গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
শনিবার, ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

মেনু

দেশের বাজারে জামের বিচি আর বিদেশে যায় রস

প্রত্যাশা ডেস্ক

প্রত্যাশা ডেস্ক

প্রকাশিত: ২০:৪৭ পিএম, ১৯ জুলাই ২০২৬ | আপডেট: ১৩:৩৬ এএম ২০২৬
দেশের বাজারে জামের বিচি আর বিদেশে যায় রস
ছবি

ছবি সংগৃহীত

ভোরের আলো তখনো পুরোপুরি শহরের গায়ে মাখেনি। ঢাকার কারওয়ান বাজারে এরই মধ্যে শুরু হয়ে গেছে দিনের ব্যস্ততা। চোখে পড়ল বাঁশের ঝুড়িতে স্তূপ করে রাখা কালো-বেগুনি রঙের জাম। কোথাও মানুষ হাত দিয়ে বেছে নিচ্ছেন পাকা ফল, কোথাও পিষে বের হচ্ছে গাঢ় বেগুনি রস। কিছু দূরে চোখে পড়ে আরেক দৃশ্য- এক ঝুড়ি ভরা গোলাপি-রঙা বিচির স্তূপ। কাছে যেতেই বিষয়টা আরও পরিষ্কার হলো। সাজিয়ে রাখা হচ্ছে জামের রসের ব্যাগ, অন্যদিকে জমা হচ্ছে বিচি- যেন একটি ফলের দুই ভিন্ন পরিণতি। এসব জামের রস পাড়ি জমায় বিদেশে, আর বিচি থেকে যায় দেশের মাটিতে। তবে ওই বিচিও ফেলনা নয়; এরও গড়ে উঠেছে আলাদা বাজার।

বর্ষা মৌসুম এলেই দেশের বিভিন্ন অঞ্চল- রাজশাহী, নাটোর, যশোর, কুষ্টিয়া, মেহেরপুর কিংবা পার্বত্য এলাকার বাগান থেকে ট্রাকভর্তি জাম আসে রাজধানীতে। অধিকাংশ মানুষের কাছে জাম মানে মৌসুমি ফল কিংবা রাস্তার পাশের শরবত। কিন্তু কারওয়ান বাজারের একটি অংশে এই ফলের আরেক পরিচয় আছে—এটি কাঁচামাল, এটি ব্যবসা, এটি শ্রমের ধারাবাহিকতা।

কারওয়ান বাজারের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রতিদিন এখানে ৮-১০ টন জাম আসে। এর একটি অংশ সরাসরি ফল হিসেবে বিক্রি হয়। তবে বাজারে বিক্রির পরও প্রতিদিন কমবেশি প্রায় দুই টন জাম থেকে রস সংগ্রহ করা হয়। ওই রস পরে বিভিন্ন জুস প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান, পাইকারি ব্যবসায়ী কিংবা রপ্তানিকারকদের কাছে পৌঁছে যায়।

শহরের অধিকাংশ মানুষ যখন ঘুমিয়ে থাকে; তখন কারওয়ান বাজারে শুরু হয় আরেক দিনের প্রস্তুতি। এখানে সময় চলে ভিন্ন নিয়মে; শহরের ঘড়ি নয় বরং পণ্যের চাহিদাই সময় নির্ধারণ করে। ভোর চারটা থেকে শুরু হয় শ্রমের ব্যস্ত চিত্র। কারো কাজ ট্রাক থেকে ঝুড়ি নামানো, কারো কাজ জাম ধোয়া, কেউ ফল পিষে রস বের করছেন, কেউ আবার প্যাকেটজাত করছেন। দুপুর পেরিয়ে সন্ধ্যা, কখনো রাত পর্যন্ত চলতে থাকে কর্মযজ্ঞ।

জামগুলো প্রথমে বাছাই করা হয়। ভালো ও পরিপক্ব ফল আলাদা করা হয়, নষ্ট বা অতিরিক্ত নরম ফল সরিয়ে রাখা হয়। এরপর ধোয়া, পিষে রস বের করা এবং ছাঁকনির কাজ সম্পন্ন হয়। রস আলাদা হওয়ার পর পড়ে থাকে বিচি ও শাঁসের অংশ। দেখা যায়, বেগুনি রঙে রঞ্জিত বিশাল ঝুড়িভর্তি বিচি। মনে হয় যেন কেউ রং ঢেলে দিয়েছে। অথচ এই রং তৈরি হয়েছে শত শত কেজি জাম পিষে। এই বিচির স্তূপ যেন বলে দেয়- একেক ব্যাগ রসের পেছনে কত ফলের দেহ নিঃশেষ হয়েছে।

প্যাকেট করা গাঢ় বেগুনি রঙের রসের ব্যাগগুলো একের পর এক বাক্সে সাজানো হয়। ব্যবসায়ীদের ভাষায়, এসবের বড় অংশ চলে যায় জুস প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান বা রপ্তানিকারকদের কাছে। মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশি ফলের চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এমন প্রক্রিয়াজাত পণ্যের বাজারও বিস্তৃত হচ্ছে। দেশি ফলের প্রতি প্রবাসীদের আবেগের পাশাপাশি স্বাস্থ্যসচেতন ভোক্তাদের কাছেও জামের রসের চাহিদা তৈরি হয়েছে। ফলে মৌসুমি এ ফল এখন শুধু দেশের বাজারে সীমাবদ্ধ নেই; প্রক্রিয়াজাত রূপে তা আন্তর্জাতিক বাজারেও জায়গা করে নিচ্ছে।

