত বড় পরিবর্তনের শক্তি হয়ে উঠতে পারে।

কিন্তু ইতিহাসের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা শুরু হয় বিজয়ের পর। কারণ একটি আন্দোলনের সাফল্য কেবল ক্ষমতার পরিবর্তনে নয়; সেই পরিবর্তন মানুষের জীবন, রাষ্ট্রের সংস্কৃতি ও সামাজিক মূল্যবোধে কতটা ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারলো, তার ওপর নির্ভর করে।

আজ তাই প্রশ্ন উঠছে-জুলাইয়ের যে আকাঙক্ষা নিয়ে মানুষ পথে নেমেছিল, সেই আকাঙক্ষার কতটা বাস্তবায়িত হয়েছে? বৈষম্য কমেছে কি? জবাবদিহি বেড়েছে কি? রাষ্ট্র কি আরো মানবিক, সহনশীল ও গণতান্ত্রিক হয়েছে?

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, জুলাই-পরবর্তী সময়ে সমাজে একটি বিপজ্জনক প্রবণতার বিস্তার ঘটেছে-মব সংস্কৃতি বা জনতার বিচারের প্রবণতা। কোনো অভিযোগের বিচার আদালতে নয়, বরং রাস্তায় জনতার হাতে তুলে দেওয়া; ভিন্নমতকে যুক্তি দিয়ে মোকাবিলা না করে অপমান, হেনস্তা বা সামাজিকভাবে একঘরে করার চেষ্টা-এসব কোনো গণতান্ত্রিক সমাজের লক্ষণ হতে পারে না।

জুলাই আন্দোলনের মূল চেতনা ছিল বৈষম্য, অন্যায় ও অবিচারের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো। সেই আন্দোলন কখনোই আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানায়নি। বরং একটি ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র, যেখানে প্রত্যেক নাগরিক আইনের সমান সুরক্ষা পাবেন-এটাই ছিল এর অন্তর্নিহিত আকাঙক্ষা।

কিন্তু দুঃখজনকভাবে, পরবর্তী সময়ে দেখা গেছে, ভিন্নমত প্রকাশ করলেই অনেককে নানা রাজনৈতিক তকমায় চিহ্নিত করা হচ্ছে। সমালোচনার জবাব যুক্তি দিয়ে নয়, পরিচয় নির্ধারণ করে দেওয়ার প্রবণতা তৈরি হয়েছে। এতে গণতন্ত্রের জায়গা সংকুচিত হয়, সমাজে বাড়ে অবিশ্বাস ও বিভক্তি। বেড়েছেও।

মহান মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশের অস্তিত্বের ভিত্তি। ১৯৭১ সালের চেতনা মানে ছিল স্বাধীনতা, আত্মমর্যাদা, সাম্য ও মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা। জুলাইয়ের আন্দোলনের আকাঙক্ষাও ছিল একটি বৈষম্যহীন ও মর্যাদাপূর্ণ রাষ্ট্র নির্মাণ। তাই এই দুই ঐতিহাসিক অধ্যায়কে মুখোমুখি দাঁড় করানো নয়, বরং তাদের অভিন্ন মূল্যবোধকে ধারণ করাই জাতীয় দায়িত্ব।

একই সঙ্গে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি নিয়েও জাতীয় স্বার্থের আলোকে খোলামেলা আলোচনা প্রয়োজন। বিশ্বের বিভিন্ন শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক, আন্তর্জাতিক চুক্তি ও কূটনৈতিক সিদ্ধান্তে স্বচ্ছতা এবং জনগণের আস্থা নিশ্চিত করা জরুরি। স্বাধীন রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত গ্রহণে জাতীয় স্বার্থই হতে হবে সর্বোচ্চ বিবেচনা।

জুলাইয়ের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো-জনগণের শক্তি পরিবর্তন আনতে পারে, কিন্তু সেই পরিবর্তনকে টেকসই করতে প্রয়োজন প্রতিষ্ঠান, আইন, সহনশীলতা ও দায়িত্বশীলতা।

জুলাইয়ের বিজয় কোনো বিভাজনের অস্ত্র হতে পারে না। এটি হতে হবে এমন এক বাংলাদেশের ভিত্তি, যেখানে মুক্তিযুদ্ধের মর্যাদা অক্ষুণ্ন থাকবে, মতের ভিন্নতা সম্মান পাবে, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হবে এবং কোনো নাগরিককে ভয় বা বৈষম্যের মধ্যে জীবন কাটাতে হবে না।

কারণ ইতিহাসের প্রকৃত বিজয় প্রতিপক্ষকে পরাজিত করার মধ্যে নয়; বরং একটি উত্তম রাষ্ট্র নির্মাণের মধ্যেই নিহিত।
সানা/আপ্র/১৯/৭/২০২৬
 

সংশ্লিষ্ট খবর

আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশি, ঋণের ফাঁদে বিপন্ন জনজীবন
২০ অক্টোবর ২০২৬

আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশি, ঋণের ফাঁদে বিপন্ন জনজীবন

পরিবারের আয় দিয়ে সংসারের প্রয়োজন মেটানো মানুষের মৌলিক আর্থিক নিরাপত্তার শর্ত। অথচ দেশের ৪৭ দশমিক ৪২...

মানুষ অবকাশে যাবে, মৃত্যুফাঁদে নয়: নিরাপত্তা নিশ্চিত হোক
১৯ অক্টোবর ২০২৬

মানুষ অবকাশে যাবে, মৃত্যুফাঁদে নয়: নিরাপত্তা নিশ্চিত হোক

মানুষ অবকাশকেন্দ্রে যায় নিরাপদে ভ্রমণ, পরিবার-পরিজন নিয়ে আনন্দময় সময় কাটানো এবং কর্মব্যস্ত জীবনের ক্...

ধর্মীয় স্বাধীনতা ও নিরাপত্তার দৃঢ় নিশ্চয়তাই হোক সম্প্রীতিময় রাষ্ট্রের ভিত্তি
১৮ অক্টোবর ২০২৬

ধর্মীয় স্বাধীনতা ও নিরাপত্তার দৃঢ় নিশ্চয়তাই হোক সম্প্রীতিময় রাষ্ট্রের ভিত্তি

শারদীয় দুর্গোৎসব বাঙালির ধর্মীয় বিশ্বাস, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও বহুত্ববাদী সমাজজীবনের গুরুত্বপূর্ণ অনু...

শিশুদের খাদ্যনিরাপত্তায় নজরদারিহীনতা সুশাসন ও উন্নয়নের বড় অন্তরায়
১৭ অক্টোবর ২০২৬

শিশুদের খাদ্যনিরাপত্তায় নজরদারিহীনতা সুশাসন ও উন্নয়নের বড় অন্তরায়

যে বয়সে শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশের ভিত্তি গড়ে ওঠে, যে সময়ে ভবিষ্যতের সুস্থ, কর্মক্ষম ও মেধাবী না...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

কোনো সক্রিয় জরিপ নেই