এক সময় জামের বিচিকে অনেকেই বর্জ্য মনে করতেন। রস বের করার পর এগুলো ফেলে দেওয়া হতো বা নষ্ট হয়ে যেত। কিন্তু এখন সেই চিত্র বদলাতে শুরু করেছে। ব্যবসায়ীরা জানান, জামের বিচিও এখন বিক্রি হয়। বিচি শুকিয়ে গুঁড়ো বা পাউডার তৈরি করা হয়, যা দেশের বাজারে বেশ ভালো দামে বিক্রি হচ্ছে। বিশেষ করে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে ভেষজ উপাদান হিসেবে জামের বিচির গুঁড়োর চাহিদা আছে। ফলে যে অংশ একসময় অবহেলিত ছিল; সেটিও এখন অর্থনৈতিক মূল্য পাচ্ছে। একটি ফলের প্রায় প্রতিটি অংশ থেকেই তৈরি হচ্ছে নতুন সম্ভাবনা।

পুরো কর্মযজ্ঞের সবচেয়ে নীরব অংশীদার শ্রমিকেরা। তাদের হাতেই ভোরের বাজার জেগে ওঠে। আবার তাদের হাতেই শেষ হয় দিনের কাজ। ঘণ্টার পর ঘণ্টা জামের কষে হাত-পা কালো হয়ে যায়। দীর্ঘসময় দাঁড়িয়ে বা বসে কাজ করতে করতে অনেকের শরীরে ক্লান্তি জমে। কিন্তু মৌসুমি এ কাজ অনেক শ্রমিকের জন্য বাড়তি আয়ের সুযোগও তৈরি করে।

একটি ঝুড়িভর্তি বিচির দিকে তাকালে মনে হয়, বাজারের ভেতর যেন আরেকটি অদৃশ্য গল্প পড়ে আছে। সেই গল্পে আছে শ্রমিকের রঙে রাঙা হাত, ভেজা মেঝে, দীর্ঘসময় দাঁড়িয়ে কাজ করা মানুষ আর একটি ফলের রূপান্তরের ইতিহাস। আমরা যখন কোনো দোকান থেকে বোতলভর্তি জামের শরবত কিনি কিংবা বিদেশে পাঠানো ফলের সাফল্যের গল্প শুনি; তখন হয়তো এসব বিচির কথা মনে থাকে না। মনে থাকে না সেই শ্রমের কথাও, যা ভোর থেকে রাত পর্যন্ত কারওয়ান বাজারের গলিতে চলতেই থাকে।

কেএমএএ/আপ্র/১৯.০৭.২০২৬

সংশ্লিষ্ট খবর

কৃষিজমিতে খাদ্য ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের যুগান্তকারী সমাধান সৌর প্যানেল
১৬ আগস্ট ২০২৬

কৃষিজমিতে খাদ্য ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের যুগান্তকারী সমাধান সৌর প্যানেল

জলবায়ু পরিবর্তন, ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা, কৃষিজমির সংকোচন ও জ্বালানির চাহিদা- এ চারটি বড় চ্যালেঞ্জ আজ ব...

গ্রামবাংলার চেনা জীবন টঙ্গীর পশু-পাখির হাটে ‘হাঁসের রাজ্য’
১৬ আগস্ট ২০২৬

গ্রামবাংলার চেনা জীবন টঙ্গীর পশু-পাখির হাটে ‘হাঁসের রাজ্য’

ঢাকা ও গাজীপুরের মাঝামাঝি গুরুত্বপূর্ণ জনপদ টঙ্গী। উত্তরার আব্দুল্লাহপুর সেতু পার হলেই শুরু টঙ্গীর ব...

জলাবদ্ধতায় শতাধিক একর জমিতে সবজির পচনে বিপাকে কৃষক
১৬ আগস্ট ২০২৬

জলাবদ্ধতায় শতাধিক একর জমিতে সবজির পচনে বিপাকে কৃষক

পাবনার ঈশ্বরদীতে টানা ১৫ দিন ধরে থেমে থেমে আবার কখনো মুষলধারে বৃষ্টি হচ্ছে। এতে তলিয়ে গেছে শত শত একর...

দিনে ৫০-৬০ আঁটি আঁশ ছাড়িয়ে অর্ধেক পাটখড়ি পান শ্রমিক
১৬ আগস্ট ২০২৬

দিনে ৫০-৬০ আঁটি আঁশ ছাড়িয়ে অর্ধেক পাটখড়ি পান শ্রমিক

মাগুরায় পানিতে জাগ দেওয়া পাটের আঁশ ছাড়াতে ব্যস্ত সময় পার করছেন কৃষকেরা। জেলার বিভিন্ন এলাকায় রাস্তার...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

র‌্যাব বিলুপ্ত করে এসআরবি গঠনের বিল সংসদে

র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন বিলুপ্ত করে পুলিশের আওতাধীন ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন’ নামে নতুন একটি বিশেষায়িত ইউনিট গঠনের বিধান রেখে ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন আইন, ২০২৬’-এর বিল জাতীয় সংসদে উত্থাপন করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনের চতুর্থ দিনে বিলটি সংসদে উত্থাপন করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। এ সময় সংসদের বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন ভারপ্রাপ্ত স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল। প্রিয় পাঠক, আপনি মনে করেন র‌্যাব বিলুপ্তির এই উদ্যোগ সঠিক?

মোট ভোট: ১ | শেষ আপডেট: 1 দিন আগে